শুরু হয়েছে ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬। তিনটি বিশ্বকাপ জেতা আর্জেন্টিনা ইতোমধ্যেই দারুণ শুরু করেছে। তবে একটু এদিক ওদিক হলে দেশটির বিশ্বকাপ তিনটির জায়গায় চারটিও হতে পারত কিন্তু! যদি না তাদের পথ আগলে দাঁড়াতেন একজন ‘একহাতের দেবতা’!
সে গল্পটা প্রথম বিশ্বকাপের। সে আসরের কথা উঠলেই উরুগুয়ের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার ইতিহাস সামনে আসে। কিন্তু সেই ইতিহাসের আড়ালে লুকিয়ে অবিশ্বাস্য এক ফুটবলারের গল্প, যার নাম হেক্টর কাস্ত্রো। ছোটবেলায় দুর্ঘটনায় ডান হাত হারিয়েছিলেন তিনি। সেই তিনিই ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপ ফাইনালে উরুগুয়ের জার্সিতে গোল করেছিলেন। উরুগুয়ের রাজধানী মন্টেভিডিওর এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম নিয়েছিলেন হেক্টর কাস্ত্রো। দিন আনা দিন খাওয়া সংসার। অভাব-অনটন আর টানাপোড়েনের সংসারে বেড়ে ওঠা হেক্টর কাস্ত্রোর।
অন্য শিশুদের মতো খেলাধুলা করে সময় কাটানোর সুযোগ হয়নি হেক্টর কাস্ত্রোর। তাই অল্প বয়সেই ‘বড়’ হয়ে ওঠা তার, দায়িত্ব সামলেছেন সেই ১০ বছর বয়স থেকে। সে সময় কাঠ কাটার কাজ শুরু করেন তিনি। তিন বছর যেতে না যেতেই ঘটে যায় ভয়াবহ এক দুর্ঘটনা। বৈদ্যুতিক করাত ব্যবহার করে কাঠ কাটতে গিয়ে ডান কনুই থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তার হাত। একমুহূর্তে বদলে যায় তার জীবনের গতিপথ।
তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন একটা সময় গোলরক্ষক হবেন। কিন্তু সে দুর্ঘটনায় ভেঙে যায় তার গোলরক্ষক হওয়ার স্বপ্ন। অনেকেই হয়তো এমন পরিস্থিতিতে স্বপ্ন দেখা ছেড়ে দিতেন। কিন্তু হার মানেননি হেক্টর কাস্ত্রো। সেই লড়াই-ই তাকে পৌঁছে দিয়েছিল বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চে।
উরুগুয়েতে হেক্টর কাস্ত্রো পরিচিত ছিলেন ‘এল ডিভিনো মানকো’ বা ‘একহাতের দেবতা’ নামে। একহাত নিয়েও প্রায় ১৫ বছরের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে তিনি এমন সব কীর্তি গড়েছিলেন, যা রূপকথাকেও হার মানিয়ে দেয়। তাই উরুগুয়ের ফুটবল কিংবদন্তিদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন হেক্টর কাস্ত্রো।
বিশ্বকাপ ছাড়াও জিতেছেন কোপা আমেরিকা আর অলিম্পিক স্বর্ণপদক। ক্লাব ক্যারিয়ারে অসংখ্য ট্রফি তো রয়েছে। মাত্র ১৭ বছর বয়সে অ্যাটলেটিক ক্লাব লিটোতে যোগ দিয়ে প্রতিভার ঝলক দেখান তিনি।
১৯ বছর বয়সেই সুযোগ পান উরুগুয়ের অন্যতম সেরা ক্লাব নাসিওনালে। ১৯২৩ সালে নাসিওনালে যোগ দিয়েই লিগ শিরোপা জেতেন হেক্টর কাস্ত্রো। একই বছর জাতীয় দলেও অভিষেক হয় তার। যদিও ১৯২৪ সালের অলিম্পিক দলে জায়গা হয়নি হেক্টর কাস্ত্রোর। চার বছর পর ১৯২৮ সালের অলিম্পিকে তিনি ছিলেন উরুগুয়ে দলের অন্যতম সদস্য। সেই আসরেও চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো অলিম্পিকে সোনা জেতে উরুগুয়ে। কাস্ত্রোও অর্জন করেন নিজের প্রথম আন্তর্জাতিক শিরোপা।
প্রথম বিশ্বকাপের আসর বসেছিল উরুগুয়েতে। ১৩ থেকে ৩০ জুলাই পর্যন্ত চলেছিল প্রতিযোগিতা। অলিম্পিকে পরপর দুবার সোনা জয়ের সাফল্য এবং স্বাধীনতার শতবর্ষ উদযাপনের আবহ সামনে রেখে আয়োজক হওয়ার অধিকার পায় দক্ষিণ আমেরিকার দেশটি। রাজধানী মন্তেভিডিওতেই হয়েছিল টুর্নামেন্টের সব ম্যাচ। আর ফুটবল ইতিহাসের মহাযুদ্ধের সেই আসরই হেক্টর কাস্ত্রোকে পৌঁছে দিয়েছিল কিংবদন্তির মর্যাদায়।
১৯৩০ বিশ্বকাপে পেরুর বিপক্ষে উরুগুয়ের প্রথম ম্যাচে একমাত্র গোলটি আসে তার পা থেকেই। দেশের ইতিহাসে বিশ্বকাপের প্রথম গোলদাতা তিনিই। তবে পরের ম্যাচে সুযোগ মেলেনি। তার জায়গায় দলে আসেন জুয়ান পেরেগ্রিনো আনসেলমো। রোমানিয়া ও যুগোস্লাভিয়ার বিপক্ষে দুর্দান্ত খেলেছিলেন, এটি তারই পুরস্কার।
যদিও সেমিফাইনালে আনসেলমো চোটের কবলে পড়লে ফাইনালে আবার সুযোগ পান হেক্টর কাস্ত্রো। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ফাইনালে উরুগুয়ের শেষ গোলটি আসে কাস্ত্রোর পা থেকেই। এই কাহিনি কি রূপকথার থেকে কোনো অংশে কম?
১৯৩৬ সালে বুট জোড়া তুলে রাখেন হেক্টর কাস্ত্রো। ফুটবল জীবনের পাশাপাশি কোচের ভূমিকাতেও সফল ছিলেন তিনি। খেলোয়াড় হিসাবে তিনবার উরুগুয়ের জাতীয় লিগ জিতেছিলেন। ১৮১ ম্যাচে ১০৭ গোল করে অবসরের সময় ছিলেন প্রিমেরা ডিভিশনের চতুর্থ সর্বোচ্চ গোলদাতা।
অবসরের পর কোচিংয়ে এসে নাসিওনালকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান হেক্টর কাস্ত্রো। তার অধীনে ১৯৪০ থেকে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত টানা চারবার এবং ১৯৫২ সালে আরও একবার লিগ শিরোপা জেতে ক্লাবটি। ১৯৫৯ সালে উরুগুয়ে জাতীয় দলের কোচের দায়িত্ব নিলেও অল্প সময়ের মধ্যেই পদত্যাগ করেন। ১৯৬০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যু হয় হেক্টর কাস্ত্রো।
এ জাতীয় আরো খবর..