রিয়াল মাদ্রিদ থেকে কিলিয়ান এমবাপেকে বিক্রি করে দেওয়ার দাবিতে অনলাইনে যখন প্রায় সাত কোটি মানুষ পিটিশনে স্বাক্ষর করেছেন, ঠিক সেই সময় ‘ভ্যানিটি ফেয়ার’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ধরা দিলেন এক ভিন্ন এমবাপে—শান্ত, আত্মবিশ্বাসী ও নির্ভার। যেন চারপাশের সমালোচনা কিংবা বিতর্কের ঢেউ তাকে ছুঁতেই পারেনি।
সাক্ষাৎকারটি অবশ্য বেশ কয়েকদিন আগেই দিয়েছেন এমবাপে। ভ্যানিটি ফেয়ারের স্প্যানিশ সংস্করণের সাম্প্রতিক সংখ্যার প্রচ্ছদ মাতালেন রিয়াল মাদ্রিদের ফরাসি ফরোয়ার্ড কিলিয়ান এমবাপে। সবশেষ আন্তর্জাতিক বিরতির সময় নেওয়া এই দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে ফরাসি অধিনায়ক কোনো রাখঢাক না রেখেই কথা বলেছেন ফুটবল ও ফুটবলের বাইরের নানা ব্যক্তিগত ইস্যু নিয়ে।
নিজের দেশের হয়ে খেলার প্রবল চাপ থেকে শুরু করে বিশ্বব্যাপী আকাশচুম্বী খ্যাতি সামলানো—সবকিছুই এই আড্ডায় উঠে এসেছে। ফুটবল বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি ফ্রান্সের প্রতিনিধিত্ব করা তার কাছে ঠিক কতটা অর্থবহ, সেটিও স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন এমবাপে।
আলাপচারিতার এক পর্যায়ে উঠে আসে ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রসঙ্গ। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে হতে যাওয়া এই মেগা আসর নিয়ে নিজের রোমাঞ্চের কথা জানিয়েছেন তিনি। গত বিশ্বকাপের সেই আক্ষেপ ঘুচিয়ে আবারও বিশ্বসেরার মুকুট জয়ের জন্য কতটা মুখিয়ে আছেন, তারই যেন এক পূর্বাভাস দিলেন এই ফরাসি মহাতারকা।
২০১৮ বিশ্বকাপ জয় এবং ২০২২-এর ফাইনালে হ্যাটট্রিক করেও রানার্স-আপ হওয়ার তেতো স্বাদ পাওয়ার পর, এবার অধিনায়ক হিসেবে নিজের দেশকে আবারও বিশ্বজয়ের মুকুট পরাতে চান এমবাপে, ‘নিজের দেশের প্রতিনিধিত্ব করার চেয়ে আনন্দের আর কিছুই নেই। এর মাধ্যমে আপনি আন্তর্জাতিক ফুটবলের এক বিশেষ উচ্চতায় পৌঁছাতে পারেন।’
দলের ওপর সমর্থকদের আকাশচুম্বী প্রত্যাশা নিয়ে এমবাপে আরও যোগ করেন, ‘আমাদের মতো পরিস্থিতিতে থাকাটা বেশ কঠিন, যেখানে সবাই প্রত্যাশা করে আমরা প্রতিনিয়ত অলৌকিক কিছু করে দেখাব। কিন্তু অলৌকিক ঘটনা কেবল মাঠেই ঘটে; মাঠের লড়াইয়ের আগে কল্পনা দিয়ে তো আর ম্যাচ জেতা যায় না।’
দলের নেতৃত্ব দেওয়া প্রসঙ্গে এমবাপে বলেন, ‘আমি এখন দলের অধিনায়ক। পরিস্থিতি এখন আগের চেয়ে আলাদা, দায়িত্বটাও ভিন্ন। তবে আমি এর জন্য প্রস্তুত। দলকে বিশ্বমঞ্চের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিতে আমি তৈরি। আমার স্বপ্ন—আমরা ট্রফি নিয়ে প্যারিসে ফিরব এবং শঁজলিজে) উৎসব করব।’
নিজের ফুটবলীয় পরিচয় বা লিগ্যাসি নিয়ে ফরাসি মহাতারকা এমবাপের দর্শন বেশ সরল, ‘আমি মনে করি যখন আপনি মাঠে খেলেন, তখন লিগ্যাসি নিয়ে ভাবেন না। আপনার মাথায় থাকে কেবল ভালো পারফর্ম করা আর শিরোপা জেতা। তবে আমরা যদি জিততে পারি, তবে সেটি আমার এবং আমার দেশের ইতিহাসের জন্য হবে এক অবিস্মরণীয় প্রাপ্তি।’
কিশোর বয়স থেকেই বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পাওয়া আর গ্রহের অন্যতম জনপ্রিয় অ্যাথলেট হয়ে ওঠার বাস্তবতা কিভাবে দেখেছেন এমবাপে? খ্যাতির এই পাহাড়সম চাপের মাঝেও নিজেকে ইতিবাচক রাখার চেষ্টা করেন তিনি। খ্যাতির বিড়ম্বনা নিয়ে ফরাসি এই মহাতারকার উপলব্ধি বেশ গভীর, ‘অবশ্যই এটি কঠিন, কারণ আপনার মনে হতে পারে যে আপনি আর নিজের নেই; বরং আপনি এখন সবার সম্পদ। তবে একইসঙ্গে, এই জীবনটা তো আমরাই বেছে নিয়েছি। হয়তো এতটা হবে ভাবিনি, কিন্তু দিনশেষে পছন্দটা আমাদেরই ছিল।’
অগণিত মানুষের ভালোবাসার ভিড়ে নেতিবাচক বিষয় নিয়ে পড়ে থাকতে চান না এমবাপে, ‘আমরা এই পথে অঙ্গীকারবদ্ধ ছিলাম। যখন কোটি কোটি মানুষ আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতা, শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা দেখায়, তখন নেতিবাচক কিছু নিয়ে ভাবাটা কঠিন। খুব বেশি অভিযোগ করাটা হবে অকৃতজ্ঞতা।’
খুব অল্প বয়সে তারকাখ্যাতি পাওয়ায় শুরুতে খাপ খাইয়ে নিতে কষ্ট হয়েছিল এমবাপের। সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করে ২৭ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড বলেন, ‘আমি সবসময় এই পরিস্থিতিগুলো ঠিকঠাক সামলাতে পারিনি। আমি খুব অল্প বয়সেই বিখ্যাত হয়ে গিয়েছিলাম। তখন মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে সবকিছু দেখার মতো পরিপক্বতা বা সহমর্মিতা আমার ছিল না। আমি বুঝতাম না যে একজন মানুষ হয়তো জীবনে একবারই সরাসরি আমার দেখা পাচ্ছেন এবং টেলিভিশনের বাইরে আর কখনোই পাবেন না।’
এ জাতীয় আরো খবর..