আকাশে ৪ সেকেন্ডের আতঙ্ক: নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল এয়ার ইন্ডিয়ার সেই বিমান!

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৮-১৪, | ১০:১৬:২২ |

আকাশপথে ওড়ার সময় মাত্র ৪ সেকেন্ডের জন্য পুরোপুরি চালকবিহীন ও ফ্লাইট কন্ট্রোলমুক্ত হয়ে পড়েছিল এয়ার ইন্ডিয়ার একটি বিমান। থাইল্যান্ডের ফুকেট থেকে নয়াদিল্লিগামী এআই-২৩৭৯ নম্বর ফ্লাইটে ঘটে যাওয়া এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় বিমানটি এক ধাক্কায় ৩০০ ফুট নিচে নেমে যায়। 

বিশ্বখ্যাত বিমান প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ‘এয়ারবাস’-এর প্রাথমিক ব্ল্যাক বক্স (ডিজিটাল ফ্লাইট ডাটা রেকর্ডার) বিশ্লেষণের বরাত দিয়ে প্রস্তুত করা ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক বিশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে। 

এয়ারবাসের প্রাথমিক মূল্যায়নে উঠে এসেছে, একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বিমানটির তিনটি প্রধান হাইড্রোলিক সিস্টেমই হঠাৎ ব্যর্থ হয়ে পড়ে। এর ফলে বিমানের গতিপথ ও দিক নিয়ন্ত্রণের জন্য অতিপ্রয়োজনীয় এলিভেটর, এইলারন এবং স্পয়লার পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় হয়ে নিজেদের মতো চলতে শুরু করে। যা এই ধরনের বাণিজ্যিক উড়োজাহাজের ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল এবং নজিরবিহীন এক ঘটনা।

ফ্লাইট চলাকালীন উক্ত চার সেকেন্ডে বিমানের এলিভেটর এবং এইলারনগুলো পাইলটের কোনো নির্দেশনা ছাড়াই একা একা নড়াচড়া করতে থাকে। সাধারণত বিমানের সামনের অংশকে ওপরে বা নিচে নামাতে এলিভেটর, ডানার ভারসাম্য বজায় রাখতে এইলারন এবং বিমানের গতি কমাতে বা নামতে সাহায্য করতে স্পয়লার ব্যবহৃত হয়, যা পুরোটাই হাইড্রোলিক পাওয়ারের ওপর নির্ভরশীল। এই সময় বিমানটির অটো-পাইলট সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায় এবং ককপিটে স্টল ওয়ার্নিং (ডানা পর্যাপ্ত লিফট হারালে যে সতর্কতা সংকেত বাজে) বেজে ওঠে। বিপদ টের পেয়ে বিমান পরিচালনায় নিযুক্ত কো-পাইলট সম্ভাব্য ক্র্যাশ এড়াতে স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর অনুসরণ করে কন্ট্রোল স্টিক সামনের দিকে চেপে ধরেন। কিন্তু হাইড্রোলিক পাওয়ার সচল না থাকায় বিমানটি কোনো তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। চার সেকেন্ড পর হাইড্রোলিক ব্যবস্থা সচল হলে বিমানটি হঠাৎ করে খাড়া নিচে নেমে যেতে শুরু করে। তীব্র ঝাঁকুনিতে চালক নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেলেও ততক্ষণে যাত্রীদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং সিটবেল্ট না বাঁধা অনেক যাত্রী ও কেবিন ক্রু ছিটকে গিয়ে সজোরে বিমানের ছাদে আঘাত পান, যার ফলে বেশ কয়েকজন মারাত্মক আহত হন।

এনডিটিভি জানতে পেরেছে যে, ৭.৮ বছর পুরোনো এ-৩২০ নিও মডেলের এই বিমানটির যাবতীয় তথ্য ফ্রান্সে অবস্থিত এয়ারবাসের ২৪ ঘণ্টার কারিগরি পর্যবেক্ষণকেন্দ্র ‌‘এয়ারট্যাক’-এ পাঠানো হয়। বোয়িং বা এয়ারবাসের উড়োজাহাজ থেকে ‘এসিএআরএস’ ব্যবস্থার মাধ্যমে তথ্য পাঠানো ছাড়াও অবতরণের পরপরই এয়ারলাইন্সের পক্ষ থেকে ব্ল্যাক বক্সের পূর্ণাঙ্গ ডাটা সংগ্রহ করে ফ্রান্সে পাঠানো হয়। উক্ত ডাটা বিশ্লেষণ করে গত ৫ আগস্ট মধ্যরাতে, অর্থাৎ ঘটনার প্রায় ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর এয়ার ইন্ডিয়ার কাছে প্রাথমিক রিপোর্ট জমা দেয় এয়ারবাস। তাদের প্রাথমিক প্রতিবেদনে এই জরুরি পরিস্থিতির পেছনে একটি ত্রুটিপূর্ণ প্রেশার সেন্সরকে দায়ী করা হলেও এটিই মূল কারণ কি না, তা নিয়ে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। একই সঙ্গে এয়ারবাস এখনো পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত দিকনির্দেশনাও প্রদান করেনি।

বর্তমানে এই ঘটনার তদন্ত অনেক দূর গড়িয়েছে। এয়ারবাস এবং ফরাসি দুর্ঘটনা তদন্তকারী সংস্থা বিইএ-এর একটি যৌথ প্রতিনিধিদল দিল্লিতে পৌঁছে বৃহস্পতিবার বিমানটি পরিদর্শন করেছে। তাদের প্রাথমিক শারীরিক পরীক্ষার নতুন তথ্যগুলো ভারতের জাতীয় সংস্থা ‘এয়ারক্রাফট অ্যাকসিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো’-র কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পুরো ঘটনাটি ভারতের বেসামরিক বিমান চলাচল খাতের নিরাপত্তার ওপর বড় ধরনের প্রশ্নচিহ্ন দাঁড় করিয়েছে।

অন্যদিকে, এই বিপজ্জনক ফ্লাইট বিপর্যয়ে বিমানটির মূল পাইলট ইন কমান্ড, ক্যাপ্টেন সুদীপ বশিষ্ঠের আচরণগত কোনো ভূমিকা ছিল কি না তা নিয়েও আলাদা তদন্ত চলছে। যদিও দুর্ঘটনার সঙ্গে উড়োজাহাজটির কারিগরি ত্রুটির সুনির্দিষ্ট সম্পর্ক এখন পর্যন্ত নিশ্চিত নয়, তবু ঘটনার পর বিমানবন্দরে করা দুটি প্রস্রাব পরীক্ষায় সুদীপ বশিষ্ঠের শরীরে মারিজুয়ানা (গাঁজা)-র উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এমনকি ফ্লাইটের একজন কেবিন ক্রু অভিযোগ করেন যে, পাইলট ফ্লাইট শুরুর আগে গাঁজা সেবন করেছিলেন। এই গুরুতর অপরাধ ও নিরাপত্তার চরম লঙ্ঘনের বিষয়টি সামনে আসার পর এয়ার ইন্ডিয়া এবং এয়ার ইন্ডিয়া এক্সপ্রেসের সব পাইলটদের জন্য শরীরে কোনো নিষিদ্ধ মাদক বা উপাদানের উপস্থিতি আছে কি না, তা নিশ্চিতে বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্য পরীক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..