✕


হাইকোর্টের রায়

দেওয়ানি কার্যবিধির দুটি বিধি প্রতিপালন না করে সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ অবৈধ

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-১১-০১, | ১৩:০০:৪৫ |
দেওয়ানি কার্যবিধির ৩৮ আদেশের ৫ ও ৬ বিধির বাধ্যতামূলক আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে রায় ঘোষণার আগেই সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ দেওয়াকে বেআইনি ও বাতিল ঘোষণা করে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। অর্থ ঋণ আদালতে ব্যাংক কর্তৃক দায়ের করা সম্পত্তি ক্রোকের আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে আনা এক রিট পিটিশনের চূড়ান্ত শুনানি শেষে হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ এই রায় দেন।

বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ এই নির্দেশ দেন।

মামলার বিবরণে জানা যায়, একটি ব্যাংক বাদী হয়ে তৌহিদুল ইসলাম চৌধুরীসহ ৮ জন বিবাদীর বিরুদ্ধে ১৪৮ কোটি ১৯ লাখ ২ হাজার ৮১০ টাকা দাবি করে ঢাকার অর্থ ঋণ আদালতে মামলা দায়ের করে (যা পরবর্তীতে স্থানান্তর হয়ে অর্থ ঋণ আদালত নং-৫, ঢাকায় পুনর্নম্বরকৃত হয়)। উক্ত মামলায় বিবাদীপক্ষ লিখিত জবাব দাখিল করার পর, ব্যাংক কর্তৃপক্ষ দেওয়ানি কার্যবিধির ৩৮ আদেশের ৫ বিধি এবং ১৫১ ধারা অনুযায়ী রায় ঘোষণার পূর্বে ব্যক্তিগত সম্পত্তি ক্রোকের দুটি আবেদন দাখিল করে। পরে অর্থ ঋণ আদালত কোনো যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া বা কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি না করেই গত বছরের ১৮ নভেম্বর ক্রোকের আবেদনটি মঞ্জুর করেন।

আদালতের এই আদেশের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ হয়ে বিবাদীদের একজন হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন (নং ২৪৯৮/২০২৬) দায়ের করেন। আদালত প্রাথমিক শুনানি শেষে রুল নিশি জারি করেন এবং আদেশের কার্যকারিতা স্থগিত করেন। পরে বিভিন্ন আইনি প্রক্রিয়া ও রিভিউ আবেদনের পর মামলাটি চূড়ান্ত শুনানির জন্য হাইকোর্ট বেঞ্চে ওঠে।

রিট পিটিশনারের পক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন আইনজীবী তাইসির হক। শুনানিতে তিনি যুক্তি উপস্থাপন করে বলেন, ট্রায়াল কোর্ট (অর্থ ঋণ আদালত) দেওয়ানি কার্যবিধির ৩৮ আদেশের ৫ বিধিতে বর্ণিত বিধানসমূহ মোটেও অনুসরণ করেননি। রুল ৫(১)-এর অনুচ্ছেদ (ক) ও (খ)-তে সম্পত্তি হস্তান্তরের সুনির্দিষ্ট আশঙ্কার বিষয়টি হলফনামা বা প্রমাণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করার কথা থাকলেও ব্যাংক তার আবেদনে তা করতে ব্যর্থ হয়েছে। এছাড়া ক্রোকের আদেশ দেওয়ার পূর্বে বিবাদীকে জমানত দাখিলের বা কারণ দর্শানোর যে বাধ্যতামূলক আইনি নিয়ম রয়েছে, ট্রায়াল কোর্ট তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছেন।

অন্যদিকে, ব্যাংকের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মারগুব কবি। তার সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী তাইসির মাহমুদ। তারা আদালতকে বলেন, বিবাদীরা ঋণ খেলাপি এবং তারা নিজেদের মধ্যে যোগসাজশে সম্পত্তি হস্তান্তরের চেষ্টা করছিলেন। ফলে ট্রায়াল কোর্টের দেওয়া ক্রোকের আদেশ সম্পূর্ণ আইনানুগ ও সঠিক ছিল।

উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক এবং মামলার নথি পর্যালোচনা শেষে হাইকোর্ট দেওয়ানি কার্যবিধির ৩৮ আদেশের ৫ ও ৬ বিধি উল্লেখ করে জানান, আদালতের সন্তুষ্টি এবং বিবাদীকে আইনি সুযোগ দেওয়ার বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়া লঙ্ঘন করে নিছক ভাসা-ভাসা যুক্তিতে কোনো ট্রায়াল কোর্ট এমন আদেশ দিতে পারেন না।

আদালত তার পর্যবেক্ষণে বলেন, “আদালত প্রথমে বিবাদীকে সম্পত্তির মূল্য বা সমপরিমাণ জমানত দিতে অথবা কেন জমানত দেওয়া হবে না তার কারণ দর্শাতে নির্দেশ দেবেন। এই দুই বিকল্প পালনে ব্যর্থ হলেই কেবল আদালত ক্রোকের আদেশ দিতে পারেন।”

আদালত আরও বলেন যে, অর্থ ঋণ আদালতের বিচারক দেওয়ানি কার্যবিধির সংশ্লিষ্ট বিধিগুলো বা ব্যাংকের ক্রোকের আবেদনটি ভালোভাবে পর্যালোচনা না করেই অত্যন্ত ঢিলেঢালা ও অযৌক্তিক উপায়ে উক্ত আদেশ দিয়েছেন, যা আইনের দৃষ্টিতে টেকসই নয়।

পরে হাইকোর্ট রিটের রুলটি অ্যাবসিওলিউট (চূড়ান্ত) ঘোষণা করেন এবং অর্থ ঋণ আদালতের ক্রোক আদেশটির বৈধতা খারিজ করে দেন। তবে আদালত আরও জানায়, আইনগত প্রক্রিয়ায় ব্যাংক যদি উপযুক্ত মনে করে, তবে পুনরায় নতুন করে আবেদন করতে পারবে।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..