✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৭-১৬, | ১৪:৫৮:২৩ |প্রায় ১৫ কোটি বছর ধরে এই পুরো পৃথিবী শাসন করেছে ডাইনোসররা। বিশালাকার বা ক্ষুদ্র, দলবদ্ধ বা নিঃসঙ্গ; নানা রূপের এই প্রাণীদের পায়ের নিচে একসময় কেঁপে উঠত পুরো ভূপৃষ্ঠ। দীর্ঘকাল ধরে একটি সাধারণ ধারণা প্রচলিত ছিল যে, বর্তমান রাশিয়ার ভূখণ্ডে কোনো ডাইনোসরের অস্তিত্ব ছিল না। কিন্তু গত শতাব্দীর শুরুতে এই ধারণা পুরোপুরি বদলে যায়। রাশিয়ার বুকে একসময় দাপিয়ে বেড়ানো অত্যন্ত অদ্ভুত ও উল্লেখযোগ্য ডাইনোসরদের সন্ধান পেয়ে গবেষকরা প্রমাণ করেছেন যে, বৈরী জলবায়ু আর বিশাল বনাঞ্চলের আড়ালেও লুকিয়ে ছিল প্রাগৈতিহাসিক যুগের এই দানবদের ইতিহাস।
আজ থেকে প্রায় ২৩ কোটি ৩০ লাখ বছর আগে পৃথিবীতে প্রথম ডাইনোসরের আগমন ঘটে। তখন আজকের মতো আলাদা আলাদা মহাদেশ ছিল না, বরং এক বিশাল মহাপৃষ্ঠের বুকে তারা রাজত্ব শুরু করে। ট্রায়াসিক যুগের কোনো জীবাশ্ম রাশিয়ায় পাওয়া না গেলেও জুরাসিক যুগে সেই একক ভূখণ্ড যখন ভাঙতে শুরু করে, তখন বর্তমান রাশিয়ার ইউরোপীয় অংশের বড় অঞ্চল পানিতে তলিয়ে যায়। সে সময় স্থলভাগের দ্বীপাঞ্চলগুলোতে ডাইনোসররা বসতি গড়ে তোলে এবং অগভীর সেন্ট্রাল রাশিয়ান সাগরে রাজত্ব করত প্লিসিওসর ও ইচথিওসরের মতো জলজ সরীসৃপরা। তবে মনে রাখতে হবে, ডাইনোসররা কেবল ডাঙ্গাতেই বাস করত; উড়ন্ত বা জলজ সরীসৃপরা ছিল তাদের দূর সম্পর্কের আত্মীয়। পরবর্তীতে ক্রিটেসিয়াস যুগে সাইবেরিয়া ও উত্তর মেরু অঞ্চলের আবহাওয়া বেশ উষ্ণ ছিল, যেখানে উত্তর মেরুর কাছাকাছি কাকানৌত এলাকায় ডাইনোসরের ডিমের খোসা এবং বাচ্চার হাড়ের সন্ধান মিলেছে। তীব্র শীত ও মেরু রাতের অন্ধকারে এই তৃণভোজী প্রাণীরা কীভাবে টিকে থাকত, তা নিয়ে গবেষকদের ধারণা; তারা হয়তো শীতকালীন সুপ্তাবস্থায় চলে যেত।
রাশিয়ায় ডাইনোসরের হাড় খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ। এর প্রধান কারণ হলো দেশটির বিশাল এলাকা ঘন জঙ্গল আর চিরহিমায়িত অঞ্চলে ঢাকা, যার নিচে জীবাশ্মগুলো চাপা পড়ে থাকে। অথচ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা বা চীনের মতো দেশগুলোতে পাথুরে ও উন্মুক্ত শুষ্ক অঞ্চল থাকায় খুব সহজেই জীবাশ্মের সন্ধান মেলে। তাছাড়া, সাইবেরিয়া ও দূরপ্রাচ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চলগুলো অত্যন্ত জনবিরল হওয়ায় সেখানে খননকাজ তেমন একটা হয় না। তবে ব্যতিক্রমও আছে; যেমন ব্লাগোভেশচেনস্ক শহরে বাড়ি তৈরির ভিত্তিপ্রস্তর খননের সময় হঠাৎ করেই একটি বিশাল ডাইনোসর কবরস্থানের সন্ধান পাওয়া যায়। একই সাথে প্রত্যন্ত অঞ্চলে দক্ষ জীবাশ্মবিদের অভাবও এই গবেষণাকে কিছুটা ধীরগতির করে রেখেছে।
গবেষকরা জানান, কোনো প্রাণীর মৃত্যুর পর তার হাড় জীবাশ্মে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা মাত্র ১০ লাখে একটি। কারণ সাধারণত মৃতদেহ শিকারী প্রাণীরা খেয়ে ফেলে কিংবা রোদ-বৃষ্টিতে তা নষ্ট হয়ে যায়। ডাইনোসরের হাড় সংরক্ষণের জন্য সবচেয়ে আদর্শ পরিস্থিতি হলো নদী, হ্রদ বা জলাভূমিতে ডুবে মারা যাওয়া, যেখানে অক্সিজেনবিহীন পরিবেশে কঙ্কালটি অক্ষত থাকে। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে পলিমাটির নিচে চাপা পড়ে থাকার পর হাড়ের ভেতরের শূন্যস্থান পানিতে দ্রবীভূত খনিজ পদার্থ দিয়ে পূর্ণ হয়ে পাথর বা জীবাশ্মে পরিণত হয়। কখনো কখনো এই খনিজগুলো তেজস্ক্রিয় হয়ে ওঠে, যা শনাক্ত করতে গবেষকরা গাইগার কাউন্টার ব্যবহার করেন।
আধুনিক বিজ্ঞানের ছোঁয়ায় জীবাশ্ম নিয়ে গবেষণার ধরন সম্পূর্ণ বদলে গেছে। বর্তমানে টমোগ্রাফি প্রযুক্তির সাহায্যে হাড়ের ক্ষতি না করেই তার ভেতরের গঠন স্ক্যান করা সম্ভব হচ্ছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, ডাইনোসররা মোটেও ঠান্ডা রক্তের বা আঁশযুক্ত প্রাণী ছিল না, বরং তাদের অধিকাংশই ছিল উষ্ণ রক্তের এবং তাদের শরীরে রঙিন পালক ছিল। এমনকি পাখির পালকের রঞ্জক কণার সঙ্গে তুলনা করে প্রাচীন ডাইনোসরদের গায়ের রঙও এখন নির্ণয় করা সম্ভব। এ কারণেই অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন, আজকের পাখিরা আসলে ডাইনোসরদেরই একটি বিবর্তিত রূপ। প্রায় ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে রাশিয়ার বুক থেকে শেষ অপাখি (নন-এভিয়ান) ডাইনোসর বিলুপ্ত হয়ে গেলেও তাদের নিয়ে কৌতূহল ও গবেষণা এখনো অব্যাহত রয়েছে।