ইতালির নীল বেদনা, বিশ্বকাপেরও আক্ষেপ!

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৬-১১, | ১৮:০৫:৩৫ |

‘পাদ ইতালিয়ে’ সার্বো-ক্রোয়েশিয়ান ভাষার এই শব্দবন্ধের অর্থ ‘ইতালির পতন’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে নির্মিত একটি চলচ্চিত্রের পোস্টারে ‘আই’ অক্ষরটি একদিকে হেলানো ছিল, যা দিয়ে মূলত একটি দেশের ধসকে ইঙ্গিত করা হয়েছিল। আজ ইতালির ফুটবল যেন ঠিক সেই ধসে পড়া কাঠামোর প্রতিচ্ছবি। চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের টানা তৃতীয়বারের মতো ফুটবল বিশ্বকাপে দেখতে না পাওয়াটা কেবল ইতালিয়ানদের জন্যই নয় বিশ্বজুড়ে কোটি ফুটবলপ্রেমীর কাছে এক গভীর বেদনাদায়ক বাস্তবতা। ২০১৮ সালে যখন প্রথমবার এই বিপর্যয় ঘটেছিল, তখন অনেকে একে ফ্রাঞ্জ কাফকার ‘মেটামোরফোসিস’ গল্পের সেই অদ্ভুতুড়ে দুঃস্বপ্নের মতো মনে করেছিলেন, যা ঘুম ভাঙলেই কেটে যাবে। কিন্তু সেই বিস্ময় আর বিহ্বলতা এখন এক যুগের স্থায়ী অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

আজ থেকে বহু বছর আগে ফ্লোরেন্সের মানুষ ভালোবেসে ফুটবল খেলাটির নাম দিয়েছিল ‘কালসিও’। লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি কিংবা ম্যাকিয়াভেলির মতো মণীষীদের স্মৃতিবিজড়িত সেই ফুটবল-অনুরাগ আজ যেন কেবলই ছাই। এবারের বিশ্বকাপ বাছাইয়ের প্লে-অফ ফাইনালে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার কাছে হেরে বিদায় নেওয়ার পর ইতালির নিজস্ব গণমাধ্যমগুলো একে ‘বিশ্বকাপের অভিশাপ’ বলে আখ্যা দিয়েছে। কেউ কেউ আবার ২০০৬ সালের ফাইনালে জিনেদিন জিদানকে দেওয়া মার্কো মাতারেজ্জির সেই বিখ্যাত ঢুসের প্রসঙ্গ টেনে একে নিয়তির লিখন বলেও সান্ত্বনা খুঁজছেন। তবে অতিপ্রাকৃতিক এই ভাবনার বাইরে গিয়ে নির্মম বাস্তবতার দিকে তাকালে দেখা যায়, ইতালির এই ফুটবলীয় বিপর্যয় রাতারাতি ঘটেনি।

ইতালির ঘরোয়া ফুটবল এবং ক্লাবগুলোর ব্যর্থতার দিকে তাকালেই এই পতনের মূল কারণগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০০৯-১০ মৌসুমে ইন্টার মিলানের পর ইতালির কোনো ক্লাব আর চ্যাম্পিয়নস লিগের ট্রফি ছুঁয়ে দেখতে পারেনি। এবার তো শীর্ষ কোনো ক্লাব কোয়ার্টার ফাইনালেও জায়গা করতে পারেনি। ইউরোপের অন্যান্য শীর্ষ লিগের তুলনায় ইতালির ফুটবল এখন অর্থনীতি, আধুনিক রণকৌশল কিংবা ব্র্যান্ডিং; সব ক্ষেত্রেই বেশ পিছিয়ে পড়েছে। এক সময়ের তারকাখচিত লিগে এখন আর বিশ্বসেরা খেলোয়াড়দের আনাগোনা নেই। উল্টো ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্নে থাকা ফুটবলারদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে দলগুলোকে।

একই সঙ্গে স্থানীয় স্তরে নতুন প্রতিভা তৈরিতে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে দেশটি। ইংল্যান্ড বা জার্মানির মতো আধুনিক একাডেমিভিত্তিক উন্নয়ন ইতালিতে বড় পরিসরে ডানা মেলতে পারেনি। অবকাঠামোগত উন্নয়ন আর নতুন স্টেডিয়াম নির্মাণের প্রকল্পগুলো বছরের পর বছর আটকে থাকছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায়। এর ওপর যোগ হয়েছে কোচিং সংস্কৃতির অস্থিরতা। স্বল্পমেয়াদি সাফল্যের আশায় ক্লাবগুলো কোচদের ওপর এত বেশি চাপ সৃষ্টি করছে যে, তরুণদের সুযোগ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি দল গঠনের ঝুঁকি এখন আর কেউ নিতে চান না।

সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছে রণকৌশলে। ইতালির ঐতিহ্যবাহী রক্ষণাত্মক ও বুদ্ধিদীপ্ত ফুটবল কৌশল আধুনিক ফুটবলের তীব্র গতি, হাই-প্রেসিং ও শারীরিক সক্ষমতার কাছে পরাস্ত হয়েছে। সময়ের এই পরিবর্তনের সঙ্গে আজ্জুরিরা নিজেদের মানিয়ে নিতে বড্ড দেরি করে ফেলেছে। আর তার খেসারত দিতে হচ্ছে মাঠের ফুটবলে। চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের এই অনুপস্থিতি ফুটবল ইতিহাসের এক বড় শূন্যতা। কাফকার গল্পের সেই রূপান্তরিত পোকাটির মতোই, ইতালির ফুটবলও যেন আর কোনোভাবেই তার চেনা ও গৌরবময় অতীতে ফিরে যেতে পারছে না।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..