লিবারল্যান্ড, ক্রিপ্টো বিলিয়নিয়ারদের নতুন স্বপ্নের দেশ!

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৭-১১, | ১৪:০৫:১৫ |

ডানিউব নদীর তীরে কাদা আর জলাভূমিতে ঘেরা ছোট্ট এক ভূখণ্ড। চারদিকে গাছপালা, কয়েকটি তাঁবু আর গাছের ওপর বানানো কুঁড়েঘর। প্রথম দেখায় এটিকে সাধারণ একটি নির্জন এলাকা মনে হলেও, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিশ্বের কয়েকজন ধনকুবের ক্রিপ্টো উদ্যোক্তার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা। তাদের লক্ষ্য- একটি এমন রাষ্ট্র গড়ে তোলা, যেখানে সরকার পরিচালিত হবে ব্লকচেইন প্রযুক্তিতে, কর থাকবে না, আর ভোটাধিকার নির্ধারিত হবে একজন নাগরিকের সম্পদের ভিত্তিতে।

এই রাষ্ট্রের নাম লিবারল্যান্ড। সার্বিয়া ও ক্রোয়েশিয়ার মধ্যকার একটি বিতর্কিত ভূখণ্ডে ২০১৫ সালে এটি প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন চেক রাজনীতিক ভিট ইয়েদলিচকা। আন্তর্জাতিকভাবে এটি কোনও স্বীকৃত রাষ্ট্র নয়, তবে ক্রিপ্টো দুনিয়ার অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব এটিকে ভবিষ্যতের রাষ্ট্রব্যবস্থার পরীক্ষাগার হিসেবে দেখছেন।

সম্প্রতি বিবিসির একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বিশ্বের অন্যতম ধনী ক্রিপ্টো উদ্যোক্তারা শুধু এই প্রকল্পে অর্থায়নই করছেন না, বরং বর্তমান গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার বিকল্প মডেল তৈরিরও চেষ্টা করছেন।

বাস্তবের জলাভূমি, ভার্চুয়ালে ভবিষ্যতের শহর
বাস্তবে লিবারল্যান্ডে পৌঁছাতে হয় নৌকায়। কারণ, স্থলপথে সেখানে প্রবেশে ক্রোয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ নানা বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।

কিন্তু ভার্চুয়াল জগতে লিবারল্যান্ডের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিশ্বখ্যাত স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান জাহা হাদিদ আর্কিটেক্টস-এর নকশায় সেখানে কল্পনা করা হয়েছে আকাশচুম্বী ভবন, ভাসমান পার্ক, আধুনিক জলকেন্দ্রিক অবকাঠামো এবং প্রযুক্তিনির্ভর নগররাষ্ট্র।

লিবারল্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা ও স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট ভিট ইয়েদলিচকার দাবি, এটি হবে বিশ্বের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল রাষ্ট্র, যেখানে প্রশাসন পরিচালিত হবে ব্লকচেইন প্রযুক্তির মাধ্যমে।

অর্থ যত বেশি, ভোটের ক্ষমতাও তত বেশি
বিশ্বের অধিকাংশ গণতান্ত্রিক দেশে প্রত্যেক নাগরিকের ভোটের মূল্য সমান। কিন্তু লিবারল্যান্ডে সেই ধারণা প্রযোজ্য নয়।

এখানে ‘লিবারল্যান্ড মেরিটস’ নামে একটি ক্রিপ্টো টোকেন রয়েছে। যে নাগরিকের কাছে যত বেশি মেরিটস থাকবে, রাষ্ট্র পরিচালনায় তার ভোটের ক্ষমতাও তত বেশি হবে।

অর্থাৎ, অর্থের বিনিময়েই রাজনৈতিক প্রভাব ও নেতৃত্ব নির্ধারণের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

প্রেসিডেন্ট ইয়েদলিচকা জানান, নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে এই ডিজিটাল টোকেনই মূল ভূমিকা পালন করে।

করমুক্ত রাষ্ট্রের স্বপ্ন
লিবারল্যান্ডের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো- এখানে কোনও ধরনের কর (ট্যাক্স) নেই।

দেশটির স্বঘোষিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও ক্রোয়েশিয়ার সাবেক সংসদ সদস্য ইভান পারনারের মতে, স্বাধীনতা ও বিকেন্দ্রীভূত অর্থনীতিতে বিশ্বাসী মানুষ সাধারণত সমাজের ধনী শ্রেণির।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রে সবাইকে নির্বিচারে প্রবেশাধিকার দিলে যুক্তরাজ্যের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যা তারা চান না।

পারনার আরও দাবি করেন, সম্পদহীন মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা ব্যয় ধনীদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে। এমনকি দরিদ্র মানুষকে প্রাণীর সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, অতিরিক্ত সহায়তা মানুষকে আত্মনির্ভরশীলতা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।

তার এই মন্তব্য ইতোমধ্যেই ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।

লিবারল্যান্ডের পেছনে জাস্টিন সান
লিবারল্যান্ডের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন চীনা ক্রিপ্টো উদ্যোক্তা জাস্টিন সান।

তার ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৮৫০ কোটি মার্কিন ডলার বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

জাস্টিন সান বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসেন দেয়ালে টেপ দিয়ে লাগানো একটি কলার শিল্পকর্ম ৬২ লাখ ডলারে কিনে পরে সেটি খেয়ে ফেলার ঘটনায়।

তার প্রতিষ্ঠিত ট্রন ব্লকচেইন বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বড় ক্রিপ্টো নেটওয়ার্ক।

মার্কিন নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো একসময় তার বিরুদ্ধে প্রতারণা ও বাজার কারসাজির অভিযোগ তুলেছিল। যদিও সান এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং পরে সমঝোতার মাধ্যমে বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়।

ট্রাম্প পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক
জাস্টিন সান শুধু লিবারল্যান্ডেই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিবারের ক্রিপ্টো ব্যবসাতেও অন্যতম বড় বিনিয়োগকারী।

তিনি ট্রাম্প পরিবারের ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফিনান্সিয়ালে ৭ কোটি ৫০ লাখ ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছেন। এছাড়া ট্রাম্প-সম্পর্কিত একটি মিমকয়েনেও তিনি কয়েক মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেন, যার মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে নৈশভোজের সুযোগ পান।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প দায়িত্ব গ্রহণের পর আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা থেকে সরে দাঁড়ালেও পারিবারিক ট্রাস্টের মাধ্যমে তারা এখনও ব্যবসাটির মালিকানা ও আর্থিক সুবিধা ভোগ করছে।

রাষ্ট্রের বদলে ব্লকচেইন?
জাস্টিন সানের বিশ্বাস, ভবিষ্যতে রাষ্ট্র পরিচালনার অনেক দায়িত্বই ব্লকচেইন প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্পন্ন হবে।

তার মতে, মহাকাশ থেকে পৃথিবীকে দেখার পর তিনি উপলব্ধি করেছেন, পৃথিবীতে কোনও দৃশ্যমান সীমান্ত নেই। তাই প্রচলিত রাষ্ট্রব্যবস্থা একসময় প্রযুক্তিনির্ভর বিকল্প ব্যবস্থায় রূপ নিতে পারে।

লিবারল্যান্ডে নাগরিকরা ডিজিটাল টোকেন ব্যবহার করে আইন ও গণভোটে অংশ নেন। সফটওয়্যার স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভোট গণনা করে। যদিও বাস্তবে এখনও আইন বাস্তবায়নে মানব প্রশাসনের প্রয়োজন হচ্ছে।

শুধু লিবারল্যান্ড নয়
বিশ্বজুড়ে একই ধরনের আরও কয়েকটি প্রকল্প চালু হয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে- 
১. হন্ডুরাসের প্রসপেরা।
২. প্রযুক্তি উদ্যোক্তা পিটার থিয়েল সমর্থিত সিস্টেডিং ইনস্টিটিউট।
৩. বিনিয়োগকারী টিম ড্রেপারের ‘ড্রেপার নেশন’, যেখানে বিটকয়েনই মূল মুদ্রা।

এসব প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো প্রচলিত রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তে প্রযুক্তিনির্ভর, সীমান্তহীন ক্ষুদ্র স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।

বিতর্কিত দর্শনের প্রভাব
এই ধারণাগুলোর পেছনে অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত হন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও চিন্তাবিদ কার্টিস ইয়ারভিন।

তার ‘প্যাচওয়ার্ক’ ধারণা অনুযায়ী, বর্তমান জাতিরাষ্ট্র ভেঙে পৃথিবীজুড়ে অসংখ্য ক্ষুদ্র সার্বভৌম রাষ্ট্র গড়ে উঠবে। এগুলো পরিচালিত হবে করপোরেট প্রতিষ্ঠানের মতো এবং নাগরিকদের আকৃষ্ট করতে একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবে।

ইয়ারভিনের কল্পনায় এসব রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন ‘সিইও-রাজা’, যারা মূলত শেয়ারহোল্ডারদের কাছে জবাবদিহি করবেন।

যুক্তরাষ্ট্রে ক্রিপ্টো লবির উত্থান
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক নির্বাচনী চক্রে যুক্তরাষ্ট্রে ক্রিপ্টো শিল্পের লবিং ব্যয় ২৩ কোটি ৮০ লাখ ডলারে পৌঁছেছে, যা জীবাশ্ম জ্বালানি শিল্পকেও ছাড়িয়ে গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ক্রিপ্টো খাতের এই ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক প্রভাব ভবিষ্যতের রাষ্ট্র ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

লিবারল্যান্ড, জাস্টিন সান, টিম ড্রেপার কিংবা অন্যান্য প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের দাবি- ব্লকচেইন প্রযুক্তি মানুষকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করবে।

তবে সমালোচকদের প্রশ্ন ভিন্ন। যদি সরকার ও রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ কমেও যায়, তাহলে সেই ক্ষমতা কার হাতে যাবে?

বিবিসির অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের উপসংহারে বলা হয়েছে, এখন পর্যন্ত যেসব উদাহরণ দেখা যাচ্ছে, তাতে প্রযুক্তি ও ডিজিটাল অবকাঠামোর নিয়ন্ত্রণ যাদের হাতে, শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা ও সম্পদও তাদের দিকেই কেন্দ্রীভূত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। সূত্র: বিবিসি

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..