যে খেলায় টিকলেন রোনালদো, সেই খেলাতেই ডুবলেন মদ্রিচ

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৭-০৩, | ১১:২৪:৩৫ |

টরোন্টো স্টেডিয়ামে তখন যোগ করা সময়ের ১৩তম মিনিটের খেলা চলছে। পর্তুগালের বিপক্ষে ২-১ ব্যবধানে পিছিয়ে থাকা ক্রোয়েশিয়া যখন জোসকো গভার্দিওলের গোলে সমতায় ফিরল, গ্যালারিতে তখন বুনো উল্লাস। ডাগআউটে বসে থাকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর চোখে-মুখে তখন একরাশ হতাশা। ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে গড়াচ্ছে; এমনটাই যখন নিশ্চিত মনে হচ্ছিল, ঠিক তখনই দৃশ্যপটে হাজির ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভার)। প্রিমিয়ার লিগের অফিশিয়াল জ্যারেড জিলেটের কলিংয়ে মাঠের রেফারি এস্পেন এসকাস দীর্ঘ সময় ধরে মনিটরে রিপ্লে দেখতে লাগলেন। খালি চোখে বা সাধারণ ভিডিওতে ক্রোয়েশিয়ার ইগর মাতানোভিচের মাথায় বল লেগেছিল কি না, তা স্পষ্ট ছিল না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত স্নিকোমিটার প্রযুক্তির গ্রাফে ধরা পড়া একটি সূক্ষ্ম কম্পন নিশ্চিত করে যে বলটি মাতানোভিচের মাথা ছুঁয়েই গিয়েছিল। অফসাইডের কারণে বাতিল হয়ে যায় গোলটি। আর এই একটি সিদ্ধান্তেই চূর্ণ হয়ে যায় ক্রোয়েশিয়ার বিশ্বকাপ স্বপ্ন।

ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার পর মাঠজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে উত্তেজনা। ক্ষুব্ধ ক্রোয়াট সমর্থকরা মাঠে প্লাস্টিকের বোতল ছুড়ে মারতে থাকেন। তবে সব ছাপিয়ে এই ম্যাচের নির্মম ট্র্যাজেডি হয়ে রইল লুকা মদ্রিচের বিদায়। ৪০ বছর বয়সী এই ক্রোয়াট কিংবদন্তির বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের যে এভাবে করুণ সমাপ্তি ঘটবে, তা হয়তো কেউ ভাবেনি। অন্যদিকে, ম্যাচের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর বোন এই টুর্নামেন্টকে সিআরসেভেনের ‘লাস্ট ডান্স’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। সেই মহানাট্যীয় যাত্রার আয়ু আরও কিছুটা বাড়ল ভিএআর-এর কল্যাণে। বাতিল হওয়া গোল, পেনাল্টি বিতর্ক, রোনালদোকে নিয়ে নাটকীয়তা আর প্রযুক্তির চুলচেরা বিশ্লেষণ, সব মিলিয়ে ১০৫ মিনিটের এক অবিশ্বাস্য ফুটবল উপাখ্যান প্রত্যক্ষ করল বিশ্ব।

বিশ্বকাপে এবারই প্রথম ফুটবলে ক্রিকেট শৈলীর স্নিকোমিটারের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। চলতি বিশ্বকাপের অফিসিয়াল ‘ট্রিওন্ডা’ বলটির ভেতরে থাকা বিশেষ মাইক্রোচিপ সেকেন্ডের মধ্যে নিখুঁত তথ্য পাঠাতে পারে ভিএআর রুমে। ম্যাচ শেষে ক্রোয়েশিয়ার কোচ জলাতকো দালিচ অবশ্য প্রযুক্তির এই বাড়াবাড়ি নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। তিনি সরাসরি রেফারিংকে কাঠগড়ায় তুলে বলেন, এই ধরনের সিদ্ধান্ত ফুটবল থেকে সব আবেগ এবং আনন্দ কেড়ে নিচ্ছে। ভিএআর মানুষের ভেতরের অনুভূতিগুলোকে মেরে ফেলছে। তবে পর্তুগাল কোচ রবার্তো মার্তিনেজ তার প্রতিপক্ষের সঙ্গে একমত হননি। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, এখানে ভাগ্য বা ভুল সিদ্ধান্তের কোনো জায়গা নেই, কারণ প্রযুক্তির সেন্সর স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে বলে স্পর্শ লেগেছিল। সাবেক ইংলিশ ডিফেন্ডার ম্যাট আপসন আবার খালি চোখে বলের দিক পরিবর্তন না হওয়ার যুক্তি তুলে ধরে এই সিদ্ধান্তের শতভাগ সত্যতা নিয়ে কিছুটা সংশয় প্রকাশ করেছেন।

পর্তুগিজ মহাতারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর জন্যও রাতটি ছিল এক চরম রোলারকোস্টার রাইডের মতো। ম্যাচের শুরুতে ইভান পেরিসিচের গোলে ক্রোয়েশিয়া এগিয়ে গেলে রোনালদোর বিশ্বকাপ স্বপ্ন শেষের শঙ্কায় পড়েছিল। এরপর রোনালদোর একটি দুর্দান্ত গোল অফসাইডের কারণে বাতিল হয় কিন্তু পরবর্তীতে পেনাল্টি থেকে গোল করে তিনি দলকে ১-১ সমতায় ফেরান। এটি ছিল নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপে নকআউট পর্বে রোনালদোর প্রথম গোল। ম্যাচের ৮১তম মিনিটে তাকে যখন মাঠ থেকে তুলে নেওয়া হয়, তখন তার মুখে স্পষ্ট হতাশার ছাপ ছিল। তবে ৯৪তম মিনিটে গনসালো রামোসের গোলে দল এগিয়ে যেতেই ডাগআউট থেকে মাঠে ছুটে এসে উল্লাসে মাতেন ৩৯ বছর বয়সী এই তারকা। রোনালদোকে তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক ইংলিশ ফুটবলার থিও ওয়ালকটও।

রোনালদো যখন আরও একটি লড়াইয়ের জন্য টিকে গেলেন, তখন টরন্টোর মাঠ চিরতরে বিদায় জানাল লুকা মদ্রিচকে। ২০৩০ সালের আগামী বিশ্বকাপে মদ্রিচের বয়স হবে ৪৪ বছর, ফলে স্বাভাবিকভাবেই এটি ছিল বিশ্বকাপে তার শেষ ম্যাচ। ম্যাচ শেষে রিয়াল মাদ্রিদের সাবেক সতীর্থ রোনালদো এসে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা জানান মদ্রিচকে। গত ২৪ জুন পানামার বিপক্ষে নিজের ২০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা মদ্রিচকে সেদিন সতীর্থরা কাঁধে তুলে উদযাপন করেছিলেন। কিন্তু বিদায়বেলাটা তার জন্য বড্ড মলিন আর নিষ্ঠুর হয়ে রইল। সাবেক ব্রাজিলিয়ান মিডফিল্ডার লুকাস লেইভা মদ্রিচকে ফুটবলের এক মহান কিংবদন্তি আখ্যা দিয়ে বলেন, দীর্ঘ দুই দশক ধরে তিনি ফুটবলকে যা দিয়েছেন তা অবিশ্বাস্য এবং ক্রোয়েশিয়াকে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ স্তরে নিয়ে যাওয়ার মূল নায়ক তিনিই।


শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..