প্রতিবন্ধী যমজ দুই সন্তানকে নিয়ে ১৬ বছরের সংগ্রাম

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৭-১৩, | ১৩:০৯:২২ |
যশোরের শার্শা উপজেলার কায়বা ইউনিয়নের একটি জরাজীর্ণ দুচালা টালির ঘরে বসবাস করেন দিনমজুর শরিফুজ্জামান মিলন ও তার স্ত্রী তাসলিমা আক্তার। তাদের যমজ দুই ছেলে সাজেদুল ইসলাম মাহি ও সাকিবুল ইসলাম রাফি জন্মের পর থেকেই গুরুতর প্রতিবন্ধিতায় আক্রান্ত। বর্তমানে তাদের বয়স ১৬ বছর পার হয়ে ১৭ বছর হলেও তারা স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারে না, কথা বলতে পারে না এবং নিজের দৈনন্দিন কাজও করতে সক্ষম নয়।

প্রতিদিন ভোরে ঘুম ভাঙে এক মায়ের দীর্ঘশ্বাসে। ঘুম থেকে উঠেই তাকে ছুটে যেতে হয় তার দুই সন্তানের কাছে। তারা নিজেরা বিছানা থেকে উঠতে পারে না, হাঁটতে পারে না, মায়ের কাছে কিছু চাইতে পারে না, এমনকি স্পষ্ট করে ‘মা’ বলেও ডাকতে পারে না। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর ধরে তাদের গোসল করানো, খাওয়ানো, কাপড় পরিবর্তন করানো, বিছানায় শোয়ানো কিংবা টয়লেটে নেওয়া সবকিছুই করতে হয় বাবা-মাকে কোলে তুলে। এ যেন কেবল একটি পরিবারের গল্প নয়, এটি একজন অসহায় বাবা-মায়ের অবিরাম সংগ্রাম, সীমাহীন কষ্ট আর বুকভরা দীর্ঘশ্বাসের গল্প।

দিনমজুরির কাজ করে সংসার চালান শরিফুজ্জামান মিলন। কোনো দিন কাজ পান, কোনো দিন পান না। কাজ থাকলে পরিবারের হাঁড়িতে ভাত ওঠে, না থাকলে ধার-দেনা কিংবা প্রতিবেশীদের সহায়তার দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে দুই প্রতিবন্ধী সন্তানের চিকিৎসা, বিশেষ পরিচর্যা কিংবা চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেনা তার পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে।

প্রতিবেশীরা বলেন, আমরা ছোটবেলা থেকেই মাহি ও রাফিকে এই অবস্থায় দেখে আসছি। বয়স বাড়ছে, কিন্তু ওদের জীবন বদলাচ্ছে না। দুই ছেলেকে কোলে করে গোসল করানো হয়, কোলে করে টয়লেটে নেওয়া হয়। তাদের একটি হুইলচেয়ার পর্যন্ত নেই। মিলন খুবই গরিব মানুষ। নিজের সংসার চালাতেই কষ্ট হয়। তার উপর ছেলে দুটি নিয়ে খুবই অসহায়।

গ্রামবাসীর দাবি, সরকারিভাবে অসহায় এই পরিবারটির কিছু অনুদানসহ প্রতিবন্ধী যজম দুই ভাইকে দুটি হুইল চেয়ার যেন পেতে পারে সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানাচ্ছি।

স্থানীয়দের দাবি, সরকার, সমাজসেবী সংগঠন, জনপ্রতিনিধি ও বিত্তবান ব্যক্তিরা এগিয়ে এলে অন্তত দুটি হুইলচেয়ার, উন্নত চিকিৎসা এবং একটি নিরাপদ বসতঘরের ব্যবস্থা করা সম্ভব। এতে যেমন দুই প্রতিবন্ধী সন্তানের জীবন কিছুটা সহজ হবে, তেমনি দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে সন্তানদের কোলে নিয়ে জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া বাবা-মায়ের কষ্টও কিছুটা লাঘব হবে।

মা তাসলিমা আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “একজন মা হিসেবে সবচেয়ে বড় কষ্ট হলো, আমার সন্তানরা কোনো দিন আমাকে ‘মা’ বলে ডাকতে পারেনি। অন্য মায়েদের সন্তানদের স্কুলে যেতে, খেলাধুলা করতে কিংবা মায়ের হাত ধরে হাঁটতে দেখি, তখন বুকটা ভেঙে যায়। আমার দুই ছেলে শুধু আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। তাদের কষ্ট আমি বুঝি, কিন্তু টাকার অভাবে ভালো চিকিৎসা করাতে পারিনি।”

যজম দুই ভাইয়ের পিতা শরিফুজ্জামান মিলন বলেন, আমার দুটি যমজ বাচ্চাই প্রতিবন্ধী, খুবই অসুস্থ। আমি খুবই অসহায় মানুষ। আমি একজন দিনমজুর। আমার বাবা নেই। আমার কোনো ভিটেমাটি নেই। লোকের কাছ থেকে ধার-দেনা করে চলছি। ছেলে দুটি নিয়ে খুব কষ্টে আছি। সরকারিভাবে আমাদের কিছুই দেওয়া হয়নি। সরকারের কাছে দাবি, আমার যজম প্রতিবন্ধী বাচ্চা দুটিকে সহযোগিতা করার ব্যবস্থা করা হোক।

শার্শা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফজলে ওয়াহিদ বলেন, “পরিবারটির পক্ষ থেকে লিখিত আবেদন পেয়েছি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। খুব দ্রুত উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..