✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৩-৩১, | ১৯:৫৬:৪৩ |গত চার বছরে ইউরোপ একাধিক ধাক্কা দেখেছে। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়। সে সময় ইউরোপীয় দেশগুলো রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমাতে ব্যাপক উদ্যোগ নেয়। নতুন সরবরাহ উৎস খোঁজা, এলএনজি আমদানি বাড়ানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি—সব মিলিয়ে একটি পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। তবুও বাস্তবতা হলো, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখনো তার মোট জ্বালানি চাহিদার অর্ধেকেরও বেশি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্যপথে যেকোনো বিঘ্ন বা ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
ইউরোপ আবারো জ্বালানি সংকটে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী কার্যত অচল হয়ে পড়া এবং ইরান ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের সামরিক অভিযান বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের সরবরাহে বড় ধাক্কা দিয়েছে। এর ফলে ইউরোপজুড়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়ে গেছে। জার্মানি, ইতালি ও ফ্রান্সের মতো বড় অর্থনীতিগুলো যখন মূল্যস্ফীতি ও শিল্প ব্যয়ের চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন একই সংকটে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অবস্থানে রয়েছে স্পেন। গত শনিবার স্পেনে প্রতি মেগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুতের দাম ছিল মাত্র ১৪ ইউরো, যেখানে একই সময়ে ইতালি, জার্মানি ও ফ্রান্সে সেই দাম ১০০ ইউরোরও বেশি ছিল। এই বিশাল পার্থক্য স্পেনকে ইউরোপের মধ্যে এক বিশেষ অবস্থানে নিয়ে এসেছে। তবে এটি কোনো আকস্মিক কৌশল নয়—গত এক দশকে ধারাবাহিক নীতিনির্ধারণ ও বিনিয়োগের ফল।
গত চার বছরে ইউরোপ একাধিক ধাক্কা দেখেছে। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়। সে সময় ইউরোপীয় দেশগুলো রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমাতে ব্যাপক উদ্যোগ নেয়। নতুন সরবরাহ উৎস খোঁজা, এলএনজি আমদানি বাড়ানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি—সব মিলিয়ে একটি পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। তবুও বাস্তবতা হলো, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখনো তার মোট জ্বালানি চাহিদার অর্ধেকেরও বেশি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্যপথে যেকোনো বিঘ্ন বা ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
বর্তমান সংকটে সেই দুর্বলতাই আবার সামনে এসেছে। হরমুজ প্রণালী প্রায় অচল হয়ে পড়ায় বাজারে সরবরাহ সংকট দেখা দিয়েছে। এর সঙ্গে ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ পরিস্থিতি যুক্ত হওয়ায় জ্বালানি মূল্য দ্রুত বাড়ছে। জার্মানি, ইতালি ও ফ্রান্সের মতো দেশগুলোতে বিদ্যুতের দাম হু হু করে বেড়েছে, যা শিল্প উৎপাদন ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
কিন্তু স্পেন কিভাবে স্থিতিশীল থাকছে? প্রথমত, স্পেনের জ্বালানি কাঠামো ইউরোপের মূলধারার দেশগুলোর তুলনায় ভিন্ন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো এখনো মোট জ্বালানি চাহিদার অর্ধেকের বেশি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে যেকোনো বিঘ্ন সরাসরি তাদের বাজারে প্রভাব ফেলে। কিন্তু স্পেন গত এক দশকে ধীরে ধীরে নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েছে, বিশেষ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে। বর্তমানে দেশটির বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ আসে সৌর ও বায়ু শক্তি থেকে। এর ফলে আন্তর্জাতিক গ্যাসের দাম বাড়লেও সেই প্রভাব সরাসরি বিদ্যুতের দামে প্রতিফলিত হয় না।
দ্বিতীয়ত, ইউরোপের বিদ্যুৎ বাজারে ব্যবহৃত ‘মার্জিনাল প্রাইসিং’ পদ্ধতিও এই পার্থক্য তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই ব্যবস্থায় বাজারের বিদ্যুতের দাম ঠিক হয় সবচেয়ে বেশি খরচে উৎপাদিত বিদ্যুতের ভিত্তিতে—যা সাধারণত গ্যাস থেকে আসে। তাই গ্যাসের দাম বাড়লেই বিদ্যুতের দামও বেড়ে যায়। কিন্তু স্পেনে যেহেতু নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বেশি, তাই গ্যাসনির্ভর উৎপাদনের প্রয়োজন কম পড়ে এবং মার্জিনাল প্রাইসিংয়ের প্রভাবও তুলনামূলকভাবে সীমিত থাকে। অন্যদিকে জার্মানি বা ইতালিতে গ্যাসের ভূমিকা বেশি হওয়ায় সেখানে এই মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি ভোক্তাদের ওপর পড়ে।
তৃতীয়ত, স্পেনের জ্বালানি ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য রয়েছে। সেটা হলো নবায়নযোগ্য উৎসের পাশাপাশি পারমাণবিক বিদ্যুৎ। সৌর ও বায়ু শক্তি স্বভাবতই পরিবর্তনশীল; কখনো উৎপাদন বেশি, কখনো কম। এই ওঠানামা সামাল দিতে স্পেনের পারমাণবিক বিদ্যুৎ একটি স্থিতিশীল বেসলোড সরবরাহ দেয়। ফলে বাজারে হঠাৎ ঘাটতি তৈরি হয় না এবং দামের অস্থিরতা কম থাকে। ইউরোপের অনেক দেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত ঝুঁকলেও এই ধরনের ব্যাকআপ কাঠামো তৈরি করতে পারেনি।
চতুর্থত, ভৌগলিক ও অবকাঠামোগত বাস্তবতা স্পেনকে আলাদা অবস্থানে রেখেছে। দেশটি ইউরোপের মূল গ্যাস পাইপলাইন নেটওয়ার্কের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে কম সংযুক্ত। এর ফলে ইউরোপের কেন্দ্রীয় গ্যাসবাজারে যে মূল্য অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার সরাসরি অভিঘাত স্পেনে কম পড়ছে। একই সঙ্গে স্পেনের রয়েছে ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ এলএনজি টার্মিনাল নেটওয়ার্ক, যা বিভিন্ন উৎস থেকে গ্যাস আমদানির সুযোগ তৈরি করে এবং সরবরাহ বৈচিত্র্য বাড়ায়।
তবে এই চিত্রের সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার প্রভাব দেশটির অর্থনীতিতেও পড়ছে, এবং সরকার ইতিমধ্যে বিলিয়ন ডলারের সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে যাতে ভোক্তাদের ওপর চাপ কমানো যায়।
দেশটির প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ সম্প্রতি ব্রাসেলসে এক বক্তব্যে দাবি করেছেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগই স্পেনকে এই সংকটে তুলনামূলক নিরাপদ রেখেছে। তার ভাষায়, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের ফলে গ্যাসের দাম বাড়লেও আমাদের গৃহস্থালির ওপর তার প্রভাব কম পড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্পেনের অবস্থান আসলে একটি কাঠামোগত সুবিধার ফল। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্বালানি নীতি বিশেষজ্ঞ জান রোজেনোর মতে, ২০১৯ সালের পর থেকে স্পেন তার বায়ু ও সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা দ্বিগুণ করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে জার্মানির পর সবচেয়ে বেশি নতুন নবায়নযোগ্য সক্ষমতা যুক্ত করেছে দেশটি। যা বর্তমান সংকটে একটি বড় সুরক্ষা বলয় হিসেবে কাজ করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপের বর্তমান জ্বালানি সংকট একটি বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছে যে শুধু সরবরাহ উৎস পরিবর্তন করলেই হবে না, বরং পুরো জ্বালানি কাঠামো পুনর্গঠন করতে হবে। স্পেন সেই প্রক্রিয়ায় অনেক দূর এগিয়ে থাকায় সংকটের ধাক্কা তুলনামূলকভাবে কম অনুভব করছে। বলা যায় এটা দেশটির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বিনিয়োগ এবং কাঠামোগত পরিবর্তনের ফল।