আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার প্রতিবেদন

বিশ্বজুড়ে জ্বালানি খাতে ছয় বছরে সরকারি ব্যয় বেড়েছে দ্বিগুণ

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৪-১২, | ১৮:০৮:৩৩ |
বিশ্বব্যাপী জ্বালানি খাতে সরকারি ব্যয়ের চিত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে গত বছর।

২০১৯ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে খাতটিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারের বার্ষিক ব্যয় হয়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। ২০২২ সালের জ্বালানি সংকট ও সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার মতো একের পর এক বৈশ্বিক ধাক্কা নীতিনির্ধারকদের এ খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ ও ভর্তুকি দিতে বাধ্য করছে। খবর আনাদোলু।

আইইএ গত শুক্রবার স্টেট অব এনার্জি পলিসি ২০২৬ শীর্ষক প্রতিবেদনে জানায়, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা রক্ষা ও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে জ্বালানি মূল্য ধরে রাখতে বিশ্বব্যাপী সরকারি ব্যয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে। ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি খাতে বার্ষিক সরকারি ব্যয়ের পরিমাণ ৪০ হাজার ৫০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে।

সংস্থাটির মতে, কভিড-১৯ মহামারীর ধকল কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই ২০২২ সালের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি জ্বালানি বাজারে এক চরম অস্থিরতা তৈরি করেছে।

উল্লেখ্য, প্রতিবেদনটি মূলত বিশ্বের ৮৪টি দেশের ৬ হাজার ৫০০-এর বেশি নীতিগত পদক্ষেপ পর্যালোচনা করে তৈরি করা হয়েছে। এটি বিশ্বের বৃহত্তম জ্বালানিনীতি ভাণ্ডার ‘গ্লোবাল এনার্জি পলিসি হাব’-এর তথ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রস্তুত করা প্রথম কোনো পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন। এতে জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ, জলবায়ু অঙ্গীকার, জরুরি মজুদ ও সাধারণ মানুষের জ্বালানিপ্রাপ্তির মতো প্রায় ২০০টি ক্ষেত্রকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

আইইএর তথ্যানুযায়ী, ব্যয়ের একটি বড় অংশ যাচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো উন্নয়নে। এর মধ্যে রয়েছে উন্নত উৎপাদন ব্যবস্থা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের সম্প্রসারণ; জ্বালানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তি বা এনার্জি এফিসিয়েন্সি বৃদ্ধি; জ্বালানি হিসেবে কয়লা বা তেলের বদলে তুলনামূলক কম ক্ষতিকর জ্বালানি ব্যবহারে (ফুয়েল সুইচিং) উৎসাহ প্রদান।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক যুদ্ধ শুরুর আগেই ২০৩০ সাল পর্যন্ত জ্বালানি খাতে বার্ষিক ব্যয়ের উচ্চ গতিধারা অব্যাহত থাকার পূর্বাভাস পাওয়া গিয়েছিল। অর্থাৎ বিভিন্ন দেশ এখন কেবল তাৎক্ষণিক সংকট নয়, বরং ভবিষ্যতে জ্বালানি সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে বড় ধরনের বিনিয়োগে মনোযোগী হচ্ছে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে ২০২২ সালে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট থেকে বিশ্বনেতারা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নিয়েছেন বলে মনে করছেন অনেকে। ওই সময়ে বিশ্বব্যাপী ভোক্তাদের উচ্চমূল্য থেকে সুরক্ষা দিতে সরকার বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে। তবে আইইএর পরিসংখ্যানে একটি উদ্বেগের বিষয় উঠে এসেছে। ওই বছর ভোক্তা পর্যায়ে ২২ হাজার কোটি ডলার ব্যয় করা হলেও তার মাত্র ২৫ শতাংশ বা চার ভাগের এক ভাগ প্রকৃত অর্থে দুস্থ বা অভাবী পরিবারগুলোর কাছে পৌঁছেছে। ঢালাওভাবে ব্যয় হওয়া বাকি অর্থ দেশগুলোর ওপর বাড়তি আর্থিক বোঝা তৈরি করেছে।

পাশাপাশি প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ বৃদ্ধিতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। মোট আমদানির প্রায় ৪০ শতাংশ গ্যাস ব্যবহার করা বিশ্বের ৩০টি দেশ প্রাকৃতিক গ্যাস মজুদের ক্ষেত্রে কঠোর ও নতুন নিয়ম প্রণয়ন করেছে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি রূপান্তরের এ যুগে খনিজ সম্পদের গুরুত্ব আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। তবে এর সরবরাহ ব্যবস্থা ও প্রযুক্তি এখন কিছু নির্দিষ্ট দেশের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে।

আইইএ বলছে, গত পাঁচ বছরে খনিজ সম্পদবিষয়ক নীতিমালার এক-তৃতীয়াংশই নতুন করে তৈরি করা হয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ খনিজগুলোর ওপর রফতানি নিয়ন্ত্রণ আরোপের প্রতিক্রিয়ায় বিভিন্ন দেশ নিজেদের কৌশল পরিবর্তন করছে।

আইইএর প্রযুক্তি পরিচালক লরা কোজি বলেন, ‘বৈশ্বিক সীমাবদ্ধতা ও ক্রমাগত পরিবর্তিত পরিস্থিতি জ্বালানি নীতিনির্ধারণে মূল ভূমিকা রাখছে। সরকার ভোক্তাদের সুরক্ষা দিতে ও সরবরাহ নিশ্চিত করতে কাজ করছে। তবে তাদের অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যেন স্বল্পমেয়াদি সমাধানগুলো দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি লক্ষ্যের ক্ষতি না করে।’

প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, গত বছর জ্বালানি সাশ্রয় ও পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কিছু দেশ পিছিয়ে পড়েছে। যদিও ১৫টি দেশ নিজেদের দক্ষতা মান উন্নত করেছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে সড়ক পরিবহনের মতো বড় খাতে কঠোর নিয়ম কার্যকরে বিলম্ব বা নীতিমালা শিথিল করা হয়েছে। সাময়িকভাবে এটি ব্যবসায়ী বা সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কমালেও ভবিষ্যতে জ্বালানি মূল্যের অস্থিরতায় তারা আরো বেশি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

আইইএর প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকট ১৯৭০-এর দশকের জ্বালানি সংকটের মতো বলে ধরে নেয়া হচ্ছে। এটি বিশ্বজুড়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এক নতুন ও গতিশীল ধাপের সূচনা করতে পারে।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..