ইরানের কথিত পরমাণু অস্ত্র তৈরির অজুহাতে দেশটিতে বেপরোয়া আক্রমণ চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। তবে দেশ দুটি এখনও ইরানের বিরুদ্ধে পরমাণু অস্ত্র তৈরির কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেনি। এমনকি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) প্রধান রাফায়েল গ্রোসিও বলেছেন, ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরি করছে এমন কোনো অকাট্য প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তার পরও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তা মানতে নারাজ।
এরই মধ্যে দেশ দুটি ইরানের অসংখ্য স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে, হত্যা করা হয়েছে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে। ইরানও এর পাল্টা প্রত্যাঘাত হিসেবে ইসরায়েলসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনা লক্ষ্য করে টানা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। পাল্টাপাল্টি এই হামলায় বাড়ছে মৃতের সংখ্যা ও ক্ষয়ক্ষতি।
পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরমাণু অস্ত্রের অজুহাতে ইরানের ওপর হামলা হিতে বিপরীত হতে পারে। তাদের মতে, এই হামলা ইরানকে গোপনে পারমাণবিক বোমা তৈরির দিকে ঠেলে দিতে পারে।
বুধবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়, গত বছরের গ্রীষ্ম নাগাদ ইরানের কাছে প্রায় ৪৪০ কেজির বেশি উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়াম জমা হয়েছে, যার বিশুদ্ধতা ৬০ শতাংশ। প্রযুক্তিগতভাবে এই ইউরেনিয়াম ৬০ থেকে ৯০ শতাংশে পৌঁছানো তুলনামূলক সহজ। আর ৯০ শতাংশ বিশুদ্ধ ইউরেনিয়ামই হলো ‘ওয়েপন গ্রেড’, যা দিয়ে পারমাণবিক ওয়ারহেড তৈরি করা সম্ভব। এই মজুতকৃত ইউরেনিয়াম গ্যাস থেকে ধাতুতে রূপান্তর করা গেলে ইরান অনায়াসেই ১০টির বেশি পরমাণু বোমার ওয়ারহেড তৈরি করতে পারবে।
২০১৫ সালের চুক্তি ভেস্তে যাওয়ার পর ইরানের গড়ে ওঠা এই মজুত ধ্বংস করতেই গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে দেশটিতে হামলা চালায়। ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’-এর আওতায় মার্কিন বাহিনী ইরানের পরমাণু স্থাপনাগুলোতে বাঙ্কার বিধ্বংসী বোমা নিক্ষেপ করে। ট্রাম্প সেই সময় দাবি করেছিলেন, এই বোমা হামলায় ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। কিন্তু শিগগিরই স্পষ্ট হয়ে যায়, ট্রাম্পের কথা সত্য নয়। হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও ইস্পাহান ও নাতাঞ্জের পাহাড়ের গভীরে অবস্থিত সুড়ঙ্গসদৃশ স্থাপনাগুলো ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি।
পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ইরান সেসব সংবেদনশীল এলাকা থেকে জাতিসংঘের পরমাণু পর্যবেক্ষণ সংস্থা পরিদর্শকদের বহিষ্কার করে। এর ফলে ৪৪০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বর্তমান অবস্থা এবং মাটির গভীর সুড়ঙ্গে ঠিক কী ঘটছে, সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক মহলের নজরদারি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। আইএইএর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও স্বীকার করা হয়েছে, ইরান বর্তমানে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত রেখেছে কিনা, তা যাচাই করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
তা সত্ত্বেও বিশেষজ্ঞরা শঙ্কিত। তাদের মতে, ৪৭ বছরের পুরোনো ইরানি শাসনব্যবস্থা ধ্বংসের চেষ্টা এবং সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লা আলি খামেনির মৃত্যু ভবিষ্যতে গোটা পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে।
ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, নিরাপত্তা এবং নীতিনির্ধারণী গবেষণা প্রতিষ্ঠান মিডলবুরি ইনস্টিটিউটের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ জেফরি লুইস বলেন, ইরানে চলমান হামলাটি বড় জুয়া খেলার মতো।
কারণ, হামলা চালিয়ে যদি বর্তমান সরকারকে পুরোপুরি উৎখাত করা না যায়, তাহলে ইরানে এমন হাজারো মানুষ থাকবে, যারা এই কর্মসূচি আবারও গড়ে তুলতে সক্ষম। সে ক্ষেত্রে উত্তর কোরিয়ার মতো ইরানও এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে, যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তির বিরুদ্ধে টিকে থাকতে হলে পারমাণবিক শক্তি অর্জন করাই শ্রেয়।
১৯৭২ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক এবং অন্যান্য গণবিধ্বংসী অস্ত্রের হুমকি হ্রাসে কাজ করা ওয়াশিংটনভিত্তিক নির্দলীয় সংস্থা আর্মস কন্ট্রোল অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক কেলসি ড্যাভেনপোর্টও একমত, হামলার পরবর্তী পরিস্থিতিতে ইরানের অবশিষ্ট ক্ষমতার কাঠামোর মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রবণতা আরও বাড়বে। তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি ইরানে গৃহযুদ্ধ বা চরম অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়, তাহলে ওই বিশাল ইউরেনিয়াম মজুদের নিয়ন্ত্রণ হারানো বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য ভয়াবহ হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। সে ক্ষেত্রে পারমাণবিক সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রকে বাধ্য হয়ে স্থল অভিযানে নামতে হতে পারে, যা ট্রাম্প প্রশাসন সম্ভবত এখনও গুরুত্ব দিয়ে ভাবছে না।
এ জাতীয় আরো খবর..