রণাঙ্গনে প্রধান ভরসা ড্রোন: চীনের আধিপত্য ভাঙতে নতুন কৌশলে কিয়েভ

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৫-০৬, | ১৪:০০:২৪ |

চার বছরের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ইউক্রেনের মানচিত্রকে ক্ষতবিক্ষত করেছে। পাশাপাশি আধুনিক যুদ্ধকৌশলের ব্যাকরণও অনেকটাই বদলে দিয়েছে। আকাশপথে নজরদারি থেকে শুরু করে নিখুঁত নিশানায় শত্রুর ঘাটি গুঁড়িয়ে দিতে চালকবিহীন আকাশযান বা ড্রোনই এখন কিয়েভের প্রধান ভরসা। 

রাশিয়াকে আটকে রাখার এই কৌশলী লড়াই দেশটিকে নতুন করে ভাবাচ্ছে। মস্কোর বিশাল সামরিক শক্তির বিপরীতে টিকে থাকতে তাদের বাধ্য করছে নিজেদের শিল্পভিত্তি নতুন করে সাজাতে। এই কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ড্রোন। যা শুধু প্রতিরক্ষা আর হামলায় নয়, বরং ইউক্রেনের অস্তিত্ব রক্ষারও প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে

ড্রোনের জন্য চীনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে তাইওয়ানের দিকে ঝুঁকছে ভলোদিমির জেলেনস্কির দেশটি।

কিন্তু কেন? 

ইউক্রেন চীনের বিরুদ্ধে বারবার অভিযোগ করেছে, তারা রাশিয়াকে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহে সহায়তা করছে। যদিও বেইজিং এসব বরাবরই অস্বীকার করে আসছে। সেই সঙ্গে শিল্প সরবরাহ শৃঙ্খলে চীনের দীর্ঘদিনের আধিপত্য রয়েছে। এর ফলে তৈরি হওয়া নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সেজন্য ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্রসহ একাধিক দেশ বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকছে ইউক্রেন। এই প্রেক্ষাপটে তাইওয়ান একটি গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী হিসেবে উঠে এসেছে।

ইউক্রেনের স্বাধীন থিঙ্কট্যাঙ্ক স্নেক আইল্যান্ড ইনস্টিটিউট (এসআইআই) বলছে, তাইওয়ানের প্রযুক্তিগত দক্ষতা রয়েছে। বিশেষ করে মাইক্রোইলেকট্রনিক্স, নেভিগেশন সিস্টেম ও ব্যাটারি খাতে শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে দেশটি। যে কারণে এখন ইউক্রেনের ড্রোন নির্মাতাদের কাছে দেশটি অন্যতম পছন্দের উৎস। এসব খাতে পশ্চিমা অনেক সরবরাহকারীও পিছিয়ে পড়েছে।

এই চাহিদা মোকাবিলায় তাইওয়ানও প্রস্তুতি নিচ্ছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি সম্পূরক প্রতিরক্ষা বাজেট প্রস্তাব করেছেন। যেখানে ড্রোন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সমন্বিত প্রযুক্তি উন্নয়নে অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

তাইওয়ানের ড্রোন রপ্তানি বেড়েছে ৪০ গুণ
রিসার্চ ইনস্টিটিউট ফর ডেমোক্রেসি, সোসাইটি অ্যান্ড এমার্জিং টেকনোলজি (ডিএসইটি)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইউরোপে তাইওয়ানের ড্রোন রপ্তানি ৪০ গুণেরও বেশি বেড়েছে। পোল্যান্ড ও চেকিয়া এই রপ্তানির বড় বাজার হিসেবে উঠে এসেছে। প্রবৃদ্ধির এই ধারা ২০২৬ সালে আরও বেড়েছে। প্রথম তিন মাসের রপ্তানি আগের বছরের মোট পরিমাণকেও ছাড়িয়ে গেছে।

ডিএসইটির সাক্ষাৎকারভিত্তিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, এসব ড্রোনের বেশিরভাগই শেষ পর্যন্ত ইউক্রেনে পৌঁছানোর জন্য পাঠানো হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ইউরোপের কিছু দেশ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে।

দেশেই উৎপাদনের চেষ্টা
ইউক্রেনের শীর্ষ ড্রোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ভিরির প্রধান আন্তর্জাতিক জোট কর্মকর্তা বোহদান দিওরদিৎসা বলেন, ‘আমাদের এমন যন্ত্রাংশ আছে যা তাইওয়ানে তৈরি হয়, এবং এখন এই শিল্পে এটি অস্বাভাবিক কিছু নয়।’ তিনি জানান, তাদের প্রতিষ্ঠান বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে চীনা যন্ত্রাংশের ওপর নির্ভরতা কমাতে কাজ করছে এবং স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর পক্ষেও সক্রিয়।

তার মতে, চীন ভবিষ্যতে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করতে পারে। এই শঙ্কাও বিকল্প সরবরাহকারী খোঁজার প্রধান কারণ। তিনি বলেন, সেমিকন্ডাক্টর ও ইলেকট্রনিক্স ইন্টিগ্রেশনে বিশ্বমানের সক্ষমতার কারণে তাইওয়ান শতভাগ মূল্যবান অংশীদার।

এসআইআই-এর বিশ্লেষক আর্তুর সাভচি বলেন, ইউক্রেন উৎপাদন সম্পূর্ণভাবে স্থানীয় পর্যায়ে নিয়ে আসতে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। যুদ্ধের প্রতিটি বছর সেই প্রক্রিয়াকে আরও বেগবান করেছে। আগে অধিকাংশ ড্রোন চীন থেকে আমদানি করা হতো। এখন দেশটিতে প্রায় সম্পূর্ণ নিজস্বভাবে ড্রোন সংযোজন করা হচ্ছে।

ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর নাগাদ দেশে ১০০টিরও বেশি যন্ত্রাংশ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। সাভচি বলেন, চীনের বড় বড় কোম্পানিগুলো ঢালাওভাবে ড্রোন বানায়, যা সবার জন্য একই। কিন্তু স্থানীয় কোম্পানিগুলো সম্মুখ সমরের চাহিদা অনুযায়ী বা ফ্রন্টলাইনের সৈনিকদের পরামর্শ নিয়ে প্রযুক্তি তৈরি করছে।

রয়েছে চ্যালেঞ্জ
তবে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়লেও নিকট ভবিষ্যতে চীনকে সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে ড্রোন উৎপাদন বাড়ানো ইউক্রেনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, চীনা যন্ত্রাংশের সহজলভ্যতা ও কম দামের তেমন কোনো বিকল্প নেই। এছাড়া ড্রোনের অতিপ্রয়োজনীয় উপাদান যেমন লিথিয়াম ব্যাটারি বা বিরল খনিজ চুম্বক অন্য কোনো দেশে তৈরি হলেও সেগুলোর কাঁচামালের জন্য বিশ্বব্যাপী চীনের ওপরই নির্ভর করতে হয়। ফলে চাইলেও এই মুহূর্তে চীনের প্রভাবমুক্ত ড্রোন উৎপাদন নিশ্চিত করা কিয়েভের জন্য প্রায় অসম্ভব।

প্রয়োজন লাখ লাখ ড্রোন
অন্যদিকে, তাইওয়ানের সরবরাহ ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাও এখানে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ইউক্রেনের যুদ্ধকালীন চাহিদা এতই বিশাল যে, তাদের প্রতিবছর লাখ লাখ ড্রোনের প্রয়োজন। অথচ তাইওয়ানের শুল্ক প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, তাদের বর্তমান উৎপাদন সক্ষমতা এখনও মাত্র কয়েক লাখের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

তাইওয়ানের শীর্ষস্থানীয় ড্রোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘থান্ডার টাইগার’-এর জেনারেল ম্যানেজার জিন সু-এর মতে, দামের বিচারে চীনা পণ্যগুলো এখনও অনেক এগিয়ে রয়েছে। এমনকি কিছু চীনা মডেলের দাম তাদের সমগোত্রীয় তাইওয়ানি মডেলের তুলনায় কয়েকগুণ কম।  

এর পাশাপাশি ভূ-রাজনীতিও একটি বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। ইউক্রেন এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে তাইওয়ানকে স্বীকৃতি দেয়নি এবং নিজেদের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার চীনের সঙ্গে তারা এক ধরনের সতর্ক সম্পর্ক বজায় রাখছে। 


সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..