শ্রমজীবীরা আল্লাহর বন্ধু

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৫-০১, | ১১:৩৮:৪৩ |
জাহেলি চেতনায় পৃথিবী যখন অন্ধকারাচ্ছন্ন, মানুষে মানুষে যখন বৈষম্যের লড়াই, সভ্যতা যখন নগ্নতার কারাগারে বন্দি ঠিক তখনই শান্তি ও মানবতার বার্তা নিয়ে হাজির হন নবী মুহাম্মাদ (সা.)। ডাক দেন ইসলামের। ডাক দেন তাওহিদের। তাঁর ডাকে মরুদ্যানে ফের আসে সবুজের ছায়া। ধীরে ধীরে জগতজুড়ে শুভ্রতার বিস্তৃতি ঘটে। মানবহৃদয়ে জন্ম নেয় প্রভুর তাড়না। মানুষ বাঁচতে শেখে শুদ্ধতার মিছিলে।

মনুষ্যত্ব ও মানবিকতাবোধের প্রদীপ মিটমিট করে ঝলসে ওঠে আদিপ্রাণে। নবী মুহাম্মাদ (সা.) ঘোষণা দেন, কৃষক, শ্রমিক, জেলে, মাঝি, কামার, মুচি, রাজা-বাদশাহ সবার পরিচয় একটাই। সবাই মানুষ। রাব্বুল আলামিনের সৃষ্টি। সবার অধিকার সমান।

বিদায় হজের ভাষণে তিনি (সা.) বলেন, অনারবের ওপর আরবের আর আরবের ওপর অনারবের এবং শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণাঙ্গের ও কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। শ্রেষ্ঠত্ব শুধু আল্লাহভীতি ও ধর্ম পালনের দিক দিয়েই বিবেচিত হতে পারে।

এ ভাষণে রাসুল (সা.) শ্রমিকদের অধিকারের ব্যাপারে সতর্ক করে বলেন, ‘তোমরা তাদের ওপর কখনো জুলুম করবে না। তোমরা যা খাবে তাদেরকেও তাই খাওয়াবে। তোমরা যা পরবে, তাদেরকেও তাই পরাবে। তোমরা তাদের ওপর এমন কাজ চাপিয়ে দিও না, যা করতে তারা অক্ষম। যদি দিতেই হয় তাহলে তাদের কাজে তোমরা সাহায্য-সহযোগিতা করো।’ (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইবনে কাসির: খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ১৯৮ ও ৩২০-৩৪২, ইফাবা)

রহমাতুল্লিল আলামিন (সা.) নিজেও একজন শ্রমিক ছিলেন। ঘাম ঝরিয়ে উপার্জন করেছেন। খেটে খাওয়া জীবনযাপনে সততার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। উম্মাতের জন্যে রুটিরুজির উত্তম পন্থা শিখিয়ে গেছেন নিখুঁতভাবে। তিনি (সা.) বলেন, ‘আমিও মজুরির বিনিময়ে মক্কাবাসীদের ছাগল-ভেড়া চরিয়েছি’ (বোখারি: ২২৬২)। সব শ্রমিকদের সমান মর্যাদা ঘোষণা দিয়ে নবীজি (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ সেই মুমিনকে ভালোবাসেন, যে পরিশ্রমী।’ অর্থাৎ পরিশ্রমী বা শ্রমজীবীরা আল্লাহর বন্ধু। (আল মুজামুল আওসাত: ৯১০৯)

ইসলাম শ্রমিককে বলেছে, দক্ষ বিশ্বস্ত ও দায়িত্ববান হতে। হাদিসে এসেছে, ‘তোমাদের মধ্যে কেউ রশি নিয়ে পিঠে কাঠের বোঝা বহন করে তা বাজারে বিক্রি করে জীবনযাপন করা; এটা তার জন্যে মানুষের কাছে ভিক্ষা করার চেয়ে উত্তম।’ (বোখারি: ১৪৭১)

ইসলাম মুমিনের পরিশ্রমকে পুণ্যের ঘোষণায় বেষ্টিত করেছে। ইসলামে বলা হয়েছে, যারা জীবনের জন্যে লড়বে, লাঙ্গল-জোয়াল কাঁধে নেবে তারা সওয়াব পাবে; যেমন সওয়াব মেলে অন্যসব ইবাদতে। ন্যায়-নীতিবান শ্রমিকের পরিশ্রমকে নবীজি (সা.) জিহাদের সঙ্গে তুলনা করেছেন। একদিন এক ব্যক্তি রাসুল (সা.)-এর কাছ দিয়ে যাচ্ছিল। সাহাবায়ে কেরাম লোকটির দেহের শক্তি-সামর্থ্য এবং সাহসিকতা দেখে বললেন, ‘ইয়া রাসুলুল্লাহ, এই লোকটি যদি আমাদের সঙ্গে যুদ্ধের ময়দানে আল্লাহর রাস্তায় কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করত; তাহলে আমাদের অনেক কল্যাণ হতো।’ রাসুল (সা.) সাহাবায়ে কেরামকে বললেন, ‘এই লোকটি যদি তার ছোট ছোট সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার উদ্দেশে উপার্জনের চেষ্টায় ঘর থেকে বের হয়ে থাকে, তাহলে তোমরা শুনে রাখো; লোকটি অবশ্যই আল্লাহর রাস্তায় তথা জিহাদের ময়দানেই আছে।’

নবীজি (সা.) আবার বললেন, ‘এই লোকটি যদি তার পিতা-মাতার খেদমতের উদ্দেশে উপার্জনের চেষ্টায় ঘর থেকে বের হয়ে থাকে, তাহলে সে অবশ্যই আল্লাহর রাস্তায় তথা জিহাদের ময়দানেই আছে।’ তৃতীয়বার রাসুল (সা.) বললেন, ‘এই লোকটি যদি স্বনির্ভর হওয়ার লক্ষ্যে ঘর থেকে বের হয়ে থাকে, তবে অবশ্যই সে আল্লাহর রাস্তায় তথা জিহাদের ময়দানেই আছে।’ (আল-মুজামুস সগীর: ৯৩৯)

আমরা অনেকে শ্রমিকের ঘাম ঝরাই। তাদেরকে দিয়ে শতভাগ কাজ আদায়ের চেষ্টা করি। কিন্তু বেলাশেষে তার মজুর প্রদানে আমাদের অনীহা দেখা যায়। অজুহাতের বন্যায় তাদের শ্রম ভুলে যাই।

ভুলে যাই তাদের ডাল-ভাতের কথা। এ ব্যাপারে তাগিদ দিয়ে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধ করে দাও, তাদের শরীরের ঘাম শুকানোর আগেই।’ (মিশকাত: ২৯৮৭)

আল্লাহ আমাদেরকে হেদায়াতে কামেলা নসিব করুক। আমাদের মন্যুষত্ব ও মানবিকতাবোধের উদয় হোক। জগতের প্রতিটা শ্রমিক স্বীয় মর্যাদায় সমাসীন হোক। আমিন।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..