খুলনায় এইচআইভি সংক্রমণ এখন আর শুধু নির্দিষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ধীরে ধীরে সাধারণ জনগোষ্ঠীর মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে এই ভাইরাস। গত আট মাসে নতুন শনাক্ত ৫৫ জনের মধ্যে ১১ জনই সাধারণ মানুষ। একই সময়ে এইডসজনিত জটিলতায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৭ জন। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক সংকোচ, অনিয়মিত পরীক্ষা এবং সচেতনতার অভাবে সরকারি পরিসংখ্যানের বাইরে আরও অনেক আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি (এআরটি) কর্নারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত আট মাসে ৭৩৫ জনের এইচআইভি পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ৫৫ জনের শরীরে ভাইরাসটির উপস্থিতি ধরা পড়ে।
নতুন আক্রান্তদের মধ্যে ৩৭ জন পুরুষ এবং ১৮ জন নারী। ঝুঁকিভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সর্বোচ্চ ২২ জন সমকামী পুরুষ। এ ছাড়া সাতজন নারী যৌনকর্মী, ছয়জন পুরুষ যৌনকর্মী, ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারী একজন নারী এবং আক্রান্ত ব্যক্তির আটজন সঙ্গী শনাক্ত হয়েছেন।
তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন করেছে সাধারণ জনগোষ্ঠীর ১১ জনের আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি। তাদের মধ্যে পাঁচজন পুরুষ ও ছয়জন নারী। বিশেষজ্ঞদের মতে, সংক্রমণ যখন ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর বাইরে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে, তখন তা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় সতর্কবার্তা।
২০১৭ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের এআরটি কর্নারে মোট ৭ হাজার ৭৭৩ জনের এইচআইভি পরীক্ষা করা হয়েছে। এ সময় ৯৬৪ জন আক্রান্ত হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৬০৩ জন পুরুষ, ৩৫৩ জন নারী এবং আটজন তৃতীয় লিঙ্গের।
নিবন্ধিত রোগীদের মধ্যে সাধারণ জনগোষ্ঠীর সদস্যই সবচেয়ে বেশি- ৪৫০ জন। এ ছাড়া সমকামী ২৪০ জন, নারী যৌনকর্মী ১১০ জন, পুরুষ যৌনকর্মী ৬৭ জন, আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গী ৩৭ জন, যৌনকর্মীদের ১৫ জন খদ্দের, বিদেশফেরত ২৬ জন, ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারী দুজন এবং আটজন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ রয়েছেন। এ সময়ে মারা গেছেন ১৩৫ জন।
পরিসংখ্যান বলছে, গত আট মাসে প্রায় প্রতি মাসেই ছয় থেকে আটজন নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। অর্থাৎ সংক্রমণ বিচ্ছিন্নভাবে নয়, ধারাবাহিকভাবেই ঘটছে।
খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চর্ম ও যৌনরোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও এআরটি ফোকাল পারসন ডা. মোহাম্মদ ইউনুস আলী বলেন, “যত বেশি মানুষ পরীক্ষার আওতায় আসবেন, ততই প্রকৃত পরিস্থিতি জানা যাবে। বিশেষ করে যৌনকর্মী, ভাসমান জনগোষ্ঠী এবং অনিরাপদ যৌন সম্পর্কে জড়িতদের নিয়মিত পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি নিরাপদ যৌন আচরণ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি”।
খুলনার সিভিল সার্জন ডা. মাহফুজা খাতুন বলেন, “সরকারি ব্যবস্থাপনায় খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের এআরটি কর্নারে বিনামূল্যে পরীক্ষা ও ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে সামাজিক লজ্জা ও বৈষম্যের ভয়ে অনেকেই পরীক্ষা করাতে চান না, ফলে সংক্রমণ শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ—দুই ক্ষেত্রেই জটিলতা তৈরি হচ্ছে”।
খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. শেখ মোশারফ হোসেন বলেন, “শুধু চিকিৎসা দিয়ে এইচআইভি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। সচেতনতা বাড়াতে হবে, ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ এড়িয়ে চলতে হবে এবং মানুষকে স্বেচ্ছায় পরীক্ষার আওতায় আনতে হবে। খুলনায় আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধির প্রবণতা জনস্বাস্থ্যের জন্য স্পষ্ট সতর্কবার্তা”।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে খুলনায় ১ হাজার ৫৪৭ জনের পরীক্ষা করে ৮৫ জন নতুন আক্রান্ত শনাক্ত হয় এবং ২০ জনের মৃত্যু হয়। ২০২৩ সালে আক্রান্ত শনাক্ত হন ৬৫ জন, মৃত্যু হয় ১৯ জনের। ২০২২ সালেও নতুন আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৬৫, তবে সে বছর মৃত্যু হয়েছিল ২৪ জনের।
এ জাতীয় আরো খবর..