বেশি আলু খেলে গ্যাসের সমস্যা হয়?

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৬-২২, | ১৩:৫৫:১৯ |

ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, চিপস হোক, কড়াইশুঁটি দিয়ে আলুর দম কিংবা পুর দিয়ে পরোটা খেতে ভালবাসেন অনেকেই।

বিশ্বজুড়ে যে সমস্ত খাবার সবচেয়ে বেশি খাওয়া হয়, তার মধ্যে অন্যতম হলো আলু। এটাই আবার অনেকের কাছে সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

আলু খাওয়ার পর অনেকে পেটে অস্বস্তির কথা বলেন। ব্লোটিং বা পেট ফাঁপা ভাব অনুভব হওয়া কিংবা গ্যাসের সমস্যার কথাও বলতে শোনা যায় অনেককে। বেশি পরিমাণে আলু সেদ্ধ, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই বা চিপস খাওয়ার পর অস্বাভাবিকভাবে পেট ফোলার মতো সমস্যা অনুভব করেন অনেকে।

অতিরিক্ত আলু খেলে কি সত্যিই গ্যাসের সমস্যা দেখা দিতে পারে?

প্রবীণ গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট অরুল প্রকাশ জানিয়েছেন, এর কোনো নির্দিষ্ট উত্তর নেই। অর্থাৎ, এই প্রশ্নের জবাবে শুধু হ্যাঁ বা না বলা সম্ভব নয়।

ডা. প্রকাশ ব্যাখ্যা করেছেন, "বেশিরভাগ মানুষের যে সমস্ত খাবার খেলে সবচেয়ে বেশি গ্যাসের সমস্যা হয় বলে লক্ষ্য করা গিয়েছে, আলু তার মধ্যে নেই। তবে অতিরিক্ত আলু খেলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে, কারো কারো পেটে ফাঁপা ভাব অনুভূত হতে পারে। পেট ভরা লাগতে পারে এবং গ্যাসের সমস্যা তৈরি হতে পারে।"

"তবে এটা মনে রাখা দরকার যে ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির ক্ষেত্রে এর প্রভাব আলাদা হতে পারে।"

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের পেটের সমস্যার একমাত্র কারণ আলু নয়। এর পিছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। যেমন - কীভাবে আলু দিয়ে ওই পদ রান্না করা হয়েছে, খাবারের পরিমাণ বা ওই ব্যক্তির স্বাস্থ্য।

পাশাপাশি, কোনো নির্দিষ্ট ধরণের স্টার্চ বা শ্বেতসারযুক্ত খাবার খেলে কারো কারো শরীরে যে প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে তা-ও এখানে লক্ষ্যনীয়। ভাত, আলু ইত্যাদিতে স্টার্চ পাওয়া যায়। কিছু স্টার্চ-যুক্ত খাবারের প্রতি কেউ কেউ সংবেদনশীল।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ডায়াবেটিস অ্যান্ড ডাইজেস্টিভ অ্যান্ড কিডনি ডিজিজ (এনআইডিডিকে)-র তথ্য বলছে, ক্ষুদ্রান্ত্রে পুরোপুরি হজম না হওয়া কার্বোহাইড্রেট যখন ব্যাকটেরিয়া দ্বারা গাঁজন প্রক্রিয়ায় (ফার্মেন্টেশন) ভেঙে যায়, তখন গ্যাস উৎপন্ন হয়।

এনআইডিডি-র তথ্য বলছে, "গাঁজনের এই প্রক্রিয়া প্রাকৃতিকভাবে হাইড্রোজেন, মিথেন এবং কার্বন ডাই অক্সাইডের মতো গ্যাস তৈরি করে। অত্যধিক গাঁজন প্রক্রিয়া ঘটলে সেটা পেট ফাঁপা, পেটে অস্বস্তি এবং গ্যাসের কারণ হতে পারে।"

আলু মূলত স্টার্চ বা শ্বেতসার দিয়ে তৈরি। এই স্টার্চের বেশিরভাগই শোষিত হয় ক্ষুদ্রান্ত্রে। সেখানে পাচন প্রক্রিয়াও চলে। এর কিছুটা আবার ক্ষুদ্রান্তের পাচন প্রক্রিয়া এড়িয়ে এবং বৃহদান্ত্রে পৌঁছায়। সেখানে অন্ত্রে উপস্থিত ব্যাকটেরিয়ার দ্বারা এর গাঁজন প্রক্রিয়া শুরু হয়।

নিউট্রিশন অ্যান্ড গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, রেজিস্টেন্স স্টার্চ বা প্রতিরোধী স্টার্চ প্রিবায়োটিক হিসাবে কাজ করে।

প্রিবায়োটিক বলার কারণ এটা অন্ত্রে উপস্থিত উপকারী অণুজীবকে পুষ্টি সরবরাহ করে, যার ফলে বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় উপকারিতা দেখা দেয়। রেজিস্টেন্স স্টার্চ বলতে বোঝায় সেই শ্বেতসারকে যা ক্ষুদ্রান্ত্রের পাচন প্রক্রিয়া এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়।

তবে বিষয়টা দীর্ঘমেয়াদী ক্ষেত্রে অন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য ভাল হলেও এই গাঁজন প্রক্রিয়ার কারণে কারো কারো শরীরে অস্থায়ীভাবে অতিরিক্ত গ্যাস তৈরি হতে পারে।

ডা. অরুল প্রকাশ ব্যাখ্যা করেছেন, "অনেক অঞ্চলে আলু খাদ্যের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে শুধুমাত্র আলু নয়, মটরশুটি এবং মুলো-সহ অন্যান্য কার্বোহাইড্রেট সমৃদ্ধ খাবার খেলেও পেটে ফাঁপা ভাব এবং গ্যাসের কারণে অস্বস্তি অনুভূত হতে পারে।"

তিনি জানিয়েছেন, আলু-জাতীয় খাদ্য কিছু ব্যক্তির ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করতে পারে। তবে তার মানে এই নয় যে আলু স্বাস্থ্যের জন্য ভাল নয়। বিষয়টা হলো বিভিন্ন মানুষের হজম ক্ষমতা ভিন্ন।

"আলুর বদলে দুগ্ধজাত খাবার, মটরশুটি, মুলো ইত্যাদি পেটে গ্যাসের সমস্যা তৈরি করতে পারে এবং পেটে ফাঁপাভাব অনুভূত হতে পারে," বলেছেন ডা. অরুল প্রকাশ।

"এই জাতীয় সমস্যা মানুষের হজম ক্ষমতা ও স্বাস্থ্যের উপরও নির্ভর করে। আলুর সঙ্গে পরিবেশন করা অন্যান্য খাবার এই লক্ষণ আরো বাড়িয়ে তুলতে পারে।"

"তাই যদি মুসুর ডাল এবং আলুযুক্ত খাবার খাওয়ার পর সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে পরের বার এগুলো আলাদা আলাদাভাবে খান এবং আপনার স্বাস্থ্যের দিকে নজর দিন। তাহলে ঠিক কী জাতীয় খাবার খেলে সমস্যা হচ্ছে, সে সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যাবে। তবে যদি এই জাতীয় সমস্যা দুই সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয়, তবে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া দরকার।"

এছাড়াও, ল্যাকটোজ (দুধে উপস্থিত) জাতীয় খাবার খেলে যাদের অসুবিধা হয়, তাদের দুগ্ধজাত খাবার খেলে পেটে ফাঁপা ভাব অনুভূত হতে পারে। গ্যাসের সমস্যাও দেখা দিতে পারে।

একইভাবে ভাজা আলুতে ফ্যাট বেশি থাকার কারণে খাওয়ার পর দীর্ঘ সময় ধরে পেট ভরা ভরা বোধ হতে পারে। এর ফলে কেউ পেটে অস্বস্তি বোধ করতে পারেন, কারো আবার ব্লোটেড মনে হতে পারে।

অন্যান্য খাবার থেকে সমস্যা

বিশেষজ্ঞদের মতে, আলুর মতো এমন বহু খাবার রয়েছে, যা পেটে ফাঁপা ভাব ও গ্যাসের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।

উদাহরণস্বরূপ, প্রবীণ গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট অরুল প্রকাশ ব্যাখ্যা করেছেন "বিনস, ছোলা, মটরশুটি, মুসুর ডাল।"

এতে 'অলিগোস্যাকারাইড' নামক এক জাতীয় জটিল কার্বোহাইড্রেট থাকে। যেহেতু ক্ষুদ্রান্ত্রে এই যৌগগুলো সম্পূর্ণভাবে হজম করার জন্য প্রয়োজনীয় এনজাইম নেই, তাই তারা বৃহদান্ত্রে পৌঁছায় এবং সেখানে উপস্থিত ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সেটার গাঁজন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এর ফলে গ্যাস উৎপন্ন হয়।

যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস বলছে, "ফুলকপি, ব্রোকলি এবং কপির মতো শাক-সব্জিতে সালফারযুক্ত যৌগ থাকে যা রাফিনোজ নামে পরিচিত। হজমের সময়, এই যৌগগুলো প্রচুর পরিমাণে গ্যাস তৈরি করতে পারে।"

"খাদ্য হিসাবে এগুলো (ফুলকপি, ব্রোকলি) বেশি পুষ্টিকর হলেও অনেক সময় খাওয়ার পর পেটে ফাঁপাভাব অনুভব হয়।"

ডা. অরুল প্রকাশ ব্যাখ্যা করেছেন, "এছাড়া দুধ, আইসক্রিম, পনির ও দইয়ে ল্যাকটোজ থাকে। ল্যাকটোজ জাতীয় খাবার খেলে যাদের সমস্যা হয়, তাদের শরীর এগুলো সঠিকভাবে হজম করার জন্য প্রয়োজনীয় ল্যাকটোজ এনজাইম পর্যাপ্ত পরিমাণে উৎপাদন করতে পারে না।"

ডা. অরুল প্রকাশ বলেন, ল্যাকটোজ বৃহদান্ত্রে পৌঁছায় এবং সেখানে ব্যাকটেরিয়া দ্বারা এর গাঁজন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এর ফলে অনেকের গ্যাস, পেট ফাঁপা, পেটে ব্যথা এবং কখনো কখনো ডায়রিয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে, গোটা শস্য এবং ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার হজম ক্ষমতা বাড়ায় এবং দীর্ঘস্থায়ী পেটের রোগের ঝুঁকিও হ্রাস করে।

বেশি পরিমাণে ফাইবার ভাল নয়

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে ফাইবারযুক্ত খাবারের পরিমাণ হঠাৎ বাড়ালে তা পাচনতন্ত্রের উপর চাপ ফেলতে এবং সমস্যা তৈরি করতে পারে।

সুগার-ফ্রি চুইংগাম, ক্যান্ডি ইত্যাদি প্রায়শই সর্বিটল, ম্যানিটল, জাইলিটল এবং মাল্টিটলের মতো সুগার অ্যালকোহল বা পলিওল থাকে। পলিওল কার্বোহাইড্রেট থেকে তৈরি এক জাতীয় পদার্থ যা চিনির বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করা হয়। এতে তুলনামূলকভাবে কম ক্যালোরি থাকে।

গবেষণায় দেখা গিয়েছে, চিনির বিকল্প হিসাবে ব্যবহৃত এই পদার্থগুলো ক্ষুদ্রান্ত্রে শুধুমাত্র আংশিকভাবেই শোষিত হয়। এবং যে অংশটা হজম হয় না, সেটা বৃহদান্ত্রে পৌঁছায়। সেখানে ফার্মেন্টেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় এবং এই জাতীয় খাদ্য অন্ত্রের মধ্যে জল টেনে আনতে পারে। এর ফলে পেটে ফাঁপা ভাব, গ্যাস এবং ডায়রিয়া দেখা দিতে পারে।

'কট অ্যান্ড পেডিয়াট্রিক্স' জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, শরীর যখন সর্বিটল সঠিকভাবে হজম করতে পারে না, তখন পেটের সমস্যা যেমন গ্যাস, ফাঁপা ভাব এবং পেটে ব্যথা হতে পারে।

একইভাবে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মেয়ো ক্লিনিকের তথ্য বলছে, সর্বিটল, ম্যানিটোল এবং জাইলিটলের মতো চিনির বিকল্পগুলো প্রায়শই অতিরিক্ত গ্যাস তৈরি করে বিশেষত যদি বেশি পরিমাণে সেবন করা হয়।

মেয়ো ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, সোডা বা অন্যান্য কার্বনেটেড পানীয় হজমের সমস্যা বাড়িয়ে তুলতে পারে। এগুলো পেটে বেশি গ্যাস তৈরি করে। এই পানীয়গুলো শরীরে কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাস নিঃসরণ করে যার ফলে ঢেকুর ওঠে।

এগুলো বেশি খেলে পেট ফাঁপা, পেট ভরা ভরা ভাব বোধ হওয়া এবং ঘন ঘন ঢেকুর তোলার মতো সমস্যা তৈরি করতে পারে।

পেটের অস্বস্তি এড়ানোর উপায়?

গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট অরুল প্রকাশের মতে, এক একজনের হজম শক্তি এক এক রকম।

"কার শরীরে কতটা গ্যাস উৎপন্ন হতে পারে, তার পিছনে অনেকগুলো কারণ রয়েছে। যেমন তাদের অন্ত্রের মাইক্রোবায়োটার গঠন, হজমের গতি, খাদ্যাভ্যাস এবং খাবারের অ্যালার্জি।" মাইক্রোবায়োটা বলতে বোঝায় জীবদেহের অভ্যন্তরে বসবাসকারী অণুজীবসমূহের সমষ্টি।

গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্টদের মতে, সাধারণ খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে পেটে গ্যাসের সমস্যা এবং ফোলাভাব ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

"তাড়াহুড়ো করে খাওয়ার ফলে পেট ফাঁপা ভাব অনুভব হতে পারে এবং ঢেকুর উঠতে পারে। খাবার ভালভাবে চিবিয়ে এবং ধীরে ধীরে খেলে এই জাতীয় সমস্যা অনেকাংশে হ্রাস হতে পারে," বলেছেন ডা. প্রকাশ।

একইভাবে, কিছু খাবার কারো কারো জন্য সমস্যা তৈরি করতে পারে। ডা. অরুল প্রকাশ জানিয়েছেন যে কারো কারো ক্ষেত্রে আলুর মতো কন্দ শাকসব্জি খাওয়ার পর যেমন সমস্যা দেখা দেয়, কারো ক্ষেত্রে আবার দুগ্ধজাত পণ্য বা ডাল খাওয়ার পর তা সমস্যা দিতে পারে।

তার মতে, এমন কোনো খাবার নেই যা সবার জন্য একইভাবে পেটের সমস্যা তৈরি করতে পারে।

তিনি বলেছেন, "যদি কিছু খাবার খেলে এই লক্ষণগুলো দেখা যায় তাহলে সেই খাবারের পরিমাণ কমানো বা রান্নার পদ্ধতি বদলানোর বিষয়টা ভাবা যেতে পারে। তারপরও সমস্যা থাকলে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত।"

চিকিৎসকদের মতে, পেটে গ্যাস ও ফোলাভাব সাধারণত বড় কোনো সমস্যা নয়। তবে এর সঙ্গে যদি ওজন হ্রাস, ক্রমাগত পেটে ব্যথা, ডায়রিয়া, মলে রক্ত, অতিরিক্ত কোষ্ঠকাঠিন্য বা ঘন ঘন বমি হওয়ার মতো সমস্যা দেখা যায়, তাহলে তা উপেক্ষা করা ঠিক নয়। অবিলম্বে ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করা উচিত।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..