চার দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরান প্রতিরোধ অর্থনীতি নামে এক বিশেষ অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলেছে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাত, কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও বৈরী পরিস্থিতির মুখে এ ব্যবস্থারই এখন চূড়ান্ত পরীক্ষা চলছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। যুদ্ধের ভয়াবহতা সত্ত্বেও তেহরান দাবি করছে, দেশটির বিশেষ অর্থনৈতিক মডেল রাষ্ট্রকে ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করবে। খবর এফটি।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এ যুদ্ধে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী ইরানের ওপর ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় যেমন ইরানের শীর্ষ নেতাদের লক্ষ্য করা হয়েছে, তেমনি আঘাত হানা হয়েছে দেশটির সামরিক ও গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামোয়। এর মধ্যে রয়েছে জ্বালানি মজুদাগার, ইরানের বৃহত্তম গ্যাস কমপ্লেক্স, এমনকি ব্যাংক খাতও। বিশেষ করে শিল্প খাতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। গত শুক্রবার ইরানের অন্যতম দুটি বৃহৎ ইস্পাত কারখানায় হামলা চালানো হয় বলে জানায় তেহরান। উল্লেখ্য, ইরানের তেল-বহির্ভূত রফতানি আয়ের একটি বড় অংশ আসে ইস্পাত খাত থেকে। গত ইরানি বছরেও প্রায় ৭০০ কোটি ডলারের ইস্পাত পণ্য রফতানির লক্ষ্যমাত্রায় ছিল দেশটি। যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি ইরানের অর্থনীতিকে এমন এক সময় বিপদে ফেলেছে, যখন দেশটি আগে থেকেই চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল।
এত চাপের মধ্যেও বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের ‘প্রতিরোধ অর্থনীতি’ উদ্দেশ্য অনুযায়ী কাজ করছে। এ মডেলের মূল ভিত্তি হলো আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো। ইরান বর্তমানে ওষুধ, গাড়ির যন্ত্রাংশ ও ইলেকট্রনিকস পণ্য নিজেরাই তৈরি করছে, যা তারা বাইরে থেকে আমদানি করতে পারে না। এছাড়া আশির দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ইরান তার বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে সারা দেশে ছড়িয়ে দিয়েছে। ফলে হামলা চালিয়ে পুরো বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক ধ্বংস করা শত্রুপক্ষের জন্য অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে। বার্টার বা পণ্য বিনিময় প্রথাও ইরানের টিকে থাকার একটি বড় হাতিয়ার বলে উল্লেখ করেছেন বিশ্লেষকরা। দেশটি নিষেধাজ্ঞার ফাঁদ এড়াতে তেলের বিনিময়ে খাদ্য ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আমদানি করছে।
বিউরো অ্যান্ড বাজার ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী এসফান্দিয়ার বাতমাঙ্গেলিদজ জানান, যুদ্ধ ইরানের অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দিলেও এটি রাষ্ট্রকে পুরোপুরি অচল করে দিতে পারবে না। তার মতে, ইরানি কর্তৃপক্ষের মূল লক্ষ্য এখন অর্থনীতিকে স্বাভাবিকভাবে চালানো নয়, বরং বেসামরিক খাতের সম্পদ ব্যবহার করে যুদ্ধকালীন অর্থনীতি সচল রাখা।
যুদ্ধে একের পর এক বোমাবর্ষণ চললেও তেহরানের বাজারগুলোয় এখনো স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা করছে প্রশাসন। তেহরানের তাজরিশ বাজারের মতো জায়গাগুলোয় এখনো টাটকা ফল ও সবজি পাওয়া যাচ্ছে। সুপারমার্কেটগুলোয় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের কোনো ঘাটতি নেই বলে দাবি করছে কর্তৃপক্ষ। এছাড়া ইসরায়েলি হামলার পর জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় দ্রুত রেশনিং ব্যবস্থা চালু করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে।
ইরানের অর্থনীতির একটি বড় অংশ হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। যুদ্ধের কারণে নৌপথটি কার্যত অবরুদ্ধ থাকায় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বন্ধ রয়েছে। ফলে ইরান স্থলপথের ওপর জোর দিয়েছে। যদিও ইরান তার খাদ্যের ৮০ শতাংশ দেশেই উৎপাদন করে, তবু গম, ভোজ্য তেল ও চালের একটি বড় অংশ আমদানি করতে হয়। গবাদিপশুর খাদ্যের (সয়াবিন ও ভুট্টা) জন্যও দেশটি বিদেশের ওপর নির্ভরশীল। এ আমদানির একটি বড় অংশ সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই বা জেবেল আলী বন্দর হয়ে আসে। কিন্তু বর্তমানে আমিরাতের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কের টানাপড়েন এবং যুদ্ধের কারণে এ লজিস্টিক চেইন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিকল্প হিসেবে চীন ও উত্তর ইরানের মধ্যকার রেল যোগাযোগ এবং দক্ষিণ ইরানের চাবাহার বন্দরের মতো ছোট বন্দরগুলো ব্যবহারের চেষ্টা চলছে।
ভার্জিনিয়া টেকের অর্থনীতিবিদ জাভাদ সালেহি-ইসফাহানি বলেন, ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে শাহর আমল থেকে ইরানে একটি শক্তিশালী শিল্প ভিত্তি গড়ে উঠেছে। এটিই ইরানকে তার উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের থেকে আলাদা করে। দেশটি আমদানীকৃত পণ্যের বদলে দ্রুত দেশীয় পণ্য উৎপাদনে সক্ষম।
বিউরো অ্যান্ড বাজার ফাউন্ডেশনের সিইও জানান, তেল রফতানি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলেও ইরান প্রতি মাসে ধাতু, রাসায়নিক ও খাদ্যপণ্য রফতানি করে প্রায় ২০০ কোটি ডলার আয় করতে পারে।
সাবেক এক ইরানি অর্থনৈতিক কর্মকর্তার মতে, বর্তমান চাপের মুখেও ইরানের অন্তত এক বছর টিকে থাকার সক্ষমতা আছে, তবে সাধারণ মানুষের জীবন হয়ে উঠবে চরম দুর্বিষহ।
এ জাতীয় আরো খবর..