নেপালের নির্বাচন

‘বালেন ইফেক্ট’ সৃষ্টিকারী র‍্যাপার থেকে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী, কে এই বালেন্দ্র

ভোট কেন্দ্রে র‍্যাপার থেকে রাজনীতিক হওয়া বালেন্দ্র শাহ। ছবি : রয়টার্স

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৩-০৬, | ১৯:৪২:০৭ |
নেপালে বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হয়েছে সাধারণ নির্বাচন। জেন-জি বিক্ষোভে গত সেপ্টেম্বরে দেশটির সরকার পতনের পর এটিই প্রথম সাধারণ নির্বাচন। এতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে র‍্যাপার থেকে রাজনীতিক হওয়া কাঠমাণ্ডুর সাবেক মেয়র বালেন নামে পরিচিত বালেন্দ্র শাহর দল ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির দল। 

এখন পর্যন্ত যতগুলো কেন্দ্রের ফলাফল পাওয়া গেছে তার মধ্যে এক-তৃতীয়াংশের বেশি কেন্দ্রে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে বালেন্দ্রের দল।


এ ছাড়া কে পি শর্মা ওলির নিজ কেন্দ্রেও জয় পেয়েছেন বালেন্দ্র।
সেপ্টেম্বরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিষিদ্ধ করার প্রতিবাদ তীব্র হয়ে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেওয়ার পর নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি পদত্যাগ করেন।

তখন থেকেই দেশটির পরবর্তী নেতৃত্বের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি উঠে এসেছে বালেন্দ্র শাহের নাম। ৩৩ বছর বয়সী শাহ বিক্ষোভকারীদের মাঝে একটি গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ হয়ে উঠেছিল।


সে সময় তিনি লিখেছিলেন, ‘আমার সম্পূর্ণ সহমর্মিতা তরুণদের প্রতি।’ 
বয়সসীমার কারণে সরাসরি বিক্ষোভে যোগ দিতে পারছেন না জানিয়ে তিনি আরো বলেছিলেন, ‘এই সমাবেশ নিঃসন্দেহে জেন-জি প্রজন্মের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন, যাদের কাছে আমিও হয়তো বয়স্ক মনে হতে পারি। আমি তাদের আকাঙ্ক্ষা, লক্ষ্য আর চিন্তাভাবনা বুঝতে চাই।’

গত কয়েক বছরে তিনি উদীয়মান নেতা হিসেবে খ্যাতি পেয়েছেন।


টাইম ম্যাগাজিনের ‘টপ ১০০ এমার্জিং লিডারস’-এ স্থান পাওয়ার পর থেকেই আলোচনায় আসেন। স্বচ্ছতা আর তৃণমূলনির্ভর রাজনীতির জন্য জনপ্রিয়তা পান বালেন্দ্র। সিভিল ইঞ্জিনিয়ার থেকে র‌্যাপার, আর র‌্যাপার থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে কাঠমাণ্ডুর মেয়র নির্বাচনে জয় লাভ করেন বালেন্দ্র। 
শহরের রাস্তা পরিষ্কার, সরকারি শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং কর ফাঁকি দেওয়া বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো উদ্যোগ তাকে ব্যাপক প্রশংসা এনে দিয়েছে।

ওলির পদত্যাগের পর সেসময় জনসমক্ষে এক বিবৃতি দিয়েছিলেন তিনি।


সেখানে তিনি তরুণদের আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে ও দেশের ভবিষ্যতের দায়িত্ব নিতে আহ্বান জানান। আবেগপূর্ণ ও দৃঢ় বার্তায় তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা স্পষ্ট বলেছি, এটি একেবারেই জেন জি আন্দোলন। প্রিয় জেন-জি, তোমাদের হত্যাকারীর পদত্যাগ হয়ে গেছে। এখন ধৈর্য ধরো।’
তিনি আরো বলেছিলেন, ‘দেশের মানুষ ও সম্পদের ক্ষতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দেশের মানুষের ক্ষতি মানে আমাদের নিজেদের ক্ষতি। এখন আমাদের সংযমী হওয়া জরুরি।’

তার এই পরিণত অভিব্যক্তিই তাকে আরো প্রশংসা এনে দেয়।

রাজনীতিতে শাহর উত্থান একেবারেই অপ্রচলিতভাবে। ছাদের ওপর গান গেয়ে ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন র‌্যাপার হিসেবে, যেখানে উঠে আসত দারিদ্র্য, উন্নয়নহীনতা আর রাজনৈতিক দুর্নীতির কথা। 

তার জনপ্রিয় গান ‘বলিদান’ ইউটিউবে সাত মিলিয়নেরও বেশি ভিউ পেয়েছে, যা নেপালের হতাশ তরুণ প্রজন্মের হৃদয়ে দাগ কেটেছে।

শুধু শিল্পী নন, শাহ পড়াশোনা করেছেন স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। ২০২২ সালের মেয়র নির্বাচনে সেই পেশাগত দক্ষতার সঙ্গে তার জনমানসের জনপ্রিয়তাকে মিলিয়ে নিজেকে উপস্থাপন করেন দক্ষ ও বাস্তববাদী প্রার্থী হিসেবে।
 
অভিনব প্রচারণায় তার চিহ্ন হয়ে ওঠে কালো ব্লেজার, জিন্স, বর্গাকৃতি সানগ্লাস ও কাঁধে জড়ানো নেপালি পতাকা। পতাকা ব্যবহারে নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ উঠলেও জনপ্রিয়তা আরো বেড়ে যায়।

শাহ কেবল মেয়র হিসেবে আলোচনায় আসেননি, তার সাফল্যকে বলা হচ্ছে ‘বালেন ইফেক্ট’—যা নেপালের রাজনীতিতে প্রজন্মগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। শাহর সাফল্য অনেক তরুণকে বিশ্বাস করিয়েছে, নেপালের দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝেও পরিবর্তন আনা সম্ভব।

‘দেশ রক্ষা করে যারা, তারা বোকা। সব নেতা চোর, দেশ লুটে খাচ্ছে’—এমন তীব্র রাজনৈতিক সমালোচনাই ছিল একসময় র‌্যাপার বালেন শাহর গানের কথা। এখন সেই বালেন শাহই নেপালের সম্ভাব্য পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী, আর তার উত্থান অনুপ্রেরণা দিয়েছে তরুণদের—রাজনীতিতে প্রবেশ করে পরিবর্তন আনার জন্য।

জেন-জি প্রজন্মের আন্দোলনে প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলির পদত্যাগ করার পর থেকেই তরুণ প্রজন্ম চেয়েছি, বালেন্দ্র দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিক। এবার নির্বানের মাঠেও তিনি এগিয়ে আছেন।

এখন দেখার পালা বালেন্দ্র শাহ নির্বাচিত হয়ে দেশের উন্নয়নেও ‘বালেন ইফেক্ট’ আনতে পারেন কিনা।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..