✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-১০-২০, | ১৪:০৩:৪৯ |যুক্তরাষ্ট্রে ডেমোক্র্যাটরা নির্বাচনে জয়ী হলে দেশটিতে ফ্রান্সের মতো সহিংস অস্থিরতা দেখা দিতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সোমবার কানসাসে এক নির্বাচনী সমাবেশে রিপাবলিকানদের পক্ষে প্রচার চালানোর সময় তিনি এ আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তবে নিজের দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ তুলে ধরেননি ট্রাম্প।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, রিপাবলিকান সিনেটর রজার মার্শালের পক্ষে প্রচার চালাতে কানসাসে যান ট্রাম্প। দীর্ঘদিন ধরে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এই আসনে এবার ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যাডাম হ্যামিলটনের সঙ্গে মার্শালের কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। রক্ষণশীল রাজ্যগুলোতে রিপাবলিকান প্রার্থীদের সমর্থন জোরদার করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই এই সমাবেশের আয়োজন করা হয়।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে এসব রাজ্যে রিপাবলিকান প্রার্থীরা চাপে রয়েছেন। সমাবেশে ট্রাম্প বলেন, ‘কানসাস, আমি তোমাদের ভালোবাসি। তবে আমি এখানে রজার মার্শাল নামের একজনের জন্য এসেছি।’
ফ্রান্সের সাম্প্রতিক অস্থিরতার প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্প বলেন, সেখানে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারি পরিষেবায় অর্থের ঘাটতি নিয়ে বিক্ষোভ হয়েছে। পরে এসব বিক্ষোভের কিছু অংশ দাঙ্গা ও লুটপাটে রূপ নেয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
যুক্তরাষ্ট্রেও পণ্য ও পরিষেবার দাম কমিয়ে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখতে চাপের মুখে রয়েছেন ট্রাম্প। সমাবেশে অভিবাসী ও মুসলমানদের নিয়েও নেতিবাচক মন্তব্য করেন তিনি। এর আগে তিনটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারেও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন ট্রাম্প।
তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের দেশে এমনটা ঘটতে দেব না। ফ্রান্সে যখন গির্জার চূড়ায় আগুন জ্বলতে এবং চারদিকে আগুনের লেলিহান শিখা দেখতে পাবে, তখন মনে রেখো, কট্টর ডেমোক্র্যাটরা আমেরিকার সঙ্গে এমনটাই করতে চায়।’
ডেমোক্র্যাটদের বিদ্রূপ করতে ট্রাম্প ‘ডুমোক্র্যাটস’ শব্দটি ব্যবহার করেন। অন্যদিকে, অভিবাসী ও বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে তার বক্তব্যের সমালোচনা করে আসছেন অধিকারকর্মীরা। নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এ ধরনের মন্তব্য বৈষম্যমূলক মনোভাবকে উৎসাহিত করতে পারে।
২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কানসাসে ১৬ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন ট্রাম্প। গত ৯৪ বছরে এই রাজ্য থেকে কোনো ডেমোক্র্যাট প্রার্থী যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে নির্বাচিত হননি। তবে এবার রিপাবলিকান সিনেটর রজার মার্শালকে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়তে হচ্ছে। তার প্রতিপক্ষ ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যাডাম হ্যামিলটন একটি বড় মেথডিস্ট গির্জার যাজক।
ট্রাম্পের শুল্কনীতির বিরোধিতা করেছেন হ্যামিলটন। একই সঙ্গে তিনি প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বকে ‘খামখেয়ালি’ বলে সমালোচনা করেছেন। হ্যামিলটনকে আক্রমণ করে ট্রাম্প বলেন, ‘শ্বেতাঙ্গ হয়ে জন্মানোর জন্য তিনি চান আপনারা অনুতপ্ত হন।’
সমাবেশে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়গুলোও সামনে আনেন সিনেটর মার্শাল। ‘কট্টর ইসলামের’ বিস্তার ঠেকানোর দাবি জানান তিনি। সমকামীদের অধিকার ও গর্বের মিছিলের প্রতি সমর্থন দেওয়ায় হ্যামিলটনকে কানসাসের জন্য ‘অতিরিক্ত উদারপন্থী’ বলেও মন্তব্য করেন মার্শাল। এ সময় সমাবেশে উপস্থিত লোকজন দুয়োধ্বনি দেন।
মার্শাল বলেন, ‘আমাদের এমন একজনকে দরকার, যিনি গরু ও ষাঁড় সামলাতে পারেন।’ এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে হ্যামিলটনের নির্বাচনী প্রচারশিবির তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
সোমবার প্রকাশিত একটি ভিডিওতে হ্যামিলটন ট্রাম্পকে কানসাসে স্বাগত জানান। তিনি বলেন, ট্রাম্পের সমর্থকেরাও তার নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিতে পারেন। যেসব বিষয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে কাজ করা সম্ভব, সেসব ক্ষেত্রে সহযোগিতা করবেন বলেও জানান তিনি। তবে ওয়াশিংটনের নীতির কারণে কৃষক ও গ্রামীণ এলাকার হাসপাতাল ক্ষতিগ্রস্ত হলে কানসাসের মানুষের পক্ষে অবস্থান নেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন হ্যামিলটন।
আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা রিপাবলিকানদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে চাইছে দলটি। এ লক্ষ্যে ট্রাম্প টানা ৩২ দিন ধরে নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে যেসব এলাকায় তিনি বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন, সেসব এলাকায় বারবার যাচ্ছেন তিনি।
ট্রাম্পের নির্বাচনী কৌশল সম্পর্কে অবগত এক রিপাবলিকান নেতার ভাষ্য, গ্রামীণ এলাকায় ট্রাম্পের বাড়তি মনোযোগের পেছনে দলের অভ্যন্তরীণ জনমত জরিপের ফল রয়েছে। ওই জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের গ্রামীণ অঞ্চলে ৫৫ বছর বা তার কম বয়সী পুরুষদের মধ্যে ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন কিছুটা কমেছে। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তার জয়ে এই ভোটারদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
সোমবার প্রকাশিত রয়টার্স ও ইপসোসের জনমত জরিপেও ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন কমে যাওয়ার চিত্র উঠে এসেছে। জরিপ অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার কাজের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন মাত্র ৩১ শতাংশ মার্কিন নাগরিক। বর্তমান মেয়াদে এটিই তার সর্বনিম্ন সমর্থনের হার।
প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরে পেতে ডেমোক্র্যাটদের প্রতিটি কক্ষে নিট চারটি করে আসন বাড়াতে হবে। বর্তমানে প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের আসন ২১৮টি এবং ডেমোক্র্যাটদের ২১৪টি। সিনেটে রিপাবলিকানদের আসন ৫৩টি, আর ডেমোক্র্যাটদের ৪৭টি।
কানসাসের উইচিটা শহরের কাছে পার্ক সিটিতে অনুষ্ঠিত সমাবেশে যোগ দিতে অনেককে আন্তঃরাজ্য মহাসড়ক ১৩৫ পেরিয়ে এক মাইলেরও বেশি পথ হেঁটে যেতে হয়। সমাবেশস্থলের কাছে একটি জ্বালানি সরবরাহকেন্দ্রের সাইনবোর্ডে পেট্রল ও ডিজেলের দাম দেখানো হচ্ছিল। সেখানে প্রতি গ্যালন পেট্রলের দাম ছিল ৩ ডলার ৯৮ সেন্ট এবং ডিজেলের দাম ৫ ডলার ৭৮ সেন্ট।
ভ্রমণবিষয়ক সংস্থা এএএর তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় কানসাসে প্রতি গ্যালন পেট্রলের গড় দাম প্রায় ৪৫ শতাংশ বেড়েছে। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সমর্থকদের মধ্যেও অর্থনীতি নিয়ে উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে।
কানসাসের হাচিনসন এলাকার ৫৯ বছর বয়সী রিপাবলিকান ভোটার মনিক মুলেন প্রতিবন্ধী ভাতা পান এবং তার বাবার দেখাশোনা করেন। তিনি বলেন, ‘আমি প্রতিবন্ধী ভাতা পাই। আমার হাতে খুব বেশি টাকা নেই। কিন্তু মনে হচ্ছে, জিনিসপত্রের দাম এখনো বাড়ছে। এসব দাম কমানো দরকার। খাবার জোগাড় করতে এখন মনে হয় যেন খুঁজে খুঁজে শিকার করতে হচ্ছে।’
সমাবেশস্থলের কাছে অল্প কয়েকজন বিক্ষোভকারীও জড়ো হন। তাদের একজন কানসাসের হালস্টেড এলাকার বাসিন্দা জেমস নাইটিঙ্গেল। তিনি নিজেকে স্বতন্ত্র রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষ হিসেবে পরিচয় দেন।
নাইটিঙ্গেলের অভিযোগ, ট্রাম্প প্রশাসন তার এলাকার কৃষি অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমি কানসাসের একজন কৃষক। ট্রাম্প প্রশাসন আমার এলাকার কৃষি অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দিয়েছে। তার শুল্কনীতির কারণে শস্য বিক্রির বাজার শুধু ধ্বংসই হয়নি, এখন তিনি দেশের বাইরে থেকে আমদানি করা গরুর মাংসও নিয়ে আসছেন। “সবার আগে আমেরিকা” নীতির কী হলো?’
কানসাসে দলীয় পরিচয়ের বাইরে গিয়েও ভোট দেওয়ার নজির রয়েছে। রাজ্যটির ভোটাররা টানা দুই মেয়াদে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী লরা কেলিকে গভর্নর নির্বাচিত করেছেন। টোয়ান্ডা এলাকার ট্রাম্প-সমর্থক জিনা সিম্যান বলেন, ‘আমার মনে হয় না, এখানে নির্বাচনে জয়ী হওয়া কখনোই সহজ।’
তার মতে, অতীতে রিপাবলিকান প্রার্থীরা অনেক সময় নিজেদের জনপ্রিয়তাকে নিশ্চিত ধরে নিয়েছেন।