ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং কি সত্যিই উপকারী, যা বলছে নতুন গবেষণা

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৮-১৫, | ১৩:১৮:১৮ |

ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং বা বিরতিভিত্তিক উপবাস ওজন কমানো থেকে শুরু করে ক্যান্সার ও জ্ঞানীয় সক্ষমতা হ্রাসের ঝুঁকি কমানোর মতো নানা সম্ভাব্য উপকারের কারণে গত কয়েক বছরে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। কিন্তু এটি আসলে কতটা কার্যকর এবং দীর্ঘমেয়াদে এর কী ধরনের স্বাস্থ্যগত সুফল রয়েছে- এ নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে এখনও বিতর্ক রয়েছে।

নতুন নতুন গবেষণায় কখনও দেখা যাচ্ছে, প্রচলিত ক্যালরি কমানোর খাদ্যাভ্যাসের তুলনায় ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং বেশি কার্যকর; আবার অন্য গবেষণায় এর তেমন বাড়তি সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি একটি গবেষণায় দাবি করা হয়েছিল, এই পদ্ধতি হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

তাহলে কি ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংয়ের উপকারিতা অতিরঞ্জিত করে প্রচার করা হয়েছে? নাকি এটি সত্যিই এমন একটি খাদ্যাভ্যাস, যা মানুষের আয়ু বাড়াতে পারে?

বিজ্ঞানীদের মতে, এই প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর পাওয়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো মানুষ বাস্তবে কী খাচ্ছে, তা সঠিকভাবে জানা। আর এই সমস্যার সমাধানে নতুন প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং কী?
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং বলতে নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে খাবার গ্রহণ থেকে বিরত থাকা বোঝায়। কেউ সপ্তাহের নির্দিষ্ট কয়েক দিন উপবাস করেন, আবার কেউ প্রতিদিনের খাবার গ্রহণের সময় কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেন। যেমন, কেউ ১৬ ঘণ্টা না খেয়ে আট ঘণ্টার মধ্যে দিনের সব খাবার গ্রহণ করেন।

এই পদ্ধতির জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ হলো- অনেকের কাছে এটি প্রচলিত ক্যালরি কমানোর খাদ্যাভ্যাসের তুলনায় ওজন কমানোর সহজ উপায় বলে মনে হয়।

ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিকাগো ক্যাম্পাসের পুষ্টিবিজ্ঞানের অধ্যাপক ক্রিস্টা ভারাডি বলেন, ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণা এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলাফল সব সময় এক নয়।
“এটি কোনও জাদুকরী পদ্ধতি নয়,” বলেন তিনি।

আমাদের পূর্বপুরুষদের খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে মিল?
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংয়ের পক্ষে একটি প্রচলিত যুক্তি হলো- মানুষের শরীর এমন এক সময়ে বিবর্তিত হয়েছে, যখন দিনে তিন বেলা খাবারের পাশাপাশি দু’বার নাশতা করার সুযোগ ছিল না।

জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানী মার্ক ম্যাটসনের মতে, মানুষ এমন পরিবেশে বিবর্তিত হয়নি যেখানে প্রতিদিন নিয়ম করে তিন বেলা খাবার ও অতিরিক্ত দু’বার নাশতা পাওয়া যেত।

উপবাসের সময় শরীরের বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আসে। প্রথমে শরীর গ্লুকোজ বা চিনি থেকে শক্তি নেয়। পরে খাবার না পেলে শরীর জমা থাকা চর্বি থেকে শক্তি উৎপাদনে চলে যায়। এই পরিবর্তনকে ‘মেটাবলিক সুইচ’ বলা হয়।

এই প্রক্রিয়ায় কোষের আচরণেও পরিবর্তন আসে। সুস্থ কোষগুলো পুরোনো ও ক্ষতিগ্রস্ত প্রোটিন পুনর্ব্যবহার করতে শুরু করে। এ প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘অটোফ্যাজি’। তাত্ত্বিকভাবে, এর ফলে কোষগুলো নিজেদের ক্ষয়ক্ষতি মেরামত ও পুনর্গঠন করতে পারে।

এ কারণেই ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংকে দীর্ঘায়ু, ডায়াবেটিস ও ক্যান্সারের ঝুঁকি কমানোর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

কিন্তু বড় প্রশ্ন- মানুষের ক্ষেত্রে কি একই ফল পাওয়া যায়?
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং নিয়ে সবচেয়ে শক্তিশালী ও চমকপ্রদ গবেষণাগুলোর অনেকগুলোই হয়েছে ইঁদুর, মাছি ও কৃমির ওপর।

গবেষণায় দেখা গেছে, ইঁদুরকে অন্য একটি দলের সমপরিমাণ ক্যালরি খেতে দিলেও খাবার গ্রহণের সময় সীমিত রাখলে তারা বয়স্ক বয়স পর্যন্ত তুলনামূলকভাবে সুস্থ ও রোগা থাকে। অন্যদিকে, অবাধে খাবার খাওয়া ইঁদুরগুলো স্থূল হয়ে পড়ে এবং নানা স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত হয়।
কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে ফলাফল এতটা স্পষ্ট নয়।

ওজন কমে, তবে নাটকীয়ভাবে নয়
ভারাডির মতে, ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংয়ের ধরন অনুযায়ী মানুষের শরীরের ওজন সাধারণত প্রায় ৫ শতাংশ কমতে পারে।

তবে তিনি বলেন, “এটি অন্য যেকোনও খাদ্যাভ্যাসের মতোই কার্যকর।”

অর্থাৎ, ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং ওজন কমাতে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু প্রচলিত ক্যালরি-নিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাসের তুলনায় এটি যে অসাধারণভাবে বেশি কার্যকর- এমন শক্ত প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি।

তবে সামান্য ওজন কমলেও শরীরে বিপাকীয় কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। কোলেস্টেরল ও রক্তচাপের মতো বিপাকীয় ঝুঁকির সূচক কিছুটা কমতে পারে। পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম বা পিসিওএসের কিছু উপসর্গও কমতে পারে।

ভারাডির মতে, কোনও ব্যক্তি খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের শুরুতে যত বেশি অসুস্থ বা বিপাকীয় ঝুঁকিতে থাকেন, ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং থেকে তার সম্ভাব্য উপকার তত বেশি হতে পারে।

তবে এসব উপকারও মানুষের ক্ষেত্রে প্রাণীর গবেষণায় দেখা ফলাফলের তুলনায় তুলনামূলকভাবে কম।

আর খুব কঠোর ধরনের ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং- যেমন এক দিন পরপর খাবার গ্রহণ- উল্টো ক্ষতির কারণ হতে পারে। কারণ এতে শরীরের পেশি বা ‘লিন বডি মাস’ কমে গিয়ে বিপাকীয় স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটতে পারে।

মস্তিষ্ক ও ক্যান্সারের ক্ষেত্রেও একই চিত্র
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং জ্ঞানীয় সক্ষমতা বা মস্তিষ্কের কার্যকারিতা উন্নত করতে পারে- এমন দাবির ক্ষেত্রেও প্রাণী ও মানুষের গবেষণার মধ্যে বড় পার্থক্য দেখা যায়।

ক্যান্সারের ক্ষেত্রেও একই ধরনের মিশ্র ফলাফল পাওয়া গেছে।

প্রাণীর ওপর গবেষণায় দেখা গেছে, ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং ক্যান্সার প্রতিরোধে সহায়তা করতে পারে এবং কেমোথেরাপির বিষাক্ত প্রভাব সহ্য করার ক্ষেত্রে শরীরকে আরও সক্ষম করে তুলতে পারে।
কিন্তু ইঁদুরের ওপর কার্যকর হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া মানুষের ক্ষেত্রে পরীক্ষায় একই ফল দেয়নি।

গবেষকেরা এমন একটি বিশেষ খাদ্যাভ্যাস তৈরি করেছিলেন, যা দীর্ঘমেয়াদি উপবাসের মতো শরীরের জৈবিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করার কথা। তত্ত্ব অনুযায়ী, এতে সুস্থ কোষগুলো আরও শক্তিশালী হবে এবং ক্যান্সার কোষ দুর্বল হয়ে পড়বে। কিন্তু গবেষণায় অংশ নেওয়া মানুষদের শরীরে প্রত্যাশিত বিপাকীয় পরিবর্তনই দেখা যায়নি।

তবে মেটাস্ট্যাটিক বা শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়া স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত নারীদের ক্ষেত্রে ৫:২ খাদ্যাভ্যাস কিছুটা আশাব্যঞ্জক ফল দেখিয়েছে। কেমোথেরাপির সময় এতে জীবনযাত্রার মান কিছুটা ভালো থাকতে পারে এবং রোগের অগ্রগতিও ধীর হতে পারে।

ইঁদুরের ক্ষেত্রে যে ফল, মানুষের ক্ষেত্রে কেন নয়?
গবেষকদের মতে, এর একটি কারণ হলো মানুষ ও ইঁদুরের বিপাকীয় ব্যবস্থার মৌলিক পার্থক্য।

হার্ভার্ড স্কুল অব পাবলিক হেলথের পুষ্টিবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক কোর্টনি পিটারসন বলেন, ইঁদুরের বিপাকীয় হার মানুষের তুলনায় অনেক বেশি।

তার মতে, ইঁদুরের ক্ষেত্রে ১৬ ঘণ্টা উপবাস মানুষের ক্ষেত্রে কয়েক দিন উপবাসের সমতুল্য হতে পারে।

আরেকটি সমস্যা হলো গবেষণাগারে ব্যবহৃত ইঁদুরগুলোর অধিকাংশই জিনগতভাবে প্রায় একই ধরনের। মানুষের মধ্যে যে বিপুল জিনগত ও শারীরিক বৈচিত্র্য রয়েছে, ইঁদুরের এসব গবেষণায় তা প্রতিফলিত হয় না।

তবে গবেষকদের মতে, সবচেয়ে বড় সমস্যা সম্ভবত জীববিজ্ঞান নয়- তথ্য।

মানুষ আসলে কী খাচ্ছে, সেটাই জানা কঠিন
প্রাণীর গবেষণায় গবেষকেরা জানেন প্রাণীটি ঠিক কী খাচ্ছে। কত ক্যালরি, কখন এবং কত পরিমাণ খাবার দেওয়া হচ্ছে- সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা যায়। মানুষের ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন।

গবেষকেরা অংশগ্রহণকারীদের নির্দিষ্ট খাদ্যাভ্যাস অনুসরণের নির্দেশ দিতে পারেন এবং খাবারের ডায়েরি রাখতে বলতে পারেন। কিন্তু এরপর অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যান এবং নিজেরাই খাবার বেছে নেন।

ফলে গবেষকেরা নিশ্চিতভাবে জানতে পারেন না, তারা আসলে কী খেয়েছেন।

ভারাডি বলেন, “পুষ্টিবিজ্ঞানের গবেষণায় মানুষ আসলে কী খাচ্ছে, তা পরিমাপ করার কোনও নির্ভরযোগ্য উপায় আমাদের নেই। তাই আমরা তাদের সৎভাবে তথ্য দেওয়ার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল।”

স্মৃতির ওপর নির্ভর করাও বড় সমস্যা
মানুষ ইচ্ছাকৃতভাবে তথ্য গোপন না করলেও তার মনে রাখা সব সময় নির্ভুল হয় না।

কেউ খাবারের ডায়েরিতে কোনও একটি খাবারের কথা লিখতে ভুলে যেতে পারেন। আবার উপবাসের সময় নিয়ম ভেঙে কিছু খেয়ে ফেললে লজ্জা বা অপরাধবোধ থেকে সেটিও গোপন করতে পারেন।

ভারাডির হিসাব অনুযায়ী, তার গবেষণায় অংশ নেওয়া মাত্র প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষ খাবারের রেকর্ড শেষ পর্যন্ত জমা দেন। বাকিদের অনেকেই তথ্য অসম্পূর্ণ রাখেন বা যথাযথভাবে দেন না।

পুষ্টিবিজ্ঞানের গবেষণায় এই সমস্যার ভয়াবহতা ভারাডি নিজের ক্যারিয়ারের শুরুর দিকেই বুঝতে পারেন। একবার গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের খাবারের রেকর্ড জমা দেওয়ার সময় তিনি দেখেন, একজন অংশগ্রহণকারী শেষ মুহূর্তে বসে পুরো এক সপ্তাহের খাবারের তালিকা লিখছেন।

পরে তার মনে প্রশ্ন জাগে- আর কতজন অংশগ্রহণকারী একই কাজ করছেন?

২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক একদল গবেষক এমন একটি সমীকরণ তৈরি করেন, যা এই সমস্যার মাত্রা সম্পর্কে ধারণা দেয়। ওয়েলসের অ্যাবেরিস্টউইথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিবিজ্ঞানী থমাস উইলসনের মতে, প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ তাদের খাবার গ্রহণের পরিমাণ কম করে জানান।

আর মানুষ অতিরিক্ত খাবার খাওয়ার তথ্য বেশি করে জানান- এমন ঘটনা খুবই বিরল।

মানুষ দিনে ২,০০০ ক্যালরি বললেও বাস্তবে ৩,৫০০!
খাবার গ্রহণের প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণে ‘ডাবলি লেবেলড ওয়াটার’ বা দ্বৈত-চিহ্নিত পানির পরীক্ষা সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতিগুলোর একটি।

এই পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের এমন পানি পান করানো হয়, যাতে নিরাপদ স্থিতিশীল হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন আইসোটোপ থাকে। শরীর থেকে ঘাম ও প্রস্রাবের মাধ্যমে এসব উপাদান কত দ্রুত বেরিয়ে যাচ্ছে, তা পরিমাপ করে গবেষকেরা নির্দিষ্ট সময়ে শরীর কত শক্তি ব্যবহার করেছে, তা হিসাব করতে পারেন।

২০২৫ সালের ওই গবেষণার সমীকরণ অনুযায়ী, মানুষ গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৪০০ থেকে ৮০০ বা তারও বেশি ক্যালরি কম করে উল্লেখ করতে পারে।

ভারাডি যখন এই পদ্ধতি ব্যবহার করে অংশগ্রহণকারীদের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে বাস্তব খাদ্যগ্রহণের তুলনা করেন, তখন ফলাফল ছিল বিস্ময়কর।

তার ভাষায়, অনেকেই প্রতিদিন ১,৬০০ থেকে ২,০০০ ক্যালরি খাওয়ার কথা জানান। কিন্তু শরীরের প্রকৃত শক্তি ব্যবহারের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেই পরিমাণ প্রায় ৩,৫০০ ক্যালরি পর্যন্ত হতে পারে।
এমনকি পুষ্টিবিদদের জন্যও খাবারের সঠিক পুষ্টিমান নির্ধারণ করা কঠিন। কারণ খাবারের পরিবেশন পরিমাণে বড় ধরনের পার্থক্য থাকতে পারে। আবার খাবারের পুষ্টিমান নির্ধারণে ব্যবহৃত তথ্যভান্ডারে সাধারণত একটি খাবারের গড় পুষ্টিমান দেওয়া থাকে, নির্দিষ্ট পণ্যের প্রকৃত পুষ্টিমান নয়।

এবার কাজে আসছে প্রযুক্তি
এই সীমাবদ্ধতাগুলো এতটাই পরিচিত যে, কিছু গবেষক এমনকি স্ব-প্রতিবেদনভিত্তিক খাদ্যতথ্যের ওপর পরিচালিত গবেষণা প্রকাশ বন্ধ করারও আহ্বান জানিয়েছেন।

কিন্তু বাস্তবে খাদ্য ডায়েরি ও জরিপ পুরোপুরি বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ এখনও এটিই গবেষকদের হাতে থাকা অন্যতম প্রধান পদ্ধতি।

তবে পরিস্থিতি বদলাতে পারে নতুন প্রযুক্তির কারণে।

কিছু গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের খাওয়া প্রতিটি খাবারের ছবি তুলতে বলা হচ্ছে। কিন্তু এতেও ব্যক্তির ওপর নির্ভর করতে হয়। তাই গবেষকেরা এমন ক্যামেরা তৈরির চেষ্টা করছেন, যা চশমা বা গলার হার হিসেবে পরা যায় এবং নির্দিষ্ট সময় পরপর ছবি তুলতে পারে কিংবা চিবানোর নড়াচড়া শনাক্ত হলে ছবি তুলতে পারে।

তবে এতে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।

ক্যামেরা ছাড়াও তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের সেন্সর। এমন গলার হার নিয়ে কাজ চলছে, যা চিবানোর ঘটনা শনাক্ত করতে পারে। স্মার্ট কাঁটা-চামচ খাবার মুখে নেওয়ার সময় এবং পরিমাণ শনাক্ত করতে পারে। এমনকি দাঁতের সঙ্গে যুক্ত করা যায়- এমন পুষ্টি শনাক্তকারী সেন্সর নিয়েও গবেষণা চলছে। এর বেশির ভাগ প্রযুক্তিই এখনও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে।

রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষাই হতে পারে বাস্তবসম্মত সমাধান
এই মুহূর্তে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত উপায় হতে পারে নিয়মিত রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষা। এর মাধ্যমে শরীর কী ধরনের পুষ্টি প্রক্রিয়াজাত করছে, সে সম্পর্কে সরাসরি তথ্য পাওয়া সম্ভব।

উইলসনের মতে, রক্ত ও প্রস্রাব বিশ্লেষণ শরীরে কোন ধরনের পুষ্টি উপাদান কতটা প্রক্রিয়াজাত হচ্ছে, সে বিষয়ে অনেক বেশি নির্ভুল তথ্য দিতে পারে।

তবে কোনও একটি প্রযুক্তিই এককভাবে সমস্যার সমাধান করবে না। গবেষকদের ধারণা, খাবারের ডায়েরি, রক্ত ও প্রস্রাবের জৈবিক সূচক এবং ক্যামেরা বা পরিধানযোগ্য সেন্সরের তথ্য একসঙ্গে ব্যবহার করলে মানুষের খাদ্যগ্রহণ সম্পর্কে অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া সম্ভব।

উইলসন ও তার সহকর্মীরা এ ধরনের সমন্বিত পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা করছেন। তাদের লক্ষ্য হলো- মানুষকে হাসপাতালের মতো নিয়ন্ত্রিত খাদ্য পরীক্ষাগারে না রেখেও তার স্বাভাবিক জীবনযাপনের মধ্যে থেকে প্রায় একই মানের তথ্য সংগ্রহ করা।

উইলসনের ভাষায়, “আমি চাই না, গতকাল আপনি কী খেয়েছিলেন তা আমাকে বসে ব্যাখ্যা করতে হবে।”

শুধু ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং নয়, পুরো পুষ্টিবিজ্ঞানেই সমস্যা
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং নিয়ে গবেষণাকে আরও বিস্তৃত করার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন মার্ক ম্যাটসন। তার মতে, ভবিষ্যৎ গবেষণায় শুধু খাবারের পরিমাণ, ক্যালরি ও খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করা হচ্ছে কি না- এসব তথ্য নিলেই হবে না; শারীরিক কর্মকাণ্ড ও ঘুমের তথ্যও একইভাবে নিয়ন্ত্রণ ও বিশ্লেষণ করতে হবে। কারণ প্রাণীর গবেষণায় এসব বিষয়ও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

এদিকে গবেষকেরা মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা এবং তাদের খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে নির্ভুল তথ্য সংগ্রহ- এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজছেন।

অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনেক ইনফ্লুয়েন্সার এখনও ইঁদুরের গবেষণার ফলাফলকে মানুষের ক্ষেত্রেও একইভাবে প্রযোজ্য বলে প্রচার করছেন এবং ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংয়ের সম্ভাব্য উপকারকে অনেক সময় অতিরঞ্জিত করছেন।

ভারাডি বলেন, ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এত বেশি বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে যে, তিনি নিজেই একটি ইউটিউব চ্যানেল চালু করার কথা ভাবছেন।

তাহলে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংয়ের আসল সত্য কী?
বর্তমান গবেষণা থেকে যে বিষয়টি তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট, তা হলো- ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং মানুষের ওজন কমাতে পারে এবং কিছু বিপাকীয় উপকারও দিতে পারে। কিন্তু প্রাণীর গবেষণায় দেখা নাটকীয় ফলাফল মানুষের ক্ষেত্রে এখনও প্রমাণিত হয়নি।

অর্থাৎ, এটি কোনও ‘জাদুকরী’ খাদ্যাভ্যাস নয়। একই সঙ্গে এটিকে সম্পূর্ণ অকার্যকর বলারও সুযোগ নেই।

মূল সমস্যা হলো, গবেষকেরা এখনও নির্ভরযোগ্যভাবে জানেন না মানুষ বাস্তবে কী খাচ্ছে, কতটা খাচ্ছে এবং কখন খাচ্ছে। ফলে বিভিন্ন গবেষণার ফলাফল পরস্পরবিরোধী হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।

আর এই সমস্যার সমাধানে প্রযুক্তি যত উন্নত হবে, ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংসহ বিভিন্ন খাদ্যাভ্যাসের প্রকৃত কার্যকারিতা সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণাও তত পরিষ্কার হবে।

পুষ্টিবিজ্ঞানের গবেষণায় বছরের পর বছর ধরে কেন কখনও কোনও খাবারকে ক্ষতিকর, আবার কখনও উপকারী বলা হয়- এর পেছনেও একই সমস্যা রয়েছে। ভারাডির ভাষায়, “মানুষ আসলে কী খাচ্ছে, সে সম্পর্কে আমাদের কোনও ধারণাই নেই।” সূত্র: বিবিসি

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..