✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৯-০৩, | ১৮:২১:৫৪ |যুক্তরাষ্ট্রের নারী মুক্তি আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ গ্লোরিয়া স্টেইনেম মৃত্যুবরণ করেছেন। তার প্রতিষ্ঠিত ফাউন্ডেশন ইনস্টাগ্রামে দেওয়া এক পোস্টে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯২ বছর। পোস্টে বলা হয়েছে, নিউ ইয়র্ক সিটিতে নিজের বাড়িতে ভালোবাসার মানুষদের সান্নিধ্যে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন।
লেখক ও ম্যাগাজিন সম্পাদক স্টেইনেম ৫০ বছরেরও বেশি সময় আগে ‘উইমেনস অ্যাকশন অ্যালায়েন্স’ নামে একটি সংগঠনের সহ-প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যা লিঙ্গবৈষম্য বা যৌনতাভিত্তিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নিবেদিত ছিল। ১৯৭০-এর দশকে নিউ ইয়র্কে সাংবাদিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। এরপর তিনি ‘মিস’ ম্যাগাজিনটি সহ-প্রতিষ্ঠা করেন। এই প্রকাশনাটি গৃহস্থালি কাজ ও রূপচর্চার বাইরে নারীদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোকপাত করত।১৯৭০-এর দশকে নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ক অধিকারসহ বিভিন্ন দাবির পক্ষে প্রচারণায় স্টেইনেম ছিলেন অন্যতম প্রধান কণ্ঠস্বর।
২২ বছর বয়সে লন্ডনে তিনি নিজে একটি অবৈধ গর্ভপাত করিয়েছিলেন। বহু বছর পর ১৯৭৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ‘রো বনাম ওয়েড’ এক রায়ের মাধ্যমে নারীরা গর্ভপাতের সাংবিধানিক অধিকার লাভ করেন। তবে প্রায় অর্ধশতাব্দী পর তিনি সেই রায় বাতিল বা উল্টে যাওয়ার ঘটনাও প্রত্যক্ষ করেন। সমলিঙ্গের বিয়ের বৈধতা এবং নারীদের সমান অধিকার ও সমান বেতনের পক্ষেও তিনি সোচ্চার ছিলেন। পাশাপাশি মৃত্যুদণ্ড ও নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতকরণের বিরুদ্ধেও তিনি প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।
১৯৩৪ সালের ২৫ মার্চ ওহাইও অঙ্গরাজ্যের টলেডো শহরে জন্মগ্রহণকারী স্টেইনেমের শৈশব কেটেছিল কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে; ১২ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি নিয়মিত স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পাননি। ১৯৫০-এর দশকের শেষের দিকে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ করে তিনি একটি গবেষণা বৃত্তির আওতায় ভারতে যান। সেখানে দুই বছর তিনি নানা ধরনের কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন, যার মধ্যে ছিল গ্রামীণ নারীদের সরকারি নীতির বিরুদ্ধে অহিংস প্রতিবাদ সংগঠিত করতে সহায়তা করা। যা তৃণমূল পর্যায়ে সামাজিক আন্দোলনের প্রতি তার আগ্রহ জাগিয়ে তোলে।
এরপর ১৯৬০-এর দশকের শুরুর দিকে ফ্রিল্যান্স লেখক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করতে তিনি নিউ ইয়র্ক সিটিতে চলে আসেন। ‘প্লেবয় বানি’-দের কর্মপরিবেশ নিয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের মধ্য দিয়ে তিনি ব্যাপক পরিচিতি ও সাফল্য লাভ করেন। পরবর্তীতে তিনি ‘নিউ ইয়র্ক ম্যাগাজিন’-এর কলামিস্ট হিসেবে কাজ করেন এবং ১৯৭২ সালে ‘মিস’ ম্যাগাজিন প্রতিষ্ঠা করেন।
তার প্রতিষ্ঠিত সংস্থা জানিয়েছে, জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত গ্লোরিয়া সমতার জন্য কাজ করে গেছেন। গ্লোরিয়ার সবচেয়ে বড় গুণ ছিল অন্যদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনার ক্ষমতা। যার মাধ্যমে তিনি মানুষকে অনুভব করাতেন, যে তাদের গুরুত্ব আছে এবং তাদের কথা শোনা হচ্ছে। তার কথা, কাজ ও জীবনধারা মানুষকে নিজেদের প্রকৃত সত্তা নিয়ে বাঁচার সাহস ও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। গ্লোরিয়া সর্বদা তার স্বাধীনচেতা সত্তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে জীবনযাপন করেছেন, তার মধ্যে ছিল অদম্য কৌতূহল ও রসবোধ।
সংস্থাটি আরও জানায়, জীবনের শেষ দিনগুলোতে তিনি সমাজ ও মানুষের সান্নিধ্যে থেকে লেখালেখিতে সময় কাটিয়েছেন। এ সময় তিনি বাড়িতে ‘টকিং সার্কেলস’ (মতবিনিময় বা আলোচনার আসর)-এর আয়োজন করে অতিথিদের স্বাগত জানাতেন, যে প্রথাটি ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। সামাজিক ন্যায়বিচার আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে নিজের বাড়িটিকে গড়ে তোলার উদ্যোগ এবং তার আসন্ন বই ‘অ্যান আনএক্সপেক্টেড লাইফ’ এসবই হলো গ্লোরিয়ার দেওয়া এমন সব উপহার, যা আগামী প্রজন্মের ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সূত্র: বিবিসি।