✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৬-৩০, | ১৭:০৬:২০ |দীর্ঘ ৫২ বছর পর ফুটবল বিশ্বকাপের মূল আসরে ফিরেছে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো (ডিআর কঙ্গো)। আর ফিরেই উত্তর আমেরিকার মাঠে ইতিহাস গড়েছে তারা। পর্তুগালের সাথে ড্র, কলম্বিয়ার কাছে জাদরেল লড়াইয়ের পর ওয়ান উইসার জোড়া গোলে উজবেকিস্তানকে ৩-১ ব্যবধানে হারিয়ে শেষ ৩২-এর টিকিট নিশ্চিত করেছে ‘দ্য লেপার্ডস’রা। এখন তাদের সামনে প্রতিপক্ষ শক্তিশালী ইংল্যান্ড। তবে এই ফুটবলীয় রোমাঞ্চের চেয়েও বড় গল্প হয়ে উঠেছে ড্রেসিংরুম থেকে শুরু করে কঙ্গোর যুদ্ধবিধ্বস্ত প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের মনস্তাত্ত্বিক মেলবন্ধন। কঙ্গোর জাতীয় ফুটবল দল এখন কেবল একটি স্পোর্টস টিম নয় বরং শতভাগে বিভক্ত একটি দেশের জাতীয় ঐক্যের সবচেয়ে বড় প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উজবেকিস্তানের বিপক্ষে জয়ের নায়ক নিউক্যাসল স্ট্রাইকার ওয়ান উইসা ম্যাচ শেষেই নিজের কীর্তির চেয়ে বেশি মনে করেছেন দেশের মানুষকে। উনত্রিশ বছর বয়সী এই তারকা স্পষ্ট করেই বলেছেন, কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলে চলমান যুদ্ধের কথা এবং প্রতিবার জার্সি গায়ে জড়ানোর সময় সেই অঞ্চলের ভুক্তভোগী মানুষের কষ্টের কথা। উইসা নিজেই এর আগে যুদ্ধকবলিত উত্তর কিভু অঞ্চল সফর করে বিশ্বমঞ্চে সেখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তুলে ধরেছিলেন, যা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের যুদ্ধ আর রক্তমাখা খনিজ উত্তোলনের চিরচেনা চিত্রের বাইরে এক অন্য কঙ্গোকে চিনিয়েছিল। আর তাই আজ শুধু রাজধানী কিনশাসার মানুষই নয় বিদ্রোহী গোষ্ঠী এম২৩-এর দখলে থাকা অবরুদ্ধ পূর্বাঞ্চলীয় গমা ও বুকাবু শহরের মানুষও সব ভুলে রাস্তায় নেমে মেতেছেন বাঁধভাঙা উল্লাসে।
ভৌগোলিক ও মানসিকভাবে বিশাল দূরত্বে থাকা এই দেশটির মানুষ এখন ফুটবলকে কেন্দ্র করে এক সুতোয় গাঁথা পড়েছে। মাইলের পর মাইল বিস্তৃত রেইনফরেস্ট ও ভাঙাচোরা রাস্তা পার হয়ে যে রাজধানীর সাথে পূর্বাঞ্চলের মানুষের কোনোদিন দেখাই হয়নি, যে দেশে রয়েছে শত শত জাতিগোষ্ঠী আর ভাষা, সেই দেশের সবাই এখন কিনশাসার ‘স্তাদ দে মার্তির’ স্টেডিয়ামকে নিজেদের আসল ঘর মনে করে। পর্তুগাল আর উজবেকিস্তানের বিপক্ষে অভাবনীয় পারফরম্যান্সের পর কঙ্গোর ফুটবল ফেডারেশনের নতুন সভাপতি ভেরন মোসেঙ্গো ওম্বা এবং দেশের প্রেসিডেন্ট ফেলিক্স শিসেকেদিও স্বীকার করেছেন যে, বছরের পর বছর ধরে রাজনীতি যা করতে পারেনি, কঙ্গোর এই তরুণেরা ফুটবল দিয়ে তা করে দেখিয়েছেন। এই বিজয় দেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় পরিচয়কে এক অদৃশ্য মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
এই দলের আরেকটি অবিশ্বাস্য দিক হলো এর খেলোয়াড় ও সমর্থকদের মেলবন্ধন। স্কোয়াডের ছাব্বিশ জনের মধ্যে একুশ জনই কঙ্গোর বাইরে বড় হয়েছেন। অ্যারন ওয়ান-বিসাকা, অ্যাক্সেল তুয়ানজেবে বা অ্যারন শীবোলার মতো ফুটবলাররা একসময় ইংল্যান্ডের বয়সভিত্তিক দলে খেলেছেন, যারা এখন বুধবার থমাস টুখেলের শিষ্যদের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন।
একসময় প্রবাসীদের নিয়ে দেশের মানুষের মনে কিছুটা দূরত্ব থাকলেও আজ তারাই কঙ্গোর সবচেয়ে বড় ভরসা। ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর ভিসা নীতির কারণে কঙ্গো থেকে মূল সমর্থক ও সাংবাদিকরা উত্তর আমেরিকায় যেতে না পারলেও টেক্সাসের হিউস্টনকে নিজেদের ঘরের মাঠ বানিয়ে ফেলেছেন আমেরিকা ও কানাডায় থাকা কঙ্গো প্রবাসীরা। প্রবাসী খেলোয়াড়দের এই দলটিকে প্রবাসে থাকা কঙ্গোবাসী যেভাবে পরম মমতায় আগলে রেখেছে, তা সমসাময়িক কঙ্গোর এক অনন্য বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের ফলাফল যাই হোক না কেন, এই বিশ্বকাপ কঙ্গোবাসীর জন্য ইতিমধ্যেই এক পরম পাওয়া। যুদ্ধ, রাজনীতি আর রক্তক্ষয়ী ইতিহাসকে পেছনে ফেলে ফুটবল অন্তত কয়েক সপ্তাহের জন্য ১১ কোটি মানুষকে মনে করিয়ে দিয়েছে যে, তারা সবাই একই পতাকার নিচে একটি অভিন্ন পরিবার।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান