আল জাজিরার এক্সপ্লেইনার

ইরান যুদ্ধে কী কী অস্ত্র ব্যবহার করছে যুক্তরাষ্ট্র, খরচ কত?

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৩-০৩, | ১৭:৫৭:২৭ |
ইরানে সাম্প্রতিক মার্কিন-ইসরাইলি হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তেহরানের দীর্ঘদিনের উত্তেজনা প্রবেশ করেছে নতুন পর্যায়ে। গেল শনিবারের (২৮ ফেব্রুয়ারি) ওই হামলা দুই পক্ষের মধ্যে প্রকাশ্য সামরিক সংঘাতের সূচনা করেছে।


মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানে তাদের সামরিক অভিযান চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, ওয়াশিংটন কি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন একটি যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদে চালিয়ে যেতে পারবে? এবং এর সম্ভাব্য ব্যয় কত হতে পারে? 

 
অপারেশন ‘এপিক ফিউরি’ কী? 
 ২৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট করা আট মিনিটের এক ভিডিও বার্তায় নিশ্চিত করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ভেতরে ‘একটি বড় ধরনের সামরিক অভিযানে’ অংশ নিয়েছে।
 
পরে পেন্টাগন জানায়, এই মিশনের নাম দেয়া হয়েছে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’।
 
ট্রাম্প বলেন, ‘অভিযানের লক্ষ্য হলো ইরান যেন পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে তা নিশ্চিত করা। আমরা তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করব এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্র শিল্পকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেব। এটি সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।’
 
মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, শনিবার অভিযান শুরুর পর থেকে ইরানে ১ হাজার ২৫০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। পৃথক এক বিবৃতিতে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, তারা ইরানের ১১টি জাহাজে হামলা চালিয়ে ধ্বংস করেছে।
 
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই অভিযানে বিমান হামলা, সমুদ্র থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং পারমাণবিক-সম্পর্কিত স্থাপনা ও ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিদের ওপর সমন্বিত আক্রমণ অন্তর্ভুক্ত ছিল।
 

১৯৮৯ সাল থেকে নেতৃত্বে থাকা ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি তেহরানে প্রথম দফার মার্কিন-ইসরাইলি হামলায় নিহত হন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এর মধ্যেই সোমবার (২ মার্চ) ট্রাম্প ঘোষণা দেন, প্রয়োজন হলে যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে পারে। সোমবার পর্যন্ত ইরানের রেড ক্রিসেন্ট জানায়, ইরানজুড়ে ১৩০টি স্থানে হামলায় অন্তত ৫৫৫ জন নিহত হয়েছেন। 
 
২০২৩ সাল থেকে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র কত ব্যয় করেছে? 
 

ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৫ সালের ‘কস্টস অব ওয়ার’ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে প্রায় ২১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার সামরিক সহায়তা দিয়েছে।
 
এছাড়া ইয়েমেন, ইরান এবং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলকে সমর্থন জানিয়ে মার্কিন সামরিক অভিযানে ৯ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন থেকে ১২ দশমিক ০৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে।
 
সব মিলিয়ে, সংশ্লিষ্ট সংঘাত ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩১ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন থেকে ৩৩ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার এবং তা আরও বাড়ছে। 
 
ইরান যুদ্ধে কোন অস্ত্র ব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে? 
 

সেন্টকম-এর তথ্য অনুযায়ী, অপারেশন এপিক ফিউরিতে আকাশ, সমুদ্র, স্থল ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা বাহিনী মিলিয়ে ২০টিরও বেশি অস্ত্রব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়েছে।
 
মার্কিন বাহিনী জানায়, ইরানের ভেতরে এক হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে ব্যবহৃত হয়েছে ২০টির বেশি ভিন্ন অস্ত্রব্যবস্থা। 
 

 
সেন্টকমের সাবেক অপারেশনস পরিচালক কেভিন ডোনেগান আল জাজিরাকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের এখন লক্ষ্য হলো ইরানের আক্রমণাত্মক সক্ষমতাকে যত দ্রুত সম্ভব দুর্বল করা, যাতে তারা আর ব্যাপক ক্ষতি করতে না পারে।’ 
 
এয়ার পাওয়ার 
 

অভিযানে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে মার্কিন বিমান শক্তি, যার মধ্যে রয়েছে:
 
বি-১ বোমারু বিমান, বি-২ স্টেলথ বোমারু বিমান (গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনায় হামলায় ব্যবহৃত), এফ-৩৫ লাইটনিং টু ও এফ-২২ র‌্যাপ্টর স্টেলথ যুদ্ধবিমান, এফ-১৫ যুদ্ধবিমান (কুয়েতে তিনটি বিধ্বস্ত হয়েছে), এফ-১৬ ফাইটিং ফ্যালকন, এফ/এ-১৮ সুপার হর্নেট এবং এ-১০ অ্যাটাকার জেট।
 
এছাড়াও ব্যবহার করা হয়েছে, ইএ-১৮জি গ্রাউলার (শত্রু পক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অকার্যকরা করা ও ইলেকট্রনিক হামলায় ব্যবহৃত), এডব্লিউএসিএস বিমান (কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ সহায়তায়), ড্রোন ও দূরপাল্লার হামলা-ব্যবস্থা, লুকাস ড্রোন (ইরানি নকশা থেকে রিভার্স-ইঞ্জিনিয়ার করা স্বল্পমূল্যের একমুখী ড্রোন) এবং এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন।
 
ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানে আরও ব্যবহার হচ্ছে এম-১৪২ হিমার্স রকেট আর্টিলারি, টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, থাড (টার্মিনাল হাই অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স) এবং কাউন্টার-ড্রোন সিস্টেম। 
 
নৌ-শক্তি 
 

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যাপক নৌ-শক্তিও ব্যবহার করছে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যে রয়েছে:
 
বিমানবারী রলণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড ও ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন-এর নেতৃত্বে দুটি ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ, পি-৮ পোসেইডন নজরদারি বিমান, সি-১৭ গ্লোবমাস্টার, সি-১৩০ হারকিউলিস ও আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী ট্যাঙ্কার। 
 

 ইরান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের কত খরচ হতে পারে? 
 
চলমান সামরিক অভিযানের মোট খরচ কত হবে তা এখনই বলা কঠিন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন করে শুরু হওয়া এ যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কত খরচ হতে পারে তা এখনই বলা সম্ভব নয়।
 
স্টিমসন সেন্টারের সিনিয়র ফেলো ক্রিস্টোফার প্রেবল আল জাজিরাকে বলেন, ‘পেন্টাগন সেই তথ্য (খরচের) প্রকাশ করেনি, এবং তাই আমরা কেবল অনুমান করতে পারি... তবে অনেক তথ্য আছে এবং আমরা পৃথক অস্ত্রের দাম সম্পর্কে অনুমান করতে পারি। অভিযানের খরচ, নৌ অভিযান সম্পর্কে অনুমান করা যায়।’
 
সংবাদ সংস্থা আনাদোলুর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অপারেশন এপিক ফিউরির প্রথম ২৪ ঘণ্টাতেই যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৭৭৯ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে থাকতে পারে। হামলার আগে সামরিক প্রস্তুতি, বিমান স্থানান্তর, এক ডজনের বেশি নৌযান মোতায়েন ও আঞ্চলিক সম্পদ সক্রিয়করণ মিলিয়ে অতিরিক্ত ৬৩০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
 
সেন্টার ফর নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির মতে, একটি ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ পরিচালনা করতে দৈনিক প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার খরচ হয়। এছাড়া সরঞ্জাম হারানোর ব্যয়ও রয়েছে।
 
এরমধ্যে কুয়েতে এক ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ার’-এর ঘটনায় অন্তত তিনটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন কর্মকর্তারা।
 
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় উদ্বেগ অর্থনৈতিক নয়, বরং অস্ত্রভাণ্ডারের মজুত। প্রেবল বলেন, ‘ব্যয় (যুদ্ধের) বহন করা সম্ভব। আমি বলতে চাইছি, যুক্তরাষ্ট্রের ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা বাজেট রয়েছে এবং ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারে যাওয়ার অনুরোধ আছে, যা আমার কাছে ভয়াবহ মনে হলেও প্রেসিডেন্ট এর জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’ 
 

কিন্তু প্রশ্ন হলো অস্ত্রের প্রকৃত মজুত, বিশেষ করে প্যাট্রিয়ট বা এসএম-৬ এর মতো ইন্টারসেপ্টর রকেট। প্রেবল সতর্ক করে বলেন, উচ্চ হারে প্রতিরোধ অভিযান অনির্দিষ্টকাল চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তার মতে, ‘বর্তমান গতিতে ইন্টারসেপশন অভিযান দীর্ঘদিন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়, সম্ভবত কয়েক সপ্তাহের বেশি নয়।’
 
স্টিমসন সেন্টারের এই সিনিয়র ফেলো আরও উল্লেখ করেন, জুনে ইরানের সঙ্গে ১২ দিনের সংঘাতের সময়ও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইন্টারসেপ্টর মজুত কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। এসব ক্ষেপণাস্ত্রের কিছু ইউক্রেন ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের জন্যও নির্ধারিত।
 
ক্রিস্টোফার প্রেবল বলেন, ‘প্যাট্রিয়ট বা এসএম-৬ অত্যন্ত জটিল সরঞ্জাম। এগুলো প্রতিদিন শত বা হাজার সংখ্যায় উৎপাদন করা হয় না। উৎপাদনের গতি সীমিত।’

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..