✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-১১-০৭, | ১৩:৪০:২২ |২০১৮ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে কেপটাউন টেস্টে বল বিকৃতির ঘটনায় অস্ট্রেলিয়া দলের সবাই বিষয়টি জানতেন বলে দাবি করেছেন উসমান খাজা। তার দাবি, শুধু ব্যাটার কিংবা বোলার নয়, দলের খেলোয়াড় থেকে শুরু করে কোচিং স্টাফ—সবাই জানতেন বল বিকৃতির পরিকল্পনার কথা।
নিজের আত্মজীবনী ‘সবর’-এ এমন বিস্ফোরক তথ্য প্রকাশ করেছেন অস্ট্রেলিয়ার সাবেক এই ওপেনার। সিডনি মর্নিং হেরাল্ডে প্রকাশিত বইয়ের কিছু অংশে খাজা জানিয়েছেন, কেপটাউনের সেই কলঙ্কিত টেস্টের আগের ম্যাচেও বল বিকৃতির কৌশল ব্যবহার করেছিল অস্ট্রেলিয়া।
ক্রিকেট ইতিহাসে ‘স্যান্ডপেপার কেলেঙ্কারি’ নামে পরিচিত ওই ঘটনায় বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিল অস্ট্রেলিয়া। এর জেরে অধিনায়ক স্টিভ স্মিথ, সহ-অধিনায়ক ডেভিড ওয়ার্নার এবং ব্যাটার ক্যামেরন ব্যানক্রফটকে নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হয়েছিল।
৩৯ বছর বয়সী খাজা সিডনি মর্নিং হেরাল্ডকে বলেন, 'এতে আমরা সবাই জড়িত ছিলাম। শুধু ব্যাটাররা নয়, শুধু বোলাররা নয়, শুধু কোচিং স্টাফও নয়। আমরা সবাই।'
তবে ওই টেস্টে খেলা অস্ট্রেলিয়ার চার বোলার—বর্তমান টেস্ট অধিনায়ক প্যাট কামিন্স, মিচেল স্টার্ক, জশ হ্যাজলউড ও নাথান লায়ন—পরিকল্পনা সম্পর্কে আগে থেকে কিছু জানতেন না বলে বরাবরই দাবি করে আসছেন।
২০২১ সালে চার বোলার যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছিলেন, 'বল বিকৃতির জন্য মাঠে কোনো বহিরাগত বস্তু ব্যবহার করা হয়েছিল, তা আমরা জানতাম না।'
খাজা জানিয়েছেন, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্ট থেকেই বল বিকৃতির বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল। পোর্ট এলিজাবেথে অনুষ্ঠিত ওই ম্যাচের পরই বল বিকৃতির কার্যকর উপকরণ হিসেবে স্যান্ডপেপারের ব্যবহার নিয়ে আলোচনা হয়।
সেন্ট জর্জেস পার্কের সাজঘরে খোলামেলা আলোচনার মধ্য দিয়েই বিষয়টি সামনে আসে বলে জানিয়েছেন তিনি।
নিজের বইয়ে খাজা লিখেছেন, 'সে সময় স্মিথ কার্যত দুই হাত তুলে বলেছিলেন, তিনি এ বিষয়ে কিছু জানতে চান না।'
সিরিজের তৃতীয় টেস্টে টেলিভিশন ক্যামেরায় ধরা পড়ে অস্ট্রেলিয়ার বল বিকৃতির ঘটনা। বলের রিভার্স সুইং আদায়ের জন্য ক্যামেরন ব্যানক্রফটকে স্যান্ডপেপার ব্যবহার করতে দেখা যায়।
ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার তদন্ত চলাকালে নিজের বক্তব্য দেওয়ার জন্য তাকে ডাকা হয়নি বলেও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন খাজা।
তিনি বলেন, 'আদর্শ পরিস্থিতিতে আমি এসব করতে চাই না। সত্য প্রকাশ করতে সামনে আসা ব্যক্তিটিও হতে চাই না। কিন্তু আমার সত্যিই মনে হয়েছিল, আট বছর পর এত দিনে প্রকৃত সত্য সামনে আসবে।'
ব্যাটার স্মিথ, ওয়ার্নার ও ব্যানক্রফট শাস্তি পেলেও বোলার কামিন্স, স্টার্ক, হ্যাজলউড ও লায়ন কীভাবে বলের অবস্থার পরিবর্তন বুঝতে পারেননি, তার কোনো ব্যাখ্যা কখনো পাওয়া যায়নি।
২০২১ সালে গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ব্যানক্রফটকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, বোলাররা বিষয়টি জানতেন কি না। উত্তরে তিনি বলেছিলেন, 'বিষয়টি বেশ স্পষ্ট বলেই আমার মনে হয়।'
ব্যানক্রফটের সাক্ষাৎকার প্রকাশের কয়েক দিন পরই যৌথ বিবৃতি দেন চার বোলার। সেখানে তারা বলেন, 'মূল বিষয়গুলো আবারও স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে আমরা বাধ্য হচ্ছি। টেলিভিশনের বড় পর্দায় ছবিগুলো দেখার আগে বলের অবস্থা পরিবর্তনের জন্য মাঠে কোনো বহিরাগত বস্তু ব্যবহার করা হয়েছিল, তা আমরা জানতাম না।'
তারা আরও বলেন, 'প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও যারা মনে করেন, আমরা বোলার বলে অবশ্যই বিষয়টি জানতাম, তাদের উদ্দেশে বলতে চাই—ওই টেস্টের আম্পায়ার নাইজেল লং ও রিচার্ড ইলিংওয়ার্থ অত্যন্ত অভিজ্ঞ ও সম্মানিত। টেলিভিশনে ছবি প্রকাশের পর তারা বল পরীক্ষা করেছিলেন। কিন্তু ক্ষতির কোনো চিহ্ন না পাওয়ায় বল পরিবর্তন করেননি।'
বিবৃতিতে তারা গুজব ও ইঙ্গিতপূর্ণ আলোচনা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, 'আমরা সম্মানের সঙ্গে অনুরোধ করছি, গুজব ছড়ানো ও ভিত্তিহীন ইঙ্গিত দেওয়া বন্ধ হোক। অনেক দিন ধরে এসব চলছে। এবার সামনে এগিয়ে যাওয়ার সময় হয়েছে।'
সম্প্রতি দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট সিরিজ শুরুর আগে বই প্রকাশের বিষয়টি নিয়ে খাজার সঙ্গে কথা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন কামিন্স। দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজটি ২-১ ব্যবধানে জিতেছিল।
৩৩ বছর বয়সী কামিন্সের দাবি, বইয়ে স্যান্ডপেপার কেলেঙ্কারি নিয়ে নতুন কোনো তথ্য প্রকাশ পেলেও তা নিয়ে তার উদ্বেগ নেই। তার মতে, বিষয়টির নিষ্পত্তি অনেক আগেই হয়ে গেছে।
গত ৮ অক্টোবর কামিন্স বলেন, 'সে (খাজা) বই লিখছে, শুধু এটুকুই আমাকে জানিয়েছে। বরাবরের মতোই আমি বলেছি, কোনো সমস্যা নেই। নিজের গল্প বলো। ঘটনাটি অনেক আগের। তখন সব তদন্ত হয়েছে, সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়েছে অসংখ্যবার।'
খাজা আরও জানিয়েছেন, কেপটাউন টেস্টের পর সাজঘরেও তিনি পুরো দলকে ঘটনার দায় নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
নিজের বইয়ে তিনি লিখেছেন, 'আমি বলেছিলাম, দল হিসেবে এর দায় নাও। আমরা দল হিসেবে এটা করেছি। কী ঘটছিল, তা আমরা জানতাম। তাই দল হিসেবেই এর দায় নিতে হবে।'
কিন্তু শেষ পর্যন্ত তেমনটি হয়নি। বরং ওই ঘটনার জন্য স্মিথ, ওয়ার্নার ও ব্যানক্রফটকেই কঠোর সমালোচনা ও শাস্তির মুখে পড়তে হয়েছিল।
আরবি শব্দ ‘সবর’ থেকে নিজের আত্মজীবনীর নামকরণ করেছেন খাজা। শব্দটির অর্থ ধৈর্য ও সহনশীলতা। বইয়ে কেপটাউন টেস্ট নিয়ে লেখা অধ্যায়টি তিনি উৎসর্গ করেছেন স্মিথ, ওয়ার্নার ও ব্যানক্রফটকে।
খাজার মতে, ওই তিনজনের প্রাপ্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে পুরো দলের সম্মিলিত দায় স্বীকার করা উচিত।
তিনি লিখেছেন, 'ওই তিনজনের কেউই প্রথমে মুখ খুলতে চাইবে না। সেটাই স্বাভাবিক। কারণ তারা কিছু বললে সেটি কেবল তাদের বক্তব্য কিংবা শোনা কথা হিসেবে বিবেচিত হবে। তাদের পক্ষে অন্য কারও কথা বলা প্রয়োজন ছিল।'
সবশেষে খাজা বলেন, 'আমি অন্য কোনো কারণে এসব করছি না। আমার মনে হয়েছে, এটাই সঠিক কাজ।'