✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৫-০১, | ১১:২৮:২৮ |মহান মে দিবস। মেহনতি ও শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম আর অধিকার আদায়ের প্রতীকী দিন। বঞ্চনা, নির্যাতন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে শ্রমিকদের সংগ্রাম আর অধিকার আদায়ের রক্তাক্ত গৌরবময় দিন। ইতিহাসের পাতায় মে দিবস উজ্জ্বল হয়ে থাকলেও; আজও শেষ হয়নি বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ের নিরন্তর সংগ্রাম। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) কর্তৃক প্রণীত শ্রম পরিবেশ, শ্রমিকের অধিকার বাস্তবায়ন হয়নি। একদিকে অধিকার বঞ্চিত শ্রমিকদের আন্দোলন অন্যদিকে তৃতীয় বিশ্বের দেশ তথা বাংলাদেশের ৯০ ভাগ শ্রমিক জানে না তাদের অধিকার। মে দিবস কাকে বলে তা বোঝে না ওঁরা। জানেন না এই দিবসের পটভূমি, কর্মসূচি ও অধিকার। ওঁরা বোঝেন একদিন কাজ না করলেই না খেয়ে থাকতে হবে। জীবন-জীবিকার টানে কেউ মাটি কাটছে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গড়ে তুলেছেন সুউচ্চ অট্টালিকা আবার কেউ ইটভাটার আগুনের সঙ্গে সংগ্রাম করছেন। এরকম নানা কষ্টকর ও ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় শ্রমিকরা দিয়ে যাচ্ছেন তাদের অক্লান্ত শ্রম। লক্ষ্য একটাই- সারাদিন রোদে পুড়ে হাড়ভাঙা খাটুনির পর একমুঠো চাল ডাল নিয়ে বাড়ি ফেরা।
যদিও শ্রম আইনে শ্রমিকদের নিয়োগপত্র, ছবিসহ পরিচয়পত্র, সার্ভিস বহি প্রদান, রেজিস্ট্রার সংরক্ষণ, ছুটির রেজিস্ট্রার সংরক্ষণ, ছুটির বহি প্রদান, সাপ্তাহিক ছুটি, ওভারটাইম রেজিস্ট্রার, দৈনিক রেজিস্ট্রার রাখার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত ইটভাটা কিংবা নির্মাণ শ্রমিকদের জন্য কার্যকর হয়নি। বছর ঘুরে আবারও খেটে খাওয়া মানুষের স্বপ্ন সার্থকতার দিন মহান মে দিবস আসে। তবে আর দশ-পাঁচটা দিবসের মতো আপামর বাঙালির জীবনে এ নিয়ে তেমন কোনো উচ্ছ্বাস নেই। থাকার কথাও নয়। এখানে মে দিবস আসে নেহায়েত ৩০ এপ্রিলের পরের দিন ১ মে, সেই হিসেবে। ওই দিন সরকারি ছুটি থাকে। কিন্তু শ্রমিকেরা জানেন না, এই দিনটা শুধুই তাদের জন্য। তাদেরকে ও কাজকে সম্মান করার জন্য এই দিনের আয়োজন। অথচ তাদের নেই ছুটি, এ দিনেও তাদের ছুটতে হয় কাজে। মাথায় তুলতে হয় ইটের পরে ইট।
চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জেলার ১৫টি উপজেলায় মোট ৪১৩টি ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে ৩৩৭টি অবৈধ, শতকরা হিসেবে যা প্রায় ৮২ শতাংশ। এসব অবৈধ ভাটায় কাজ করা শ্রমিকদের অধিকাংশই ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে জীবন কাটাচ্ছেন।
সম্প্রতি সরেজমিনে দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়া-লোহাগাড়ায় কয়েকটি ইটভাটায় ঘুরে খোঁজ নেওয়া হয়েছে। দুই উপজেলায় বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে শতাধিক ইটভাটা রয়েছে। এসব ভাটায় হাজার হাজার শ্রমিক ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করলেও পান না ন্যায্য মজুরি, নেই স্বাস্থ্যসেবা বা নিরাপদ কর্মপরিবেশ। পরিবার-পরিজন নিয়ে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।
প্রতিটি ভাটায় আকারভেদে দেড়শ থেকে তিন শতাধিক শ্রমিক কাজ করেন। তাদের মধ্যে রয়েছে বিপুলসংখ্যক শিশু ও নারী শ্রমিক। ফলে শিশুরা শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, আর নারীরা স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। ইটভাটার চুল্লির তীব্র তাপ, বিষাক্ত ধোঁয়া ও ধুলাবালির মধ্যে কাজ করতে গিয়ে অনেক শ্রমিকই শ্বাসকষ্ট, চর্মরোগসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। তবুও জীবিকার তাগিদে কাজ ছেড়ে যাওয়ার সুযোগ নেই তাদের।
সাতকানিয়া উপজেলার ইটভাটায় দেখা যায়, প্রাপ্ত বয়স্কদের পাশাপাশি শিশুদের দিয়েও কাঁচা ইট শুকানো, ইট তৈরি, ট্রলিতে বহন এবং মাটি টানার মতো কঠিন কাজ করানো হচ্ছে। অনেক শিশু তাদের বাবা-মা বা মাঝিদের মাধ্যমে এখানে এসেছে। মৌসুমভিত্তিক শ্রমিক সংগ্রহের সময় শিশু ও নারী শ্রমিকদেরই বেশি টার্গেট করা হয়। কারণ তাদের মজুরি অপেক্ষাকৃত কম।
বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) সাতকানিয়ার কেরানীহাট এলাকার চট্টগ্রাম ব্রিকস এবং পিপিএম ব্রিকসে দেখা যায় বৃষ্টির কারণে এদিন দুইটি ভাটায় সব শ্রমিক কাজে আসেননি।
ভাটায় রেহানা আক্তার নামের এক নারী শ্রমিক জানান, তার দুইটি ছোট সন্তান আছে। ধোঁয়া ও ধুলোর মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করতে হয়। কাজের নির্দিষ্ট হিসাব নেই, বেতনও প্রত্যাশা অনুযায়ী পান না। তবুও পরিবার চালাতে ঝুঁকি নিয়েই কাজ করতে হচ্ছে।
ইটভাটার শ্রমিকদের অভিযোগ, দীর্ঘসময় কাজ করেও নির্ধারিত মজুরি পান না তারা। নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই কাজ করায় নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। অথচ এসব বিষয়ে মালিকপক্ষের তেমন নজর নেই।
জানা গেছে, আন্তর্জাতিক শ্রম আইন ও দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী ১২ বছরের কম বয়সি শিশুদের শ্রমে নিয়োগ নিষিদ্ধ। তবুও বাস্তবে ইটভাটাগুলোতে শিশু শ্রম ব্যাপকভাবে বিদ্যমান।
চট্টগ্রাম শ্রম আদালতের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট হারুনুর রশীদ রুবেল বলেন, ইটভাটার শ্রমিকদের মজুরি ও পরিবেশ অমানবিক। অনেক মালিক পরিবেশ আইন মানেন না, আবার শ্রমিকদের প্রাপ্য মজুরিও দেন না। মাঝি ও ব্যবস্থাপনার কারসাজির মাধ্যমে শ্রমিকদের শোষণ করা হয়। তিনি বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে হবে এবং শিশু শ্রম বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
চট্টগ্রামের ডেপুটি সিভিল সার্জন তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, ইটভাটার ধোঁয়া ও ধুলাবালি মানুষের শ্বাসতন্ত্রের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। বিশেষ করে শিশুদের জন্য এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তাই কোনোভাবেই শিশুদের এই কাজে নিয়োজিত করা উচিত নয়।
সাতকানিয়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, কারখানায় শিশু ও নারী শ্রমিকদের কাজ করার বিষয়ে আমরা উপজেলা প্রশাসন জানি না। ইটভাটা মালিকরা আমাদের সঙ্গে এটি নিয়ে যোগাযোগ করে না। যদি কোনো শ্রমিক কোনো বিষয়ে অভিযোগ করেন, তখন আমরা সেবা দিতে চেষ্টা করি।
সাতকানিয়া ইটভাটা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফরিদুল আলম বলেন, আমরা মালিক সমিতি বরাবরই শ্রমিকদের বেতন ও কাজের পরিবেশ নিয়ে সজাগ থাকি। যাতে কোনোভাবে শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়।