দিশারি শিল্পী, সুরকার ও মুক্তিযোদ্ধা লাকী আখান্দ–এর প্রয়াণ দিবস আজ। বাংলা গানের এই কিংবদন্তি সুরকার ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দের ২১ এপ্রিল পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। সংগীতের ভুবনে যার যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দের ৭ জুন, ঢাকার মাটিতে—সেই যাত্রা শেষ হলেও তাঁর সৃষ্টি আজও অমলিন।
জন্মের পর তাঁর নাম ছিল এ টি আমিনুল হক, পরে তা পরিবর্তিত হয়ে হয় এ টি এম আমিনুল হাসান। মুক্তিযুদ্ধের সময় পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে তিনি ‘লাকী আনাম’ নাম ব্যবহার করেন। স্বাধীনতার পর পূর্বপুরুষের পদবি গ্রহণ করে স্থায়ীভাবে হয়ে ওঠেন লাকী আখান্দ—একটি নাম, যা পরবর্তীতে বাংলা সংগীতের ইতিহাসে বিশেষ মর্যাদা পায়।
পুরান ঢাকার সংগীতমুখর পরিবেশেই বেড়ে ওঠেন তিনি। শৈশব থেকেই গানের প্রতি গভীর টান, আর বাবার অনুপ্রেরণায় খুব অল্প বয়সেই সংগীতচর্চা শুরু। কৈশোরেই রেডিও ও টেলিভিশনে অংশগ্রহণ এবং অল্প বয়সেই সুরকার হিসেবে স্বীকৃতি—সব মিলিয়ে তাঁর প্রতিভা খুব দ্রুতই বিকশিত হয়। ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র–এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে কণ্ঠযোদ্ধা হিসেবে ভূমিকা রাখেন। তাঁর গাওয়া দেশাত্মবোধক গান মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণা জুগিয়েছে।
স্বাধীনতার পর তিনি বাংলাদেশ বেতারে যোগ দেন এবং সংগীত পরিচালক হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত তাঁর প্রথম একক অ্যালবাম তাঁকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে দেয়। ‘এই নীল মণিহার’, ‘যেখানে সীমান্ত তোমার’, ‘আমায় ডেকো না’, ‘কবিতা পড়ার প্রহর এসেছে’—এমন অসংখ্য গান আজও শ্রোতাদের হৃদয়ে গেঁথে আছে।
সুরের ক্ষেত্রে লাকী আখান্দ ছিলেন এক ব্যতিক্রমী প্রতিভা। তিনি গানের বাণীকে গুরুত্ব দিয়ে সুর নির্মাণ করতেন এবং একই সুরকে ভিন্ন ভিন্ন সংগীত আয়োজনে উপস্থাপনের মাধ্যমে নতুনত্ব সৃষ্টি করতেন। হামিং ও দৈনন্দিন বস্তু ব্যবহার করে ছন্দ তৈরির মতো অভিনব কৌশল তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। ফোক, আধুনিক এবং পাশ্চাত্য সুরের মেলবন্ধনে তিনি গড়ে তুলেছিলেন নিজস্ব একটি সংগীতধারা।
জীবনের একটি বড় আঘাত আসে ১৯৮৭ খ্রিষ্টাব্দে ছোট ভাই হ্যাপি আখান্দ–এর অকালমৃত্যুতে। এতে তিনি দীর্ঘদিন সংগীত থেকে দূরে সরে থাকলেও পরে আবার ফিরে আসেন। তাঁর সৃষ্টিতে সেই বেদনার ছাপও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
লাকী আখান্দ আজ নেই, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি চিরকাল বেঁচে থাকবে। প্রতিটি সংগীতানুষ্ঠান, প্রতিটি আবেগঘন মুহূর্তে তাঁর গান নতুন করে প্রাণ পায়। জন্ম থেকে মৃত্যু—এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যেই তিনি বাংলা সংগীতকে দিয়েছেন এক অনন্য উচ্চতা, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।