ইরানের আলোচক দলের প্রধান মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, হরমুজ প্রণালি আর কখনো যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থায় ফিরবে না এবং আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় এটি ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত চার-পক্ষীয় আলোচনায় অংশ নিয়ে সোমবার দেশে ফেরার পথে পার্লামেন্ট স্পিকার কালিবাফ বলেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাম্প্রতিক চুক্তি এই কৌশলগত জলপথের পরিস্থিতিকে মৌলিকভাবে পরিবর্তন করেছে।
ইরানি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “সবাইর জানা উচিত যে, হরমুজ প্রণালির প্রশাসন আর কখনো যুদ্ধের আগের অবস্থায় ফিরে যাবে না। আন্তর্জাতিক বিধি-বিধান অবশ্যই মানা হবে, তবে হরমুজ প্রণালি ইরানই পরিচালনা করবে।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের অবশ্যই আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মোজতবা খামেনির নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে এবং বুঝতে হবে যে তাঁর বক্তব্য ও নির্দেশনাই চূড়ান্ত।”
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ১৮ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে ১৪ দফা বিশিষ্ট ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এবং অন্যান্য আঞ্চলিক দেশের সমর্থনে কয়েক মাসের নিবিড় আলোচনার পর এই চুক্তি চূড়ান্ত হয় এবং কার্যকর হয়।
চুক্তি অনুযায়ী, উভয় পক্ষ ৬০ দিনের একটি আলোচনাকাল শুরু করেছে, যার লক্ষ্য একটি পূর্ণাঙ্গ চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানো।
সমঝোতা স্মারকের ৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, চুক্তি স্বাক্ষরের পর ইরান সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে ৬০ দিনের জন্য বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করবে এবং পারস্য উপসাগর থেকে ওমান সাগর এবং বিপরীতমুখী যাত্রায় কোনো ফি নেওয়া হবে না।
কূটনীতি যুদ্ধক্ষেত্রেরই ধারাবাহিকতা
গালিবাফ সামরিক সাফল্য ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মধ্যে বিভাজন তৈরির প্রচেষ্টা প্রত্যাখ্যান করেন।
তিনি বলেন, আলোচনা হচ্ছে “সংগ্রামের একটি পদ্ধতি এবং সংগ্রামের ধারাবাহিকতা”। তাঁর মতে, সামরিক বিজয়কে স্থায়ী করতে রাজনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা সুরক্ষিত করতে হয়।
তিনি বলেন, “সুইজারল্যান্ডে আমাদের সফর ছিল যুদ্ধক্ষেত্রের সরাসরি ধারাবাহিকতা। আমাদের সশস্ত্র বাহিনী সম্মান, শক্তি ও সাহসের সঙ্গে বড় বিজয় অর্জন করেছে। যুদ্ধবিরতি ও যুদ্ধের সমাপ্তির পর্যায়ে আমরা আলোচনার মাধ্যমে সেই ধাপ এগিয়ে নিয়েছি।”
তিনি আরও বলেন, ইরানের কৌশল কঠোর ও নরম—উভয় ধরনের শক্তির সমন্বয়। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং বড় ধরনের ছাড় কূটনীতির মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে, যা কেবল সামরিক উপায়ে করতে গেলে অনেক বেশি ব্যয়বহুল হতো।
নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধ শিথিল
কালিবাফ জানান, চুক্তি স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গেই তেল অবরোধ তুলে নেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত তেল রপ্তানি, পেট্রোকেমিক্যাল, ব্যাংকিং, বীমা ও পরিবহন খাত-সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞাগুলো স্থগিত করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সুইজারল্যান্ডের আলোচনায় ইরানের অবরুদ্ধ অর্থ মুক্তির বিষয়টি চূড়ান্ত হয়েছে, যার মধ্যে ৬ বিলিয়ন ডলারের দুটি কিস্তিও রয়েছে।
তিনি বলেন, “যুদ্ধের সমাপ্তি ও অবরোধ প্রত্যাহার সংলাপের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে—যা সংগ্রামের একটি পদ্ধতি এবং যা মাঠের শক্তির ওপর নির্ভর করে সম্ভব হয়েছে।”
সতর্ক করে তিনি বলেন, “বাস্তবায়নে কোনো সমস্যা দেখা দিলে আমরা ক্ষেপণাস্ত্র দিয়েও এবং আলোচনার মাধ্যমেও জবাব দিতে পারি।”
ওয়াশিংটনের প্রতি কঠোর বার্তা
গালিবাফ স্পষ্ট করে বলেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বাস করে না এবং নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য চুক্তিতে শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করেছে।
তিনি জানান, গভীর অবিশ্বাসের কারণেই এমন ধারা রাখা হয়েছে যাতে চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই যুক্তরাষ্ট্রকে নির্দিষ্ট বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হয়।
তিনি দাবি করেন, চুক্তি স্বাক্ষরের পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে তাঁর আগের বক্তব্য সংশোধন করতে বাধ্য হতে হয়েছে।
ট্রাম্প প্রথমে দাবি করেছিলেন যে, হরমুজ প্রণালি অবিলম্বে উন্মুক্ত হবে। কিন্তু ইরান নিশ্চিত করেছে, প্রণালিটি তাদের নির্ধারিত শর্ত ও সময়সূচি অনুযায়ী খোলা হবে।
গালিবাফ বলেন, “এটাই ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শক্তি। আমরা ট্রাম্পকে তাঁর প্রকাশিত বার্তা সংশোধন করতে বাধ্য করেছি। এটি আমাদের কঠোর ও নরম শক্তির সমন্বয়ের ফল।”
লেবানন প্রসঙ্গ
আলোচক দলের প্রধান লেবাননের পরিস্থিতি সম্পর্কেও কথা বলেন। তাঁর দাবি, সুইজারল্যান্ডে আলোচনা শুরু হওয়ার পর থেকে লেবাননের বিরুদ্ধে শত্রুপক্ষের হামলা বন্ধ হয়েছে এবং বহু বাস্তুচ্যুত মানুষ ঘরে ফিরতে শুরু করেছে।
তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে, ইরান লেবাননের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে কাজ চালিয়ে যাবে।
নিজেকে কূটনীতিক নয়, বরং “একজন যোদ্ধা” হিসেবে বর্ণনা করে গালিবাফ বলেন, ইরানের সামরিক ও কূটনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে কাজ করে।
তিনি সতর্ক করেন, চুক্তি লঙ্ঘন বা বাস্তবায়নে ব্যর্থতার জবাব ইরান সামরিক ও কূটনৈতিক—উভয় উপায়েই দিতে পারে।
সবশেষে তিনি জোর দিয়ে বলেন, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে ইরানের প্রতিরোধের মাধ্যমে যে নতুন কৌশলগত বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তা আর পরিবর্তনযোগ্য নয়।
এ জাতীয় আরো খবর..