কেমন ছিল ১৯৭১ সালের ঈদ?

১৯৭১ সালে ঈদের নামাজ | একাত্তরের দিনপঞ্জি

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৩-১৭, | ২৩:২১:০১ |
‘আজ ঘরে কোনো আয়োজন নেই। তবু আমি সেমাই আর জর্দা রান্না করেছি। কার জন্য? নিজের সন্তানের জন্য নয়। হয়তো কোনো মুক্তিযোদ্ধা হঠাৎ দরজায় এসে দাঁড়াবে।‘

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্মের ঠিক আগ মুহুর্তের নভেম্বর মাসের এক ঈদ।

জাহানারা ইমাম তার ‘একাত্তরের দিনগুলি’ বইয়ে এভাবেই বর্ণনা করেছিলেন সেই ঈদের সকালকে।

বাংলার আকাশে সেদিন উৎসবের রং নয়, ছড়িয়ে ছিল বারুদের ধোঁয়া। শহরের বাতাসে সেমাইয়ের গন্ধের চেয়ে বেশি ভেসে বেড়াচ্ছিল লাশের গন্ধ। ঢাকার রাস্তায় ছিলনা ঈদের নামাজের ঢল, ছিল অস্বাভাবিক নীরবতা। এই শহর যেন সেদিন নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিল। কোথাও কোথাও ঈদের নামাজের জন্য মানুষ জড়ো হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সেই ভিড়ে ছিল না উৎসবের স্বতঃস্ফূর্ত উচ্ছ্বাস। অনেকের চোখে ছিল ক্লান্তি, অনেকের মুখে ছিল গভীর চিন্তার ছাপ।

সেবার ঈদে বহু ঘরের পুরুষ মানুষ ঘরেই ছিলনা। কেউ যুদ্ধের ময়দানে, কেউ বন্দী, কেউ বা নিখোঁজ। কত পরিবার জানেই না তাদের প্রিয়জন বেঁচে আছেন কি না। ঈদের সকালে তাই অনেক মায়েরা দরজার দিকে তাকিয়ে ছিলেন, হয়তো আজই হঠাৎ ফিরে আসবে হারিয়ে যাওয়া ছেলে।

এদিকে দেশের ভেতরে যুদ্ধ চললেও দেশের বাইরে তখন ছিল আরেক ভিন্ন বাস্তবতা। লাখো মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছিল ভারতের সীমান্তবর্তী শরণার্থী। অনেক শরণার্থী শিবিরে মানুষ খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে ঈদের নামাজ পড়েছিল। কারও গায়ে পুরোনো কাপড়, কারও পায়ে জুতা নেই। কিন্তু নামাজ শেষে যখন দোয়ার সময় এলো, হাজারো হাত একসাথে উঠেছিল, একটি মাত্র প্রার্থনায়। তা হল ‘বাংলাদেশের জন্ম।‘

ঈদের দিনেও যুদ্ধ থেমে থাকেনি। দেশের বিভিন্ন সীমান্তে মুক্তিযোদ্ধারা তখনও লড়াই করে যাচ্ছেন। উত্তরের সীমান্ত অঞ্চলে পাটগ্রাম সাব-সেক্টরে ক্যাপ্টেন মতিউর রহমান-এর নেতৃত্বে সেদিন মুক্তিযোদ্ধারা বোরখাতা এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর একটি শক্ত ঘাঁটির ওপর আক্রমণ চালান। কুমিল্লার রাজনগর এলাকাতেও সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়। সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালিয়ে দুই সৈন্যকে হত্যা করে এবং কয়েকজন রাজাকারকে বন্দী করে। ঈদের দিন রাতে যশোরে গরীবপুর গ্রাম দখল করে নেওয়া হয়, এবং পরদিন পাকিস্তানি বাহিনী পাল্টা আক্রমণ চালায়। এই সংঘর্ষ পরে ইতিহাসে পরিচিত হয় ‘ব্যাটেল অব গরীবপুর’ নামে।

ইতিহাসও যেন সেই প্রতিজ্ঞার জবাব দিতে দেরি করেনি। ঈদের মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর, ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতার সূর্যোদয় দেখেছিল।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..