✕

সর্বশেষ :

বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি ও দমন-পীড়ন: চরম হতাশায় পাকিস্তানের তরুণেরা

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-১০-১৬, | ০১:২১:০১ |

পাকিস্তানে প্রতিবছর আনুষ্ঠানিক খাতে যত কর্মসংস্থান তৈরি হয়, তার চেয়ে অন্তত ১০ লাখ বেশি তরুণ কর্মক্ষম বয়সে পৌঁছান। তাদের অনেকের জন্য কাজ নেই। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও প্রয়োজনের তুলনায় বিনিয়োগ কম। এর সঙ্গে জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয় যোগ হয়ে তরুণদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে তুলছে।

সরকারি পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে পাকিস্তানের জনসংখ্যা প্রায় ৪০ কোটিতে পৌঁছাতে পারে। এই বাড়তি মানুষের শিক্ষা, চিকিৎসা ও কাজের চাহিদা কীভাবে পূরণ হবে, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সুযোগের অভাবে তরুণদের হতাশা বাড়লে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।

জুলাইয়ের শেষ দিকে ইসলামাবাদে ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদদের এক সমাবেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি বলেন, তরুণেরা একজোট হলে বড় পরিবর্তন ঘটাতে পারেন। তাই মেধার ভিত্তিতে তাদের চাকরি ও কাজের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। পাকিস্তানের বর্তমান ব্যবস্থা ও অর্থনীতি সংকটের মুখে রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চ সরকারি ঋণ, মূল্যস্ফীতি, কম মজুরি ও ব্যবসা পরিচালনার জটিলতা সংকট বাড়াচ্ছে। ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো সহজে ঋণ না পাওয়ায় নতুন কর্মসংস্থানও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

তবে পাকিস্তানে বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ টোবিয়াস হকের মতে, অর্থনৈতিক সংস্কার ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানো গেলে এই জনসংখ্যাই সুযোগ হয়ে উঠতে পারে। তা না হলে বাড়তি চাপ সামলানো কঠিন হবে।

শিক্ষায় ঘাটতি, প্রশিক্ষণে এআই
পাকিস্তানে শিক্ষকের ঘাটতি, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো ও কম বিনিয়োগের কারণে বহু শিশু মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। দেশটির ৭৭ শতাংশ শিশু ১০ বছর বয়সেও বয়সোপযোগী লেখা পড়তে পারে না। সিন্ধু প্রদেশের অনেক স্কুলে বিদ্যুৎ, বিশুদ্ধ পানীয় জল ও শৌচাগারের মতো মৌলিক সুবিধাও নেই।

এই পরিস্থিতিতে শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়াতে পরীক্ষামূলকভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রশিক্ষণ চালু করেছে সিন্ধু। হায়দ্রাবাদের একটি সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষিকা রিদা মেমন এই প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। ৩০ বছর বয়সী এই শিক্ষিকা ক্লাস শেষে ‘রুমি’ নামের একটি এআইভিত্তিক টুল ব্যবহার করেন। হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে টুলটি তার পাঠদানের মূল্যায়ন করে এবং উন্নতির পরামর্শ দেয়।

শিক্ষাপ্রযুক্তিবিষয়ক অলাভজনক সংস্থা তালিমাবাদ এটি তৈরি করেছে। প্রায় দুই ডজন শিক্ষক পরীক্ষামূলকভাবে এটা ব্যবহার করছেন। কর্তৃপক্ষের আশা, এতে পাঠদানের মান বাড়বে।

কিন্তু অর্থের সংকট রয়ে গেছে। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে শিক্ষায় মোট ব্যয় ২৮ হাজার ৯০০ কোটি রুপি কমে ৯৬ হাজার ২০০ কোটি রুপিতে দাঁড়িয়েছে। এর প্রায় ৯০ শতাংশই যায় শিক্ষকদের বেতন ও পেনশনে। অবকাঠামো ও শিক্ষার মান উন্নয়নে অর্থ থাকে সীমিত।

পপুলেশন কাউন্সিলের হিসাবে, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বছরে ২ শতাংশে নামলেও ২০৪০ সালের মধ্যে অন্তত ৫৫ হাজার নতুন প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রয়োজন হবে। ফলে প্রযুক্তির পাশাপাশি পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করাও জরুরি।

খাবারের খরচ মেটাতেই হিমশিম
দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে অনেক পরিবারের পক্ষে পর্যাপ্ত খাবার কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে শিশুদের পুষ্টিতে।

করাচির জান্নাত গুল হাসপাতালে ১০ মাসের মেয়ে আমিনাকে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য নিয়ে যান ২০ বছর বয়সী ফারজানা মুসা খান। চিকিৎসকেরা জানান, শিশুটির বাহুর পরিধি মাত্র ১১ সেন্টিমিটার, যা গুরুতর অপুষ্টির লক্ষণ।

ফারজানার স্বামী দিনমজুরি করে দৈনিক প্রায় ৬০০ রুপি আয় করেন। এই আয়ে সংসার চালানোই কঠিন। গর্ভাবস্থায় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ফল, শাকসবজি ও মাংস খাওয়ার সামর্থ্যও তার ছিল না।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকিস্তানে মাঝারি ও গুরুতর খাদ্যসংকটে থাকা পরিবারের হার ২০১৯ সালের ১৬ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে ২৪ শতাংশে উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শৈশবের অপুষ্টি শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত করে। পরে শিক্ষা, কর্মদক্ষতা ও আয়েও এর প্রভাব পড়ে।

সরকার জীবনের প্রথম এক হাজার দিনে শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে খাবার ও নগদ সহায়তার কর্মসূচি সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে দারিদ্র্য, খাদ্যের উচ্চমূল্য ও মেয়েদের শিক্ষার সীমিত সুযোগ সংকট মোকাবিলায় বাধা হয়ে আছে।

কৃষিতে লোকসান, শহরমুখী তরুণেরা
গ্রামেও আয়ের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে। উৎপাদন খরচ, ফসলের ক্ষতি ও ঋণের চাপে কৃষকদের অনেকে বিপাকে পড়েছেন।

দক্ষিণাঞ্চলের তান্দো আল্লাহয়ার এলাকার ২৮ বছর বয়সী নানক রাম বাবার সঙ্গে কলা ও আম চাষ করেন। ঋণ, খারাপ আবহাওয়া, ফসলের রোগ এবং ডিজেল ও বীজের বাড়তি দাম তাদের সংকট বাড়িয়েছে। ২০২২ সালের বন্যার ক্ষতিও পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেননি।

পরিবারের আর্থিক অবস্থা সামাল দিতে এবার করাচিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন নানক। বৈদ্যুতিক প্রকৌশলে ডিগ্রি থাকলেও চাকরি পাননি। তার ভাষ্য, চাকরির জন্য যোগাযোগ করেও সাড়া মিলছে না।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে গ্রামাঞ্চলের ৩৬ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে ছিলেন। এটি ১৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। অথচ দেশের মোট কর্মশক্তির প্রায় ৪০ শতাংশ কৃষির ওপর নির্ভরশীল।

অনলাইনে আয়ের পথ খুঁজছেন কেউ কেউ

এই সংকটের মধ্যেও প্রযুক্তি ব্যবহার করে আয়ের পথ খুঁজছেন কিছু তরুণ। তাদের একজন ২১ বছর বয়সী মুহাম্মদ ফুরকান। ইউটিউবের ভিডিও তৈরি করে মাসে প্রায় ৬০০ ডলার আয় করছেন তিনি।

ফুরকান ও তার চাচাতো ভাই সালমান কেরিও চ্যাটজিপিটি, জেমিনি ও অন্যান্য এআই টুল দিয়ে ইসলামি ও পাকিস্তানের ইতিহাসভিত্তিক উর্দু ভিডিও তৈরি করেন।

দুই বছর আগে কাজের সন্ধানে সিন্ধুর নিজ শহর ছেড়ে করাচিতে আসেন ফুরকান। আগে দোকানে কাজ করে সপ্তাহে মাত্র ৫০০ রুপি পেতেন। এখন অনলাইনের আয় দিয়ে পরিবারের অবস্থার উন্নতি করতে চান।

ভবিষ্যতে সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান গড়ে এলাকার তরুণদের চাকরি দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে তার। ফুরকান জানান, তার গ্রামে কাজের সুযোগ খুব কম।

অসন্তোষের সঙ্গে বাড়ছে দমন-পীড়ন
অর্থনৈতিক হতাশার পাশাপাশি রাজনৈতিক অধিকার নিয়েও তরুণদের ক্ষোভ বাড়ছে। সম্প্রতি খাইবার পাখতুনখোয়ায় হাজারো মানুষ সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন।

ইমরানের সমর্থক হাজারো রাজনৈতিক কর্মী ও নাগরিক সমাজের সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। সামরিক বাহিনীর সমালোচনা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে মানবাধিকার আইনজীবী ইমান মাজারি ও তার স্বামীকেও কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

নতুন আইন ও সরকারি চাপে সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সামরিক বাহিনীর সমালোচনা কমেছে। তবে পরিবর্তনের দাবি থামেনি।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান ভার্সো কনসালটিংয়ের পরিচালক আজিমা চিমার মতে, রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ায় তরুণদের ক্ষোভ বাড়ছে।

পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নেতা ও ইমরান-সমর্থক ওয়াসিম খান তানোলি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে দুবার গ্রেপ্তার হয়েছেন। তবু দল ডাক দিলে আবার রাস্তায় নামবেন বলে জানিয়েছেন ২৫ বছর বয়সী এই তরুণ।

ওয়াসিম বলেন, ‘কেউ আমাদের কথা শুনছে না। রাস্তায় নামা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। নিজেদের ভবিষ্যৎ আমাদেরই নির্ধারণ করতে হবে।’

নিরাপদ ভবিষ্যতের খোঁজে বিদেশযাত্রা
অন্যদিকে, অনেক তরুণ দেশ ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বাণিজ্যে স্নাতক আবদুল সামাদ লেয়াহ শহরের একটি কল সেন্টারে মাসে ৪০ হাজার রুপি বেতনে কাজ করেন।

২০২৪ সালে রেস্তোরাঁ খুলতে ২০ লাখ রুপি ঋণ নিয়েছিলেন তিনি। মূল্যস্ফীতি ও বাড়তি খরচে ব্যবসা টেকেনি। এখন ঋণ শোধের পাশাপাশি বিদেশে যাওয়ার ভিসার খরচ জোগাড় করছেন। তার মা বিয়ের গয়নাও বন্ধক রেখেছেন।

সামাদ বলেন, ‘এখানে নিরাপদ ভবিষ্যৎ নেই। এখন সবকিছুর দাম অনেক বেশি।’ প্রথমে সৌদি আরব যেতে চান তিনি। শেষ পর্যন্ত ইউরোপে যাওয়াই লক্ষ্য।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সাত লাখের বেশি পাকিস্তানি বৈধভাবে কাজের জন্য বিদেশে গেছেন। অধিকাংশই উপসাগরীয় দেশগুলোর নির্মাণ ও সেবাখাতে কাজ করেন। চিকিৎসক ও প্রকৌশলীর মতো উচ্চশিক্ষিত পেশাজীবীরাও দেশ ছেড়েছেন।

২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ৪ হাজার ১৬০ কোটি ডলার। এই অর্থ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ, বিদেশের কর্মসংস্থানের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতায় দেশ দক্ষ ও মেধাবী কর্মী হারাতে পারে।

সামাদের দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্তের পেছনে রাজনৈতিক পরিবেশও রয়েছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নেই বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক রসিকতা করা বন্ধ করেছেন তিনি। কারাবন্দি হওয়ার ভয়ও তাকে বিদেশে যেতে উৎসাহিত করছে।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..