মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় নজিরবিহীন বিপর্যয়ের ফলে বিশ্ব অর্থনীতি এক গভীর সংকটের মুখে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান ছয় সপ্তাহব্যাপী যুদ্ধের ভয়াবহ প্রভাবে অঞ্চলের প্রধান জ্বালানি স্থাপনাগুলো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চলমান দুই সপ্তাহের একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতির মধ্যে ক্ষয়ক্ষতির যে চিত্র উঠে আসছে, তা বিশ্ববাজারের জন্য এক অশনিসংকেত। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এ ধ্বংসযজ্ঞের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি মূল্যের যে ঊর্ধ্বগতি শুরু হয়েছে, তা দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিতে পারে। খবর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।
যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে সৌদি আরব ও কাতার সবচেয়ে বড় ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে। বিশ্বের শীর্ষ তেল রফতানিকারক দেশ হিসেবে সৌদি আরব তাদের উৎপাদন সক্ষমতার একটি বড় অংশ হারিয়েছে। অন্যদিকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি সরবরাহের অন্যতম প্রধান দেশ কাতার তাদের মোট উৎপাদনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হারিয়েছে। জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর এ সুপরিকল্পিত হামলাগুলো কেবল সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকেই নয়, বরং পুরো বিশ্ব অর্থনীতিকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের আকাশচুম্বী দাম উন্নয়নশীল ও উন্নত উভয় ধরনের দেশের অর্থনীতির ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে।
সৌদি আরবের জ্বালানি মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ধারাবাহিক হামলার ফলে তাদের তেল উৎপাদন সক্ষমতা প্রতিদিন প্রায় ছয় লাখ ব্যারেল কমেছে। দেশটির গুরুত্বপূর্ণ ‘ইস্ট-ওয়েস্ট’ পাইপলাইনটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় রফতানি প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে মানিফা ও খুরাইস তেলক্ষেত্রে চালানো হামলাগুলো সৌদি আরবের বিশাল উৎপাদন সক্ষমতাকে অন্তত ৫ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে। ফলে হরমুজ প্রণালি এখন খুলে দিলেও সৌদি আরবের পক্ষে তাৎক্ষণিক বিশ্ববাজারের বাড়তি চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে না। এ পরিস্থিতি বিশ্বের ‘স্পেয়ার ক্যাপাসিটি’ বা জরুরি মজুদ সক্ষমতাকেও সংকুচিত করে ফেলেছে।
এলএনজির বাজারে কাতারের অবস্থান অত্যন্ত প্রভাবশালী হলেও ইসরায়েলি ও ইরানি হামলার পাল্টাপাল্টি আঘাতে পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। কাতারের রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সাইটে ব্যালিস্টিক মিসাইল আঘাত হানায় এলএনজি রফতানি সক্ষমতা প্রায় ১৭ শতাংশ কমে গেছে। কাতারএনার্জির মতে, এ বিশাল অবকাঠামো মেরামত করে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে তিন-পাঁচ বছর সময় প্রয়োজন হতে পারে। গ্যাসের এ বিশাল ঘাটতি বিশেষ করে ইউরোপের দেশগুলোর জন্য চরম উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যুদ্ধে কেবল সৌদি বা কাতার নয়, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও ইরাকের জ্বালানি খাতও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আবুধাবির বিখ্যাত রুওয়াইস শোধনাগারে ড্রোন হামলার ফলে অগ্নিকাণ্ড ঘটে, যা উৎপাদন ব্যাহত করেছে। কুয়েতের মিনা আল আহমাদি ও মিনা আবদুল্লাহ শোধনাগার হামলার শিকার হওয়ায় এশিয়া এবং ইউরোপে জেট ফুয়েলের সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে। ফলে বিশ্বজুড়ে বিমান ভাড়াসহ পর্যটন শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। ইরাকের অবস্থা আরো শোচনীয়। বিকল্প রফতানি পথ না থাকায় এবং হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ থাকায় দেশটি তাদের মোট উৎপাদনের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। যুদ্ধের আগে ইরাক প্রতিদিন ৪৩ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করলেও এখন তা আট লাখ ব্যারেলে নেমে এসেছে। দেশটির অর্থনীতি পুরোপুরি তেলনির্ভর হওয়ায় এ উৎপাদন হ্রাস ইরাকের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকেও হুমকির মুখে ফেলেছে।
বর্তমানে ইসলামাবাদে চলমান শান্তি আলোচনায় মূল লক্ষ্য হচ্ছে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেয়া। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল জলপথ খুলে দিলেই সংকটের দ্রুত সমাধান হবে না। রিস্তাড এনার্জির মতে, অবকাঠামোগত ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে অন্তত ছয় মাস সময় লাগবে। এর অর্থ হলো বিশ্ববাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্য আরো দীর্ঘ সময় স্থায়ী হবে। পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দামও বাড়ছে, যা বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতিকে ভয়াবহ পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে। দ্রুত কোনো টেকসই সমাধান না এলে বিশ্ব অর্থনীতি দীর্ঘস্থায়ী মন্দার কবলে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ জাতীয় আরো খবর..