নতুন সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে মধ্যপ্রাচ্য

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধে কি জড়িয়ে পড়বে পাকিস্তান? সৌদি ইস্যুতে বাড়ছে শঙ্কা

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৭-১৭, | ২০:০৫:০২ |

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সংঘাতের জন্ম দিতে পারে। এই পরিস্থিতিতে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় রয়েছে পাকিস্তান। বিশেষ করে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক সৌদি আরব লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ইসলামাবাদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি আরও জটিল হলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের ভূমিকা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় ভূমিকা রেখেছিল ইসলামাবাদ।

একই সময়ে সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি কার্যকর রয়েছে। পাশাপাশি হাজারো পাকিস্তানি সেনাসদস্য এবং একটি যুদ্ধবিমান স্কোয়াড্রন বর্তমানে সৌদি আরবে মোতায়েন রয়েছে। অতীতেও সৌদি আরবে ইরান-সমর্থিত হামলার ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছিল পাকিস্তান। তবে বিশ্লেষক ও কর্মকর্তাদের ভাষ্য, হুতিদের সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর সেই উদ্বেগ আরও তীব্র হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, এতে সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে।

হুতিদের দাবি, সোমবার তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি বিমানবন্দরে সৌদি বাহিনী হামলা চালিয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় তারা সৌদি আরব লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। চার বছর ধরে কার্যকর যুদ্ধবিরতির পর এটিই প্রথম সীমান্তপারের হামলা, যদিও এখন পর্যন্ত এটি একক ঘটনাতেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পাকিস্তানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, পাকিস্তানের শীর্ষ বেসামরিক ও সামরিক নেতৃত্ব ইরানকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে—সৌদি আরবের ওপর হামলাকে ইসলামাবাদ নিজেদের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করবে। তাদের ভাষায়, এটি পাকিস্তানের জন্য একটি ‘রেড লাইন’।

পাকিস্তানি নিরাপত্তা বিশ্লেষক মুহাম্মদ আমির রানা বলেন, পরিস্থিতি এত দ্রুত উত্তপ্ত হবে বলে ইসলামাবাদ ধারণা করেনি।

কর্মকর্তাদের মতে, সৌদি-ইয়েমেন সীমান্তের কাছে পাকিস্তানি সেনাসদস্য মোতায়েন থাকায় হুতিদের হামলা অব্যাহত থাকলে তারাও সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন।

এ ছাড়া হুতিদের হামলা বৃদ্ধি পেলে লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌবাণিজ্য পথ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাকিস্তানসহ বহু দেশ এই রুটের ওপর নির্ভরশীল। পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে গেলে সৌদি আরবের সঙ্গে বিদ্যমান প্রতিরক্ষা চুক্তির কারণে ইসলামাবাদ সামরিকভাবে হস্তক্ষেপের চাপেও পড়তে পারে।

অবসরপ্রাপ্ত পাকিস্তানি জেনারেল গুলাম মুস্তফা বলেন, আপাতত পাকিস্তানের শীর্ষ নেতৃত্ব সব পক্ষকে সংযত রাখার চেষ্টা করছে। তবে হুতিরা যদি সৌদি আরবে হামলার পরিধি আরও বাড়ায়, তাহলে পরিস্থিতির বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটতে পারে।

এদিকে পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের মতে, ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের মধ্যে নীতিগত বিভাজনও ইসলামাবাদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তাদের ধারণা, দেশটিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সামরিক বাহিনীর প্রভাব ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এই উত্তেজনার প্রভাব পড়েছে কূটনৈতিক তৎপরতাতেও। চলতি সপ্তাহের শুরুতে ইরানের একটি প্রতিনিধিদলের ইসলামাবাদ সফর পিছিয়ে যায়। পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসকান্দার মোমেনির নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলটি বুধবার পাকিস্তানে পৌঁছায়। ওই বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা নিয়েও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সব পক্ষের সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন করা প্রয়োজন। তার মতে, টেকসই সমাধানের একমাত্র পথ সংলাপ, কূটনীতি ও আলোচনা।

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে আরও সক্রিয় কূটনৈতিক ভূমিকা পালনের চেষ্টা করছে পাকিস্তান। তবে এর ফলে আঞ্চলিক সংকটের চাপও বাড়ছে। গত সেপ্টেম্বরে সৌদি আরবের সঙ্গে স্বাক্ষরিত প্রতিরক্ষা চুক্তিকে উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়েছিল।

অন্যদিকে জ্বালানি আমদানির জন্য পাকিস্তান ব্যাপকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল। হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে চলমান উত্তেজনার কারণে ইতোমধ্যে দেশটির জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার জরুরি পদক্ষেপও নিয়েছে।

পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পাশাপাশি এই গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ সচল রাখা।

রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এক পাকিস্তানি কর্মকর্তা বলেন, ‘হ্যাঁ, হতাশা রয়েছে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে আমরা মধ্যস্থতার উদ্যোগ থেকে সরে যাচ্ছি। এতে আমরা অনেক বিনিয়োগ করেছি এবং এটি চালিয়ে যাওয়ার স্বার্থ আমাদের রয়েছে।’

তবে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, পরিস্থিতি আরও অবনতি হলে শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানকে এক পক্ষ বেছে নেওয়ার কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হতে পারে। মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক সূত্রের ভাষ্য, যুদ্ধের অবসান সবার স্বার্থেই প্রয়োজন। কিন্তু সৌদি আরব যদি পাকিস্তানের সহায়তা চায়, তাহলে ইসলামাবাদ তাদের পাশেই দাঁড়াবে।

সূত্র : রয়টার্স।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..