অনেকে মনে করেন সবর মানে হলো হাত গুটিয়ে বসে থাকা, পরিস্থিতির কাছে নতি স্বীকার করা কিংবা শুধু কষ্টের সময় চুপ থাকা। অথচ সবরের প্রকৃত হাকিকত বা মর্ম অত্যন্ত বৈপ্লবিক ও সক্রিয়।
১. উপকরণ গ্রহণ ও কার্যকরী প্রচেষ্টার সঙ্গে ধৈর্য
ইসলামী আকিদা অনুযায়ী, সবরের প্রথম শর্ত হলো সাধ্যমতো চেষ্টা করা এবং ফলাফল অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় মাধ্যম বা ‘আসবাব’ গ্রহণ করা।
আল্লাহ তাআলা এই মহাবিশ্বকে কার্যকারণ সম্পর্কের অধীনে সৃষ্টি করেছেন। তাই কোনো উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য হাত গুটিয়ে বসে থেকে বলা যে আমি ধৈর্য ধরছি, তা মূলত ধৈর্যের নামে অলসতা। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন থেকে আমরা এর সর্বোত্তম উদাহরণ পাই। হিজরতের সময় তিনি শুধু আল্লাহর ওপর ভরসা করে বসে থাকেননি, বরং তিনি যথাযথ পরিকল্পনা করেছেন, সাহাবি হজরত আলী (রা.)-কে নিজের বিছানায় শুইয়েছেন, গুহায় আত্মগোপন করেছেন এবং একজন দক্ষ পথপ্রদর্শক নিয়োগ করেছেন।
অর্থাৎ তিনি সম্ভাব্য সব উপায় বা ‘আসবাব’ গ্রহণ করার পর ধৈর্য ধরেছেন। হাদিস শরিফে এসেছে, এক ব্যক্তি তার উট না বেঁধে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, আমি কি উটটি ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা করব? রাসুলুল্লাহ (সা.) জবাব দিলেন, আগে উটটি বাঁধো, তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা করো। (জামে তিরমিজি, হাদিস : ২৫১৭)
অতএব উপকরণের সর্বোচ্চ ব্যবহারের পর ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করাই হলো প্রকৃত সবর।
২. দোয়ার সঙ্গে ধৈর্য
ধৈর্যের সঙ্গে দোয়ার সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। মুমিনের অস্ত্র হলো দোয়া।
যখন মানুষ কোনো সংকটে পড়ে, তখন তার ধৈর্য হারানো বা হতাশ হওয়া স্বাভাবিক। এই অস্থিরতা থেকে মুক্তি পেতে এবং লক্ষ্যে অবিচল থাকতে দোয়া এক অসীম শক্তি হিসেবে কাজ করে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা ধৈর্য ও সালাতের (নামাজ ও দোয়া) মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা : আল-বাকারা, আয়াত : ১৫৩)
দোয়া মুমিনকে এই আশ্বাস দেয় যে সে একা নয়; বরং মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা তার সঙ্গে আছেন। দোয়ার মাধ্যমে যে ধৈর্য অর্জিত হয়, তা মানুষকে আধ্যাত্মিকভাবে শক্তিশালী করে এবং কঠিন পরিস্থিতিতেও মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
৩. সক্রিয়তা ও কর্মতৎপরতার সঙ্গে ধৈর্য
ধৈর্যের অর্থ কখনোই স্থবিরতা বা জড়তা নয়। সবর মানে হলো প্রতিকূল স্রোতের বিপরীতে নৌকা চালানো। সক্রিয়তা ও কর্ম শব্দ দুটি ব্যবহারের মাধ্যমে এটিই বোঝানো হয়েছে যে সংকটকালে আমাদের কর্মতৎপরতা দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিতে হবে। নবী-রাসুলদের জীবনে আমরা দেখি, কাফিরদের চরম অত্যাচার ও বাধার মুখেও তারা তাঁদের দাওয়াতের কাজ বা কর্মতৎপরতা এক মুহূর্তের জন্য থামিয়ে দেননি। তাঁরা ধৈর্যের সঙ্গে তাঁদের সক্রিয়তা অব্যাহত রেখেছিলেন।
পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর মানুষের জন্য তা-ই থাকে, যার জন্য সে চেষ্টা করে।’ (সুরা : আন-নাজম, আয়াত : ৩৯)
এই আয়াতটি প্রমাণ করে যে সক্রিয় চেষ্টা ছাড়া শুধু মৌখিক ধৈর্যের কোনো মূল্য নেই। কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়লে বা বাধা এলে সেই বাধা অতিক্রম করার মানসিক শক্তির নামই হলো সবর।
৪. বীজ বপনের সঙ্গে ধৈর্য
কৃষকের উপমাটি ধৈর্যের হাকিকত বোঝার জন্য অত্যন্ত জুতসই। একজন কৃষক জমিতে লাঙল দেয়, কঠোর পরিশ্রম করে বীজ বপন করে, আগাছা পরিষ্কার করে এবং রোদ-বৃষ্টি সহ্য করে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে। এই পুরো প্রক্রিয়াটিই সবর। সে যদি বীজ বপন না করে শুধু ফসল কাটার আশায় ধৈর্য ধরে বসে থাকত, তবে তা হতো চরম বোকামি। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সাফল্যের জন্য বর্তমানে পরিশ্রমের ‘বীজ’ বপন করতে হয়। ছাত্রের জন্য পড়ালেখা, ব্যবসায়ীর জন্য সততার সঙ্গে শ্রম, এগুলোই হলো তার ‘বীজ’। এই পরিশ্রমের প্রক্রিয়া চলাকালীন যে নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা, তাকেই প্রকৃত সবর বলা হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা ধৈর্য ধারণ করো, ধৈর্যের প্রতিযোগিতা করো এবং (সৎকাজে) সুদৃঢ় থাকো।’ (সুরা : আল-ইমরান, আয়াত : ২০০)
৫. আল্লাহর প্রতি সুধারণা
ধৈর্য ধারণকারী ব্যক্তির মনে যদি আল্লাহর প্রতি সন্দেহ থাকে, তবে সেই ধৈর্য তাকে শান্তি দিতে পারে না। ‘হুসনে জান’ বা আল্লাহর প্রতি সুধারণা হলো ধৈর্যের জ্বালানি। মুমিন বিশ্বাস করে যে আল্লাহ তাকে যে পরীক্ষায় ফেলেছেন, তার পেছনে অবশ্যই কোনো কল্যাণ নিহিত আছে। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তাআলা বলেন, আমার বান্দা আমার প্রতি যেমন ধারণা পোষণ করে, আমি তার সঙ্গে তেমন আচরণই করি। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭৪০৫)
যদি বান্দা বিশ্বাস করে যে এই কঠিন সময়ের পর অবশ্যই সুখের দিন আসবে, তবে আল্লাহ তার জন্য পথ সহজ করে দেন। কোরআন ঘোষণা দিয়েছে, ‘নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গেই স্বস্তি আছে।’ (সুরা : আলাম নাশরাহ, আয়াত : ৫-৬)
৬. তাওয়াক্কুল ও ‘কুন ফায়াকুন’-এর ওপর বিশ্বাস
সবরের চূড়ান্ত পর্যায় হলো ‘তাওয়াক্কুল’ বা আল্লাহর ওপর পূর্ণ নির্ভরতা। যখন বান্দা তার সামর্থ্য অনুযায়ী সব চেষ্টা শেষ করে, তখন সে তার ফলাফল আল্লাহর হাতে সঁপে দেয়। তখন তার হৃদয়ে এই প্রশান্তি বিরাজ করে যে আমার মালিক ‘কুন ফায়াকুন’ (হও, আর তা হয়ে যায়)-এর ক্ষমতার অধিকারী। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তিনি যখন কোনো কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন শুধু বলেন, ‘হও’, আর তা হয়ে যায়।’ (সুরা : ইয়াসিন, আয়াত : ৮২)
এই বিশ্বাসের কারণে মুমিন কখনো নিরাশ হয় না। সে জানে, দুনিয়ার সব দরজা বন্ধ হয়ে গেলেও আল্লাহর দরজা সব সময় খোলা থাকে। এই অটল বিশ্বাসের নামই হলো সবর।
৭. ধৈর্যের আনন্দদায়ক ও ফলপ্রসূ ফলাফল
যখন কোনো ব্যক্তি পরিশ্রম, দোয়া, সক্রিয়তা এবং তাওয়াক্কুলের সমন্বয়ে ধৈর্য ধারণ করে তখন তার জীবনের ফলাফল হয় অত্যন্ত চমৎকার। আল্লাহ তাআলা ধৈর্যশীলদের কোনো হিসাব ছাড়াই প্রতিদান দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন, ‘ধৈর্যশীলদের তো তাদের সওয়াব বা প্রতিদান পূর্ণমাত্রায় দেওয়া হবে কোনো হিসাব ছাড়াই।’ (সুরা : আজ-জুমার, আয়াত : ১০)
দুনিয়াতে সাফল্যের মুকুট আর আখিরাতে জান্নাতের সুউচ্চ মাকাম, উভয়ই ধৈর্যের ফসল। ইউসুফ (আ.)-এর জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায়, কুয়া থেকে দাসত্ব, জেলখানা থেকে মিসরের সিংহাসন, এই পুরো দীর্ঘ সফরে তিনি সক্রিয় ধৈর্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। ফলাফল হিসেবে আল্লাহ তাকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম সম্মান দান করেছিলেন।
তাই সবর বা ধৈর্য হলো জীবনের প্রতিটি স্তরে প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে এক নিরন্তর ও সক্রিয় লড়াই। এটি শুধু চোখের জল ফেলা বা অসহায়ত্ব প্রকাশ নয়, বরং এটি হলো, আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে সামর্থ্যের শেষ সীমা পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার নাম।
আমাদের মনে রাখা উচিত, যে সবরের সঙ্গে শ্রম নেই তা অলসতা; যে সবরের সঙ্গে দোয়া নেই তা অহংকার; আর যে সবরের সঙ্গে আল্লাহর ওপর বিশ্বাস নেই তা শুধু হতাশা। তাই একজন মুমিনের ধৈর্য হতে হবে প্রবাদে বর্ণিত ওই গুণের সমষ্টির মতো, যেখানে পরিশ্রম থাকবে, দোয়া থাকবে, সক্রিয়তা থাকবে এবং সর্বোপরি থাকবে আল্লাহর অসীম ক্ষমতার ওপর অটল বিশ্বাস। তবেই আমাদের জীবন হবে সফল, ফলপ্রসূ ও আনন্দদায়ক।
এ জাতীয় আরো খবর..