বিশ্বজুড়ে যখন জনসংখ্যা কমে যাওয়ার আশঙ্কা নিয়ে নানা আলোচনা, তখন ভিন্ন এক পথে হাঁটার ইঙ্গিত দিচ্ছে চীন। জন্মহার রেকর্ড পরিমাণে নেমে আসায় দেশটির ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, শ্রমবাজার আর বৃদ্ধ জনগোষ্ঠীর ভার সামলানো নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে। সন্তান জন্মদানে উৎসাহ দিতে নগদ প্রণোদনা থেকে শুরু করে কর ছাড়, এমনকি বিয়ে সহজ করার মতো নীতিও চালু হয়েছে, কিন্তু তাতে কাঙ্ক্ষিত ফল মেলেনি। ঠিক এই বাস্তবতার মধ্যেই নতুন আশার আলো হয়ে উঠছে রোবট আর স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি।
বেইজিংয়ের প্রযুক্তি বাজারগুলোতে এখন রোবট যেন এক নতুন কৌতূহলের নাম। দোকানের কাঁচঘেরা প্রদর্শনী কক্ষে ছোট ছোট শিশু বিস্মিত চোখে দেখছে চলমান যান্ত্রিক মানবকে। কারখানার অন্ধকার ঘরে, যেখানে মানুষের চোখের জন্য বাতির প্রয়োজন নেই, সেখানে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে ধাতব বাহু। গাড়ি জোড়া লাগানো থেকে সূক্ষ্ম যন্ত্রাংশ সাজানো সবকিছুই যেন এক নিখুঁত ছন্দে সম্পন্ন হচ্ছে মানুষের বদলে যন্ত্রের হাতে।
চীনের নেতৃত্ব বহু বছর ধরেই শিল্পখাতে আধুনিকায়ন আর স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার দিকে জোর দিয়ে আসছে। এখন সেই পরিকল্পনা নতুন মাত্রা পেয়েছে জনসংখ্যা সংকটের বাস্তবতায়। দেশটিতে ষাটোর্ধ্ব মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, আর তরুণ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী কমছে। এই ভারসাম্যহীনতা পেনশন ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য ব্যয় আর উৎপাদনশীলতার ওপর বড় চাপ তৈরি করছে। তাই প্রযুক্তিকে সামনে এনে এক নতুন সমাধান খুঁজছে কর্তৃপক্ষ।
শুধু কারখানাই নয়, ভবিষ্যতে বৃদ্ধদের সেবাতেও রোবটের উপস্থিতি বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এমন কল্পনাও এখন বাস্তব আলোচনার অংশ যেখানে দিনরাত বৃদ্ধদের পাশে থাকবে যান্ত্রিক সহকারী, মনে করিয়ে দেবে ওষুধ খাওয়ার সময়, এমনকি হাঁটাচলায়ও সাহায্য করবে। এক সন্তানের পরিবার নীতির দীর্ঘ প্রভাব এখন স্পষ্ট, যেখানে একমাত্র সন্তানের কাঁধেই বাবা মায়ের দায়িত্ব এসে পড়ে। সেখানে প্রযুক্তিনির্ভর সহায়তা হয়ে উঠতে পারে এক বিকল্প ভরসা।
তবে এই রূপান্তরের পথ একেবারেই মসৃণ নয়। স্বয়ংক্রিয়তার ঢেউ যেমন উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে, তেমনি কর্মসংস্থানে তৈরি করতে পারে অনিশ্চয়তা। বহু মানুষের কাজ হারানোর আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তি যেমন ভবিষ্যতের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে পারে, তেমনি সঠিক পরিকল্পনা না থাকলে সামাজিক চাপও বাড়াতে পারে বহুগুণ।
তবু চীনের প্রযুক্তিনির্ভর অগ্রযাত্রা থেমে নেই। নৃত্যরত যান্ত্রিক মানব থেকে ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া রোবট সব মিলিয়ে যেন এক নতুন যুগের সূচনা দৃশ্যমান। জনসংখ্যা সংকটের অন্ধকারে তাই প্রযুক্তির আলোয় ভরসা খুঁজছে দেশটি, যেখানে ভবিষ্যতের শ্রমশক্তি হয়তো হবে মাংস রক্ত নয়, বরং ধাতু আর প্রোগ্রামের সমন্বয়ে গড়া এক নতুন সত্তা।
সূত্র : সিএনএন
এ জাতীয় আরো খবর..