পাকিস্তান কি পারবে ইরান যুদ্ধ থামাতে?

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৫-২৩, | ২১:০৫:২৪ |

মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরানোর এক নতুন ও অপ্রত্যাশিত মঞ্চ হয়ে উঠেছে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের চলমান সংঘাত ও যুদ্ধ থামাতে বর্তমানে এক বড় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে পাকিস্তান। সম্প্রতি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ ইসহাক দার মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সের সাথে ইসলামাবাদে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এই চরম বৈরিতা দূর করতে পাকিস্তান এখন দুই দেশের মাঝে এক বিশ্বস্ত ‘চিঠিবাহক’ হিসেবে কাজ করছে। তবে প্রশ্ন উঠছে, পাকিস্তান কি সত্যিই এই যুদ্ধ থামিয়ে চূড়ান্ত শান্তি এনে দিতে পারবে, নাকি এই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে?

বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ ইসলামাবাদের এই কূটনৈতিক তৎপরতা নিয়ে তীব্র সংশয় প্রকাশ করছেন। তাদের মতে, পাকিস্তান যেভাবে দুই পক্ষের বার্তা আদান-প্রদান করছে, তা প্রশংসনীয় হলেও একটি চূড়ান্ত শান্তি চুক্তি নিশ্চিত করার ক্ষমতা তাদের নেই। কেননা, যে ভৌগোলিক ও কৌশলগত কারণে পাকিস্তান আজ এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে, ঠিক সেই কারণগুলোই আবার শান্তিরক্ষী হিসেবে তার হাত বেঁধে দিচ্ছে।

অবশ্য, পাকিস্তানের এই মুহূর্তে কিছু বড় শক্তির জায়গা রয়েছে। ইরানের সাথে দেশটির প্রায় ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে এবং তেহরানের সাথে একটি হিসেবি অথচ কার্যকর সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে ইসলামাবাদ। একই সাথে সৌদি আরবের অর্থায়নে পাকিস্তানের অর্থনীতি সচল থাকায় রিয়াদের সাথেও রয়েছে গভীর সখ্যতা। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের মার্কিন প্রশাসনে দেশটির সেনাপ্রধান অসিম মুনিরের সাথে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এক দারুণ ব্যক্তিগত রসায়ন তৈরি হয়েছে, যা এই আলোচনায় পাকিস্তানকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে।

ইতিমধ্যেই এই কূটনীতির কিছু দৃশ্যমান সাফল্যও দেখা গেছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যুর পর মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর যৌথ অভিযান যে গত ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতিতে রূপ নেয়, তার পেছনে পাকিস্তানের বড় ভূমিকা ছিল। মার্চ মাসে ওয়াশিংটনের ১৫ দফার প্রস্তাব তেহরানের কাছে পৌঁছে দেওয়া থেকে শুরু করে এপ্রিলে ‘ইসলামাবাদ টকস’-এর আয়োজন সবই করেছে তারা। এমনকি চলতি সপ্তাহেও ইরানের পাল্টা প্রস্তাবগুলো ওয়াশিংটনে নিয়ে যাওয়ার কাজ করছে পাকিস্তান, যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইতিমধ্যে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে এই আলোচনা চুক্তি আর নতুন হামলার একদম শেষ সীমানায় দাঁড়িয়ে আছে।

কিন্তু ইতিহাস বলে, মধ্যস্থতাকারীর দক্ষতার চেয়েও বড় বিষয় হলো বিবদমান দুই পক্ষের আসল উদ্দেশ্য। অতীতের ক্যাম্প ডেভিড বা অসলো চুক্তি সফল হয়েছিল কারণ তখন সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো নিজেরা যুদ্ধ থামানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে আমেরিকার দেওয়া প্রস্তাবটি মূলত ইরানের জন্য একটি ‘কৌশলগত আত্মসমর্পণ’-এর শামিল, যেখানে পরমাণু কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ ও ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা বলা হয়েছে। কোনো আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র, বিশেষ করে বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান এই শর্ত সহজে মেনে নেবে না।

অন্যদিকে, যুদ্ধবিরতির এই সুযোগে ইরান নিজের সামরিক শক্তি পুনর্গঠন করছে। মার্কিন সামরিক গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালীর কাছে ইরান তাদের ৩৩টি ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির মধ্যে ৩০টিই আবার সচল করেছে এবং নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ যুদ্ধের আগের তুলনায় ৭০ শতাংশে নিয়ে গেছে। খামেনির বিদায়ের পর ইরানের কট্টরপন্থীরা এখন আর আত্মসমর্পণের কথা ভাবছে না বরং তারা পরবর্তী লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এর পাশাপাশি পাকিস্তানের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ সংকটও এই শান্তি প্রক্রিয়ায় বড় বাধা। দেশটি নিজে বর্তমানে আফগান সীমান্তে যুদ্ধ পরিস্থিতি মোকাবেলা করছে, হরমুজ প্রণালী সংকটের কারণে তীব্র জ্বালানি সংকটে ভুগছে এবং দেশের সাধারণ জনগণও মার্কিন স্বার্থে কোনো মুসলিম প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোকে ভালো চোখে দেখছে না। ফলে ইসলামাবাদের সামনে পা ফেলার জায়গা খুবই সংকীর্ণ। সব মিলিয়ে, আন্তর্জাতিক কূটনীতির এই মহানাটকে পাকিস্তান হয়তো একটি চমৎকার খাম বা পোস্টম্যানের ভূমিকা পালন করতে পেরেছে কিন্তু খামের ভেতরের কঠিন বাস্তবতাকে বদলে দেওয়ার ক্ষমতা ইসলামাবাদের নেই বললেই চলে।

এশিয়া টাইমসের বিশ্লেষণ

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..