কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এখন শুধু প্রযুক্তি বিশ্বে সীমাবদ্ধ নেই। এটি পরিণত হয়েছে বিশ্ব অর্থনীতির বড় আলোচনায়। প্রযুক্তিটি এখন বিশ্বের বড় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর নীতিনির্ধারণী টেবিলে জায়গা করে নিয়েছে।
এআইয়ের প্রভাব বাড়তে থাকায় বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো মূল্যস্ফীতি, সুদহার ও মুদ্রানীতি নিয়ে নতুন করে ভাবছে।
অর্থনীতি, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বন্ড ও বৈদেশিক মুদ্রাবাজার বিশেষজ্ঞ পিয়েরো সিঙ্গারি বলেন, কয়েক বছর আগেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এআইকে ভবিষ্যতের প্রযুক্তিগত পরিবর্তন হিসেবে দেখত। জলবায়ু পরিবর্তন বা জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের মতো দীর্ঘমেয়াদি একটি বিষয় হিসেবে এটিকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছিল। কিন্তু এখন সে ধারণা পুরোপুরি বদলে গেছে।
বিশ্বের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিনির্ধারকেরা মনে করছেন, এআই অর্থনীতিতে এমন পরিবর্তন আনতে পারে, যা বিদ্যুৎ আবিষ্কার বা ইন্টারনেটের বিস্তারের মতো বড় প্রভাব ফেলবে। এতে উৎপাদন ব্যয়, শ্রমবাজার, মূল্যস্ফীতি, সুদহারসহ সবকিছু বদলে যেতে পারে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোও তাদের প্রচলিত অর্থনৈতিক মডেল ও নীতিনির্ধারণ পদ্ধতি নতুন করে মূল্যায়ন শুরু করেছে।
বিতর্ক এখন আর এআই গুরুত্বপূর্ণ কিনা তা নিয়ে নয়। বরং প্রশ্ন হচ্ছে, এর প্রভাব কত দ্রুত আসবে, প্রথমে মূল্যস্ফীতি বাড়বে নাকি কমবে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে। অনেকের মতে, স্বল্পমেয়াদে এআই মূল্যস্ফীতি বাড়াতে পারে। আবার দীর্ঘমেয়াদে এটি উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি কমাতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে তাত্ত্বিক পর্যায় থেকে সরাসরি কাজে লাগানোর দৌড়ে সবার চেয়ে এগিয়ে আছে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ইসিবি)। গত ২১ এপ্রিল প্রকাশিত একটি ব্লগ পোস্টে ইসিবির চার অর্থনীতিবিদ জানান, ২০২২ সালের শেষ দিক থেকেই তারা মুদ্রানীতি নির্ধারণে মেশিন লার্নিংভিত্তিক একটি মডেল ব্যবহার করছেন। এ মডেল প্রায় ৬০টি সূচকের তথ্য বিশ্লেষণ করে। এর মধ্যে রয়েছে মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা, উৎপাদন ব্যয়, অর্থনৈতিক কার্যক্রম ও আর্থিক পরিস্থিতি সম্পর্কিত তথ্য। প্রতি প্রান্তিকে কয়েকবার এসব তথ্য হালনাগাদ করা হয়।
ইসিবির দাবি, মডেলটি এরই মধ্যে কার্যকারিতা দেখাতে শুরু করেছে। ২০২৫ সালের দ্বিতীয় ও চতুর্থ প্রান্তিকে মডেলটি মূল্যস্ফীতিতে ঊর্ধ্বমুখী ঝুঁকির পূর্বাভাস দিয়েছিল। পরে দেখা যায়, প্রকৃত মূল্যস্ফীতি ইসিবির আনুষ্ঠানিক পূর্বাভাসের চেয়ে প্রায় ২০ বেসিস পয়েন্ট বেশি হয়েছে।
জার্মানির কেন্দ্রীয় ব্যাংক বুন্দেসব্যাংকও একই পথে এগোচ্ছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ফ্রাঙ্কফুর্টে আয়োজিত এক সম্মেলনে বুন্দেসব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জোয়াকিম নাগেল জানান, দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক এরই মধ্যে বিভিন্ন ধরনের এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। এর মধ্যে রয়েছে টেক্সটভিত্তিক সহকারী, নথি বিশ্লেষণ প্রযুক্তি ও ইউরো অঞ্চলের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর যোগাযোগ বিশ্লেষণের জন্য ‘মিলা’ নামের একটি মডেল।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ বা ফেডের অবস্থান কিছুটা ভিন্ন। তারা এখনো ইসিবির মতো সরাসরি নীতিনির্ধারণে এআই ব্যবহার শুরু করেননি। তবে ফেডের কর্মকর্তারা এআইকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের নীতিগত বিতর্কে জড়িয়েছেন। বিশেষ করে উৎপাদনশীলতা, শ্রমবাজার ও মূল্যস্ফীতির ওপর এর প্রভাব নিয়ে আলোচনা বাড়ছে।
ফেডের গভর্নর ক্রিস্টোফার ওয়ালার গত বছর বলেছিলেন, ‘ব্যক্তিগত কম্পিউটার, ইন্টারনেট বা স্মার্টফোনের তুলনায় অনেক দ্রুতগতিতে এআই প্রযুক্তি ছড়িয়ে পড়ছে।’
তার মতে, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো এআই উৎপাদনশীলতা বাড়াবে কিনা। যদি উৎপাদনশীলতা ধারাবাহিকভাবে ২ শতাংশের বেশি বাড়ে, তাহলে মূল্যস্ফীতি না বাড়িয়েই মানুষের আয় ও জীবনযাত্রার মান উন্নত হতে পারে। একজন মুদ্রানীতিনির্ধারক হিসেবে তিনি আশা করছেন, এআই সে পরিবর্তন আনতে সক্ষম।
তবে ফেডের ভাইস চেয়ারম্যান ফিলিপ জেফারসন সতর্ক করে বলেন, ‘এআইয়ের প্রভাব একমুখী নয়। একদিকে এটি উৎপাদন খরচ কমাতে পারে। অন্যদিকে প্রযুক্তিটি চালাতে বিপুল ডেটা সেন্টার, বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো দরকার হবে। এতে জ্বালানি ও অন্যান্য কাঁচামালের দাম বাড়তে পারে। ফলে এআইয়ের প্রভাব শুধু মূল্যস্ফীতি কমাবে, এমন ধারণা ঠিক নয়।’
এআই বিতর্কে সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর একটি কেভিন ওয়ার্শ। তিনি সাবেক ফেড কর্মকর্তা ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থিত ফেড চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আছেন। ওয়ার্শ মনে করেন, এআই তার জীবদ্দশার সবচেয়ে বড় উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ঢেউ তৈরি করতে পারে। তিনি নব্বই দশকের শেষ দিকের পরিস্থিতির সঙ্গে বর্তমান সময়ের তুলনা করেন। তখন ফেড চেয়ারম্যান অ্যালান গ্রিনস্প্যান তুলনামূলক শিথিল নীতি ধরে রেখেছিলেন এবং পরে বাড়তি উৎপাদনশীলতার কারণে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ছিল।
কেবল কেন্দ্রীয় ব্যাংক নয়, ওয়াল স্ট্রিটের বড় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ও অর্থনীতিবিদদের মধ্যেও এআই নিয়ে বিভক্তি তৈরি হয়েছে। একদল মনে করছে, এআই বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ইতিবাচক সরবরাহ ধাক্কা বা ‘পজিটিভ সাপ্লাই শক’ তৈরি করবে। এতে উৎপাদন ব্যয় কমবে, মূল্যস্ফীতি কমবে ও সুদহারও নিচে নামবে। অন্যদিকে আরেক দল মনে করছে, এআইয়ের কারণে বিপুল বিনিয়োগচক্র শুরু হবে, যা স্বল্পমেয়াদে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দিতে পারে।
নর্দার্ন ট্রাস্টের সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান মাইক হানস্ট্যাডের ভাষ্য, আধুনিক অর্থনৈতিক ইতিহাসে এআই সবচেয়ে বড় ইতিবাচক পরিবর্তনগুলোর একটি হতে পারে। এআই উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সক্ষম হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর মুদ্রানীতির চেয়েও এটি বেশি কার্যকরভাবে মূল্যস্ফীতি কমাতে পারে। এমনকি তিনি বলেন, ভবিষ্যতে এআই নিজেই এক ধরনের ‘মুদ্রানীতি’ হিসেবে কাজ করতে পারে।
—ইউরো নিউজ অবলম্বনে
এ জাতীয় আরো খবর..