✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৫-০৯, | ১৪:০৪:৫৭ |ইরাকের তেল সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী আলি মারিজ আল-বাহাদলির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়া বাহিনীর কয়েকজন নেতার ওপরও নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে মার্কিন কর্তৃপক্ষ।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ বিভাগ এর কারণ হিসেবে জানিয়েছে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করে ইরানকে তেল বিক্রিতে সহায়তা করছেন তারা।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, ইরানি শাসকগোষ্ঠী দুর্বৃত্ত চক্রগুলোর মতো ইরাকি জনগণের বৈধ সম্পদ লুট করছে। ইরান তার সামরিক শক্তি ব্যবহার করে ইরাকের তেলকে সন্ত্রাসবাদে অর্থায়নের জন্য কাজে লাগাচ্ছে। এটা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হচ্ছে। আমরা তা নীরবে মেনে নেব না।
গত বৃহস্পতিবার নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর ইরাক কিংবা ইরান—কোনও পক্ষই এখনও আনুষ্ঠানিক কোনও প্রতিক্রিয়া জানায়নি। নিষেধাজ্ঞাটি এমন সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পারস্য উপসাগর থেকে তেল রফতানির গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব নিয়ে সংঘাতে লিপ্ত।
ইরানের প্রতিবেশী দেশ ইরাক সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের চাপে আছে। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, তেহরানের বেশি ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়ছে বাগদাদ। চলতি বছরের শুরুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘ইরানপন্থী’ নুরি আল-মালিকি ইরাকের প্রধানমন্ত্রী হলে যুক্তরাষ্ট্র দেশটিকে সমর্থন দেওয়া বন্ধ করতে পারে। পরে অবশ্য আল-মালিকি প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়ান।
নিষেধাজ্ঞা কাদের ওপর
যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া নিষেধাজ্ঞার তালিকায় নাম থাকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হলেন আল-বাহাদলি। তিনি বহু বছর ধরে ইরাকের তেল ব্যবস্থাপনার কাজ তদারক করেছেন। শুরুতে তিনি ইরাকের পার্লামেন্টের তেল ও গ্যাস কমিটির প্রধান ছিলেন। পরে তেলবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আসেন। ২০২৪ সাল থেকে তিনি মন্ত্রণালয়ের উপপ্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন।
অন্য যাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, তারা হলেন মুস্তফা হাশিম লাজিম আল-বাহাদলি, আহমেদ খুদাইর মাকসুস ও মোহাম্মদ ইসা কাদিম আল-শুয়াইলি। এর মধ্যে আল-বাহাদলিকে ইরান-সমর্থিত আসাইব আহল আল-হক আন্দোলনের ‘নেতা ও অর্থনৈতিক কর্মকর্তা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে মার্কিন নিষেধাজ্ঞায়। খুদাইর মাকসুস ও আল-শুয়াইলি ইরানপন্থী সংগঠন কাতাইব সাইয়্যিদ আল-শুহাদার শীর্ষ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত।
মার্কিন অর্থ বিভাগের অভিযোগ, আল-বাহাদলি ‘তেল চোরাচালানের অর্থায়ন নিয়ন্ত্রণ’ করতেন এবং ইরান ও ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) কুদস ফোর্সের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখতেন। ইরান থেকে তেল পরিবহনের চুক্তি নিয়ে আলোচনাও করতেন তিনি। মাকসুস ও আল-শুয়াইলির বিরুদ্ধে অবৈধভাবে অস্ত্র কেনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে। এই অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাদের কেউই কোনও মন্তব্য করেননি।
নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ইরান কি ইরাককে ব্যবহার করেছে
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ বিভাগের যুক্তি সেটাই। তাদের নিষেধাজ্ঞার ঘোষণায় বলা হয়েছে, আল-বাহাদলি ‘ইরাকের তেল অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়াকে সহজ করতে’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। আর এটা করার কারণে ইরান-সংশ্লিষ্ট এক তেল পাচারকারী এবং আসাইব আহল আল-হক গোষ্ঠীকে সুবিধা দিয়েছে। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, ওই পাচারকারী ইরানের তেলকে ‘ইরাকি তেল’ লেবেল করে দিয়েছিলেন, যেন তেহরান নিষেধাজ্ঞা এড়াতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র আরও বলেছে, এই চোরাচালান ব্যবস্থাকে চালু রাখতে সাহায্য করেছে ইরাক সরকারের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি। আল-বাহাদালি ছিলেন এই পুরো কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দুতে। ইরাকের তেলমন্ত্রী হায়ান আবদেল-গনি গত মার্চে বলেছিলেন, ইরানি তেলবাহী ট্যাংকারগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ভুয়া ইরাকি নথি ব্যবহার করেছিল।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে রয়টার্সকে দেওয়া বক্তব্যে বিশেষজ্ঞরা বলেন, ইরান একটি তেল চোরাচালান চক্রের মাধ্যমে বছরে অন্তত ১০০ কোটি ডলার আয় করে বলে ধারণা করা হয়। এই চক্র ইরাকি অ্যাসফল্ট (মিশ্র খনিজ) কারখানা থেকে ইরানি জ্বালানি সরিয়ে নিয়ে তা ইরাকি তেলের সঙ্গে মিশিয়ে পরে ‘পুরোপুরি ইরাকি’ হিসেবে রফতানি করে।
রয়টার্স আরও বলেছে, ইরাকে রফতানি করার মধ্য দিয়ে ইরান বৈশ্বিক মুদ্রা অর্জন করে। আর এর মধ্য দিয়ে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকিং নিষেধাজ্ঞা এড়াতে পারে।
ইরানি তেলে যুক্তরাষ্ট্রের কী নিষেধাজ্ঞা
ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞাকে ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের নীতির অংশ হিসেবে দেখে। এর লক্ষ্য, ইরান সরকারকে তাদের নীতিগত অবস্থান পরিবর্তনে বাধ্য করা।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার প্রথম মেয়াদকালে ইরানের তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। তখন তিনি তেহরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নিয়েছিলেন। সেই নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান বিশ্ববাজারে অবাধে তেল বিক্রির সুযোগ হারায়, যদিও যুক্তরাষ্ট্র কিছু দেশকে সীমিত পরিমাণে তেল কেনার অনুমতি দিয়েছিল।
ট্রাম্পের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন এই নিষেধাজ্ঞাগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বজায় রাখে। ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এগুলো আরও কঠোর করেন। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার যুদ্ধের আগের সময় পর্যন্ত এগুলো কঠোর করা হয়।
তেল ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। তেল উত্তোলনে বিশ্বে শীর্ষস্থানীয় দেশ তারা। ইরানের মোট রফতানির প্রায় ৮০ শতাংশই আসে তেল থেকে। এছাড়া দেশটির বাজেটের প্রায় এক-চতুর্থাংশের জোগান আসে তেলের আয় থেকে। সূত্র: আল-জাজিরা