✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-১০-০৭, | ০১:১৩:৪৪ |চীনের ইউনান প্রদেশের পর্যটননগরী শাংগ্রি-লায় তিব্বতি সংস্কৃতির জনপ্রিয়তা দিনদিন বাড়ছে। তবে পর্যটকদের সামনে যে সংস্কৃতি তুলে ধরা হচ্ছে, তাতে তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের ধর্মীয় ঐতিহ্য ও স্বতন্ত্র পরিচয়ের অনেক কিছুই আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় দেশটিতে পর্যটনকে কেন্দ্র করে তিব্বতি সংস্কৃতির বাণিজ্যিকীকরণ এবং চীনের সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণের নীতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সম্প্রতি দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শাংগ্রি-লায় হান-চীনা পর্যটকদের অনেকেই তিব্বতি ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে ছবি তুলছেন। শতাব্দীপ্রাচীন মঠ ও মন্দিরও হয়ে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি তোলার আকর্ষণীয় স্থান। তবে পর্যটকদের কাছে সংস্কৃতির বাহ্যিক সৌন্দর্য যতটা গুরুত্বপূর্ণ, এর ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য ততটা গুরুত্ব পাচ্ছে না।
শহরটিতে তিব্বতি সংস্কৃতির এমন একটি সংস্করণ তুলে ধরা হচ্ছে, যা সাধারণ চীনা পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় এবং রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য। এতে দালাই লামার প্রভাব ও তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উপাদানগুলো অনেকটাই অনুপস্থিত।
তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক নেতা দালাই লামা দীর্ঘদিন ধরে চীনের তিব্বতনীতির সমালোচনা করে আসছেন। ১৯৫৯ সালে ভারতে নির্বাসনে যাওয়ার পর থেকে তিনি তিব্বতিদের স্বতন্ত্র পরিচয় রক্ষার আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ। বেইজিং তাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে দেখে। বর্তমানে তার বয়স নব্বইয়ের কোঠায় থাকায় তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতিযোগিতাও নতুন গুরুত্ব পেয়েছে।
পর্যটনের আড়ালে বদলে যাচ্ছে সংস্কৃতি
২০০১ সালে শহরটির নাম পরিবর্তন করে শাংগ্রি-লা রাখা হয়। এর আগে এটি গ্যালথাং বা চীনা ভাষায় ঝোংদিয়ান নামে পরিচিত ছিল। জেমস হিলটনের ১৯৩৩ সালের উপন্যাস ‘লস্ট হরাইজন’-এর কাল্পনিক স্বর্গভূমির নাম অনুসারে শহরটির নতুন নামকরণ করা হয়। এরপর থেকে সেখানে পর্যটনশিল্পের দ্রুত বিস্তার ঘটে।
বর্তমানে দুই লাখেরও কম মানুষের এই শহরে অন্তত ৩০০টি পোশাক ও ছবি তোলার স্টুডিও রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে পর্যটকেরা তিব্বতি পোশাক পরে ছবি তোলেন। তবে পোশাকের ঐতিহ্যগত সত্যতা কিংবা তিব্বতি সংস্কৃতির গভীরতা নিয়ে অনেক পর্যটকের আগ্রহ সীমিত।
শাংগ্রি-লার এক তিব্বতি মেকআপশিল্পী চিমি লামো পর্যটনের অর্থনৈতিক সুফল স্বীকার করলেও সংস্কৃতির পরিবর্তন নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন। তাঁর ভাষায়, ‘সবই নকল, কিন্তু আমরা কী করতে পারি?’ তিনি বলেন, পর্যটকেরা ছবিতে পোশাকটি দেখতে ভালো লাগাকেই বেশি গুরুত্ব দেন।
কোভিড-১৯ মহামারির পর চীনের মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে নতুন অভিজ্ঞতা অর্জনের আগ্রহ বাড়ায় স্থানীয় পর্যটন আরও বিস্তৃত হয়েছে। এর ফলে শহরটির ঐতিহ্যবাহী পর্যটন ব্যবসায়ও পরিবর্তন এসেছে। লামোর দাবি, আগে অধিকাংশ দোকান ও রেস্তোরাঁ স্থানীয়রা পরিচালনা করলেও এখন বাইরের ব্যবসায়ীরা একই ধরনের পর্যটন আকর্ষণ তৈরি করছেন।
অর্থনৈতিক উন্নয়ন বনাম স্বতন্ত্র পরিচয়
পর্যটনশিল্পের সঙ্গে যুক্ত হওয়া স্থানীয় তিব্বতিদের জন্য অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পর্যটন ও মাশরুম সংগ্রহ ছাড়া দুর্গম এই অঞ্চলে আয়ের সুযোগ সীমিত। ফলে সংস্কৃতির বাণিজ্যিকীকরণ নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও অনেক স্থানীয় বাসিন্দা জীবিকার প্রয়োজনে এ খাতের ওপর নির্ভর করছেন।
ইউনানসহ ঐতিহাসিকভাবে তিব্বতি অধ্যুষিত বিভিন্ন এলাকায় বিলাসবহুল বুটিক হোটেল পরিচালনা করেন দাকপা কেলদেন। ভারতে তিব্বতি নির্বাসিত পরিবারে জন্ম নেওয়া সাবেক এই বৌদ্ধ ভিক্ষুর মতে, পর্যটন অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হলেও শাংগ্রি-লায় যে সংস্কৃতি প্রদর্শিত হচ্ছে, তা মূল তিব্বতের একটি কল্পিত রূপ।
তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী তিব্বতি সংস্কৃতি তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। এ জন্য বৌদ্ধ ধর্মীয় সংগীত শেখানোর পাশাপাশি দর্শনার্থীদের থাংকা—তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় চিত্রকর্ম—আঁকার প্রশিক্ষণেরও আয়োজন করেন।
তরুণ প্রজন্মে কমছে ধর্মীয় ও ভাষাগত চর্চা
চীনের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে হান-প্রধান মূলধারার সঙ্গে একীভূত করার নীতির প্রভাব তিব্বতি সমাজেও পড়ছে বলে মনে করছেন অনেক জাতিগত তিব্বতি। তাঁদের ভাষ্য, স্বতন্ত্র পরিচয়ের অনুভূতি ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে। মঠগুলোতে তরুণ ভক্তের সংখ্যা কমছে, পাশাপাশি অনেকেই নিজেদের মাতৃভাষা পড়তে ও লিখতে সমস্যায় পড়ছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সীদের ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের ওপর সরকারি বিধিনিষেধ রয়েছে। তিব্বতি বৌদ্ধধর্ম নিয়ে পড়াশোনার জন্য বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রেও তরুণদের ওপর নিয়ন্ত্রণ বেড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
একসময় বহু তিব্বতি পরিবারে একাধিক সদস্য বৌদ্ধ ভিক্ষু হতেন। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মে এমন মানুষের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, ভবিষ্যৎ প্রজন্মে এই প্রবণতা আরও বাড়তে পারে।
তিব্বতি মেকআপশিল্পী লামো নিজের ভাষা পড়তে ও লিখতে পারাকে সৌভাগ্য মনে করেন। তবে তাঁর মেয়েরা ম্যান্ডারিন ভাষায় বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে এবং দাদির সঙ্গে তিব্বতি ভাষায় কেবল সাধারণ কথাবার্তা বলতে পারে। তাঁর মতে, পরিবারগুলোও আগের মতো সন্তানদের মধ্যে তিব্বতি সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিতে পারছে না।
রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে তিব্বতের বিকল্প অভিজ্ঞতা
চীনের নিয়ন্ত্রণাধীন তিব্বতে ভ্রমণের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অনুমতিপত্র প্রয়োজন হয়। দালাই লামাকে ঘিরে রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার কারণে অঞ্চলটিতে চলাচলের ওপর নিয়ন্ত্রণও কঠোর। ফলে অনেক পর্যটকের কাছে তিব্বতের ঐতিহ্য দেখার বিকল্প হয়ে উঠেছে শাংগ্রি-লা।
তিব্বতের ঐতিহাসিক রাজধানী লাসার বিখ্যাত পোতালা প্রাসাদ দেখতে আগ্রহী ২২ বছর বয়সী হান-চীনা তরুণী ইয়ান সিন আপাতত শাংগ্রি-লার গ্যান্ডেন সুমৎসেলিং মঠেই তিব্বতি সংস্কৃতির অভিজ্ঞতা খুঁজছেন। তবে সংস্কৃতির বাণিজ্যিকীকরণ নিয়ে তিনিও হতাশা প্রকাশ করেছেন।
অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অস্ট্রেলিয়ান সেন্টার অন চায়না ইন দ্য ওয়ার্ল্ডের পরিচালক বেন হিলম্যান ১৯৯৯ সাল থেকে শাংগ্রি-লার সাংস্কৃতিক পরিবর্তন নিয়ে গবেষণা করছেন। তাঁর মতে, স্থানীয় কর্মকর্তারা শহরটির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য উপায়ে বাণিজ্যিকভাবে কাজে লাগাতে চান।
তিব্বতি সমাজে যাযাবর জীবনধারা কমে আসছে। শহরাঞ্চলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়ার পাশাপাশি তরুণদের জীবনযাপনেও পরিবর্তন ঘটছে। একই সঙ্গে ম্যান্ডারিন ভাষার ব্যবহার বাড়ায় তিব্বতি ভাষা ও ঐতিহ্যের চর্চা দুর্বল হয়ে পড়ছে।
অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও পর্যটন থেকে আয় বাড়লেও তিব্বতি সংস্কৃতির স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য কতটা টিকে থাকবে, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, পর্যটকদের সামনে সংস্কৃতির বাহ্যিক রূপ যত বেশি গুরুত্ব পাবে, ততই হারিয়ে যেতে পারে এর প্রকৃত ঐতিহ্য ও পরিচয়।