মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় জ্বালানি রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে নতুন বাস্তবতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। নিয়ম-নীতির বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে এবার দৈনিক অর্ধকোটি ব্যারেল তেল উৎপাদনের দিকে হাঁটা শুরু করেছে দেশটি।
সংযুক্ত আরব আমিরাত সম্প্রতি অর্গানাইজেশন অব দ্য পেট্রোলিয়াম এক্সপোর্টিং কান্ট্রিস (ওপেক) ও ওপেক প্লাস জোট থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণার পরপরই নড়েচড়ে বসেছে উপসাগরীয় জ্বালানি রাজনীতি। যা কেবল অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং সৌদি আরবের জ্বালানি নীতির আধিপত্যের বিরুদ্ধে এক ধরনের ‘রাজনৈতিক বিদ্রোহ’ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
পিএসআইএফওএস কনসাল্টিং গ্রুপের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই পদক্ষেপ পশ্চিম এশিয়ার জন্য একটি টার্নিং পয়েন্ট। এর মাধ্যমে লম্বা সময়ের ঘনিষ্ঠ মিত্র সৌদি আরবের ওপর নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে নিজস্ব কৌশলগত পথ বেছে নিচ্ছে আবুধাবি। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও দ্রুত বর্ধনশীল এশীয় বাজারের দিকে বেশি ঝুঁকছে দেশটি।
দীর্ঘদিন ধরেই ওপেক জোটের ভেতরে সৌদি আরব ও আমিরাতের মধ্যে উত্তেজনা ছিল।
আমিরাতের কৌশল হলো—দামের চেয়ে বাজার অংশীদারিত্বকে অগ্রাধিকার দেওয়া। তাদের উৎপাদন খরচ কম এবং অর্থনীতি বৈচিত্র্যময় হওয়ায় তারা কম দামে হলেও বেশি পরিমাণে তেল বিক্রি করতে আগ্রহী।
বিশ্লেষণে বলা হয়, জীবাশ্ম জ্বালানির বৈশ্বিক চাহিদা ২০৪০ সালের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে—এই আশঙ্কা থেকেই দ্রুত তেল সম্পদ কাজে লাগাতে চায় আমিরাত।
ইতিমধ্যে দেশটি ২০৩০ সালের মধ্যে দৈনিক ৫০ লাখ ব্যারেল উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তুলতে ১২২ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে।
তবে ওপেকের কোটা ব্যবস্থার কারণে এতদিন উৎপাদন সীমিত ছিল। জোট ছাড়ার ফলে এখন এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠে নিজেদের বিনিয়োগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারবে আমিরাত।
পাশাপাশি তারা ‘মুরবান’ ক্রুডকে বৈশ্বিক মূল্য নির্ধারণের মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। যা ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআইয়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এতে বৈশ্বিক তেল ও গ্যাসের দাম কমতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপের ফলে ওপেকের সমন্বিত মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। একই সঙ্গে এই জোটের প্রভাব কমে যেতে পারে। পাশাপাশি সংযুক্ত আবর আমিরাত এখন চীন ও ভারতের মতো বড় ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি চুক্তির পথে হাঁটতে পারে।
এছাড়া, উপসাগরীয় অঞ্চলে এই সিদ্ধান্তে গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিলের (জিসিসি) ভেতরেও বিভাজন তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, এতে সৌদি আরব একা হয়ে পড়তে পারে এবং বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে মূল্যযুদ্ধে জড়ানোর ঝুঁকি বাড়তে পারে।
অন্যদিকে, ভারতীয় বহুজাতিক ব্যাংক এবং আর্থিক পরিষেবা সংস্থা আইসিআইসিআই সিকিউরিটিজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে চলমান অস্থিরতার কারণে তাৎক্ষণিক প্রভাব সীমিত থাকতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে আমিরাতের উৎপাদন বৃদ্ধি পেলে বৈশ্বিক বাজারে দামের ওপর চাপ কমতে পারে।
যদিও ওপেকের সমন্বিত সরবরাহের অভাবে বাজারে অস্থিরতা বাড়ার আশঙ্কাও করছে সংস্থাটি।
সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু একটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়—বরং উপসাগরীয় জ্বালানি রাজনীতির নতুন বাস্তবতা গড়ে তোলার সূচনা।
এ জাতীয় আরো খবর..