ওপেকের বাইরে গেলে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিলের মতো স্বাধীন উৎপাদকদের তালিকায় যুক্ত হবে ইউএই, এ দেশগুলো নিজেদের মতো উত্তোলন বাড়াতে পারে। তবে আপাতত হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ থাকায় উত্তোলন বা রফতানি বাড়ানোর সুযোগ সীমিত। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ইউএই তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী প্রতিদিন ৫০ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত উত্তোলন বাড়াতে পারবে
ওপেক ও এর মিত্রদের জোট ওপেক প্লাস থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) বেরিয়ে যাচ্ছে ১ মে। এতে বৈশ্বিক তেলবাজারের বাজারে জোটটির প্রভাব কিছুটা কমবে। তবে বাকি সদস্য দেশগুলো একসঙ্গে থেকেই সরবরাহ নীতিতে সমন্বয় চালিয়ে যাবে এমনটাই জানিয়েছেন ওপেক প্লাসের প্রতিনিধি ও বিশ্লেষকরা। খবর রয়টার্স।
ইউএই প্রায় ৬০ বছর সদস্য থাকার পর গতকাল ওপেক ছাড়ার ঘোষণা দেয়। দেশটি এ জোটের চতুর্থ বৃহত্তম উত্তোলনকারী দেশ ছিল। এ সিদ্ধান্তের ফলে আবুধাবি আর ওপেক ও এর মিত্রদের নির্ধারিত উত্তোলন কোটা মানতে বাধ্য থাকবে না, এতদিন যা সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য রক্ষায় ব্যবহৃত হতো।
ওপেক প্লাসের সঙ্গে যুক্ত পাঁচটি সূত্র জানিয়েছে, এ সিদ্ধান্ত তাদের জন্য বিস্ময়কর ছিল। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আরব আমিরাতের প্রস্থান জোটটির বাজার নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতাকে জটিল করে তুলবে। কারণ এতে বৈশ্বিক উত্তোলনের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ কমে যাবে।
ওপেক ছেড়ে যাওয়া দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় উত্তোলনকারী দেশ ইউএই, যা সংগঠনটির জন্য বড় ধাক্কা। বিশেষ করে এ জোটের অনানুষ্ঠানিক নেতা সৌদি আরবের জন্য বিষয়টি অস্বস্তিকর। যুদ্ধ শুরুর আগে ইউএই প্রতিদিন প্রায় ৩৪ লাখ ব্যারেল বা বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ৩ শতাংশ জ্বালানি তেল উত্তোলন করত। তবে ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলাজনিত পরিস্থিতির কারণে ইউএইসহ উপসাগরীয় দেশগুলোকে উত্তোলন ও রফতানি কমাতে হয়েছে।
ওপেক ও সৌদি সরকার তাৎক্ষণিকভাবে ইউএইর জোট ছাড়ার সিদ্ধান্তের বিষয়ে মন্তব্য করেনি।
ওপেকের বাইরে গেলে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিলের মতো স্বাধীন উৎপাদকদের তালিকায় যুক্ত হবে ইউএই, এ দেশগুলো নিজেদের মতো উত্তোলন বাড়াতে পারে। তবে আপাতত হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ থাকায় উত্তোলন বা রফতানি বাড়ানোর সুযোগ সীমিত। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ইউএই তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী প্রতিদিন ৫০ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত উত্তোলন বাড়াতে পারবে।
উত্তোলন কোটা নিয়ে ইউএই ও সৌদি আরবের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই টানাপোড়েন ছিল। দেশটি ১৫০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের মাধ্যমে উত্তোলন সক্ষমতা বাড়ানোয় উচ্চতর কোটা দাবি করে আসছিল।
আরবিসি ক্যাপিটাল মার্কেটসের হেলিমা ক্রফট বলেন, আবুধাবি উত্তোলন সক্ষমতা বাড়িয়েছে। এ বিনিয়োগ থেকে তারা অনেক বছর আয় করতে চাইছে।
অবশ্য ইরান–সংক্রান্ত যুদ্ধ পরিস্থিতি সেই পরিকল্পনাকে ধীর করে দিয়েছে। কারণ ড্রোন ও রকেট হামলায় ইউএইর কিছু স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
দৈনিক তেল উত্তোলনের হিসাবে ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক সরবরাহ বিঘ্ন তৈরি করেছে চলমান যুদ্ধ, সম্প্রতি এ তথ্য দিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির (আইইএ)।
এছাড়া এ যুদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে, বিশেষ করে ইউএই ও সৌদি আরবের মধ্যে অভ্যন্তরীণ মতবিরোধও উন্মুক্ত করে দিয়েছে। সৌদি আরবের সঙ্গে সুদান, সোমালিয়া ও ইয়েমেন ইস্যুতে মতবিরোধের কারণে ইউএই ওপেক ছাড়বে অনেকদিন ধরে এমন গুঞ্জন ছিল। পাশাপাশি দেশটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কও জোরদার করেছে।
এর আগে ২০২৪ সালে অ্যাঙ্গোলা, ২০২০ সালে একুয়েডর ও ২০১৯ সালে কাতার ওপেক প্লাস ছাড়ে। তবে জোটের তৃতীয় বৃহত্তম উত্তোলনকারী ইরাক জানিয়েছে, তাদের এমন কোনো পরিকল্পনা করছে না। বরং দেশটি জ্বালানি তেলের দামে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে চায়।
ব্ল্যাক গোল্ড ইনভেস্টরসের সিইও গ্যারি রস বলেন, ওপেক প্লাস ভেঙে পড়বে না। কারণ সৌদি আরব এখনো জোটের মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে আগ্রহী। শেষ পর্যন্ত ওপেক বলতে কার্যত সৌদি আরবই, একমাত্র দেশ যার অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা আছে। সৌদি আরব চাইলে প্রতিদিন ১ কোটি ২৫ লাখ ব্যারেল উত্তোলন করতে পারে, যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় তারা ১ কোটি ব্যারেলে নিচে রেখেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ওপেক প্লাস সদস্যপদ দেশগুলোকে কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক গুরুত্ব দেয়, যা ইরানের মতো দেশের এ জোটে থাকার অন্যতম কারণ।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট অতীতে ওপেকের বিরুদ্ধে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর অভিযোগ তুলেছিলেন এবং ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, জোটের নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক সহায়তা পুনর্বিবেচনা করতে পারে। তবে ২০২০ সালে কভিড মহামারীর সময় জ্বালানি তেলের দাম পড়ে গেলে উত্তোলন কমাতে ওপেক প্লাসকে রাজি করাতেও ট্রাম্প ভূমিকা রেখেছিলেন।
রাইস্টাড এনার্জির জর্জ লিওন বলেন, ইউএইর প্রস্থান ওপেকের জন্য বড় পরিবর্তন। দীর্ঘমেয়াদে এটি কাঠামোগতভাবে দুর্বল একটি জোটের ইঙ্গিত দেয়।
হেলিমা ক্রফটের মতে, আপাতত উত্তোলন কমানোর মতো পদক্ষেপ নয়, ওপেক প্লাস দেশগুলো যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠনে বেশি মনোযোগ দেবে। ফলে এখনই জোট ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই।
১৯৬০ সালে গঠিত ওপেক একসময় বৈশ্বিক তেল উৎপাদনের ৫০ শতাংশের বেশি নিয়ন্ত্রণ করত। কিন্তু অন্যান্য দেশের উত্তোলন বাড়ার ফলে এখন সেই অংশ কমে প্রায় ৩০ শতাংশে নেমে এসেছে।
গত ১৫ বছরে সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র। শেল তেলের উত্থানের ফলে দেশটির হাতে এখন বৈশ্বিক উত্তোলনের প্রায় ২০ শতাংশ হিস্যা।
এ পরিস্থিতিতে ২০১৬ সালে ওপেক রাশিয়াসহ অন্যান্য উৎপাদকদের নিয়ে ওপেক প্লাস জোট গঠন করে। এর ফলে ২০২৫ সালে বৈশ্বিক উত্তোলনের প্রায় ৫০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণে ছিল এই জোটের। তবে ইউএই বেরিয়ে যাওয়ার পর তা কমে প্রায় ৪৫ শতাংশে নেমে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এ জাতীয় আরো খবর..