✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-১০-০৭, | ১৩:০৩:৩৬ |বিদ্যালয়ের শোচনীয় পরিবেশ উন্নত করা এবং শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবিতে ফ্রান্সজুড়ে অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। মঙ্গলবার দেশজুড়ে আয়োজিত সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ কর্মসূচিতে প্রায় আড়াই লাখ শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবক রাস্তায় নামেন। রাজধানী প্যারিস ছাড়াও মার্সেই, লিওঁ, নান্তেস ও রেনের মতো প্রধান শহরগুলোতে এই বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। আন্দোলন থামাতে বিভিন্ন স্থানে রায়ট পুলিশ টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ এবং ব্যাপক লাঠিচার্জ করেছে, যার ফলে বেশ কয়েকটি স্থানে তীব্র সংঘাত ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী মঙ্গলবার প্রায় দুই লাখ মানুষ মিছিল ও সমাবেশে অংশ নেন, যার মধ্যে কেবল প্যারিসেই পদযাত্রা করেন প্রায় ৫৬ হাজার মানুষ। তবে আন্দোলন আয়োজকদের দাবি, মোট আন্দোলনকারীর সংখ্যা চার লাখ ৫০ হাজারে পৌঁছেছিল। ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত তথ্যসূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার দিনটিতে প্রায় ৫০০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং অন্তত ৪৩ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকে দুই সপ্তাহের বেশি সময়ে প্রায় ছয় হাজার একশ জনকে আটক করা হয়েছে, যাদের প্রায় সকলেই অপ্রাপ্তবয়স্ক। বর্তমানে ১৮০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা চলছে, যার মধ্যে ১৫০০ জনের বয়সই ১৮ বছরের নিচে।
শিক্ষাঙ্গনে ছড়িয়ে পড়া এই সহিংসতায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ফরাসি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্টিয়ান ল্যকরনু। তিনি জানান, বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত কমপক্ষে ২১৫ জন কিশোর-কিশোরী শিক্ষার্থী এবং ৮৫ জন স্কুলকর্মী বা শিক্ষক আহত হয়েছেন। তিনি এটিকে সাম্প্রতিক দশকগুলোর মধ্যে শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে ভারী মাশুল বলে মন্তব্য করেছেন। পরিস্থিতি পর্যালোচনায় প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ এলিসি প্যালেসে তাঁর মন্ত্রিসভার জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীদের নিয়ে জরুরি বৈঠক ডেকেছেন। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ পুলিশের ভূমিকার সাফাই গেয়ে বলেছেন, প্রায় সব ক্ষেত্রেই পুলিশের প্রতিক্রিয়া ছিল আনুপাতিক। তবে অনেক স্থানে বিক্ষোভ দাঙ্গায় রূপ নেওয়ায় পুলিশ কঠোর হতে বাধ্য হয়েছে।
ফ্রান্সজুড়ে শিক্ষক ও মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো পুলিশের বলপ্রয়োগের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল একে ফ্রান্স কর্তৃপক্ষের আনুপাতিকতাহীন দমনপীড়ন আখ্যা দিয়ে তা বন্ধের দাবি জানিয়েছে। অ্যামনেস্টি ফ্রান্সের প্রধান আন সাভিনেল-বারাস বলেন, গত এক সপ্তাহে প্রকাশ্যে আসা ছবি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান টিয়ারগ্যাস, লাঠি এবং মারাত্মক পুলিশি কৌশলের বিপজ্জনক ব্যবহার নিয়ে মারাত্মক উদ্বেগ তৈরি করেছে। তীব্র চাপের মুখে পুলিশের অভ্যন্তরীণ তদন্ত বিভাগ ইতিমধ্যে ১০টি ঘটনা নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্বীকার করেছে।
আন্দোলনের ভয়াবহতার প্রমাণ মেলে শিক্ষার্থীদের সাম্প্রতিক গুরুতর আঘাতের ঘটনায়। উত্তর ফ্রান্সে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরের হাতের কবজি বিস্ফোরণে উড়ে গেছে। এর আগে বুধবার টুর্স শহরে এক ১৬ বছর বয়সী শিক্ষার্থীর মাথায় প্রতিরক্ষামূলক বিস্ফোরণ বলের মারাত্মক আঘাত লাগলে সে ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি হারায়। অপরদিকে উত্তর-পশ্চিম প্যারিসে ১৪ বছরের এক কিশোরের খুব কাছ থেকে পুলিশ গ্রেনেড সদৃশ অস্ত্র ছুড়লে তার বেশিরভাগ দাঁত ভেঙে যায় এবং মুখমণ্ডল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চিকিৎসকরা অস্ত্রোপচার করে তার কপাল ও চোয়াল আটকে দেওয়ায় সে এখন কথা বলতে পারছে না এবং তাকে স্ট্র দিয়ে তরল খাবার খেতে হচ্ছে।
মঙ্গলবার প্যারিসের প্লাস দে লা নেশন চত্বরে আঠারো বছর বয়সী শিক্ষার্থী অ্যানা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের দাবিগুলো একদম সাধারণ; লেখাপড়ার উন্নত পরিবেশ, পর্যাপ্ত শিক্ষক এবং ভালো স্কুল ভবন। কিন্তু কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া ছিল চরম বিপর্যয়কর এবং সহিংসতায় ভরা। মার্সেই শহরের আরেক শিক্ষার্থী ওশিয়ান জানান, তিনি বছরের পর বছর শিক্ষকবিহীন শ্রেণিকক্ষে বসে থেকেছেন এবং অনুপস্থিত শিক্ষকদের বদলে কোনো যোগ্য বিকল্প দেওয়া হয়নি। অনেক শিক্ষকও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা ভেবে মাঠে নেমেছেন। রেন শহরের শিক্ষক রোমেন দুবার্গ জানান, তারা পুলিশি বর্বরতার প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে সহকর্মীদের নিয়ে রাজপথে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যেন আক্রান্ত শিক্ষার্থীদের পাশে থাকতে পারেন।
ফ্রান্সে আগামী বছর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যার ঠিক সাত মাস আগে এই বিক্ষোভ শুরু হওয়ায় চরম রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে ম্যাক্রোঁ সরকার। বাজেট ঘাটতি কমানোর চাপের মুখে থাকা সরকার উল্টো বিরোধী রাজনৈতিক দল 'লা ফ্রান্স ইনসোমিজ' এর বিরুদ্ধে উসকানি দেওয়ার অভিযোগ এনেছে, যদিও তারা অহিংস আন্দোলনের আহ্বান জানিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রেখেছে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান