✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৩-০১, | ২২:৪১:১৯ |জেরুজালেমের পশ্চিমে উপকূলীয় শহর জাফায় যাওয়ার পথে অবস্থিত বেইত শেমেশ শহরে রোববার (১ মার্চ, ২০২৬) একটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। এতে বেশকিছু ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে একটি ভবন সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে। এখন পর্যন্ত অন্তত নয়জন ইসরায়েলির মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। উদ্ধারকর্মীরা এখনও ধ্বংসস্তূপের নিচে বেঁচে থাকা ব্যক্তিদের সন্ধানে তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছেন।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই হামলার আগে কোনো সতর্ক সংকেত বা সাইরেন বাজেনি। বেইত শেমেশে কেন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যর্থ হলো, তা খতিয়ে দেখার ঘোষণা দিয়েছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ইসরায়েলের এই অত্যাধুনিক ও বহুমুখী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যে ‘অভেদ্য’ বা ত্রুটিমুক্ত নয় এবং শহরগুলোর দিকে ধেয়ে আসা প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্রকে মাঝপথে রুখে দিতে পারে না—এই ঘটনা সেটিই প্রমাণ করল।
চলমান এই উত্তেজনার মধ্যে তেল আবিবসহ অন্যান্য শহরেও এমন চিত্র দেখা গেছে। এমনকি গত জুনে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের আগের দফার হামলার সময়ও একই ধরনের ব্যর্থতা পরিলক্ষিত হয়েছিল।
ইরান এটি প্রমাণ করেছে যে, তাদের কাছে এমন ব্যালিস্টিক ও উন্নত প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে যা ইসরায়েলি শহরগুলোর প্রাণকেন্দ্রে আঘাত হানতে সক্ষম। এর ফলে শুধু অবকাঠামোই নয়, জানমালেরও ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। এই ঘটনাটি ইসরায়েল সরকারের দীর্ঘদিনের প্রচারিত সেই ইমেজ বা ভাবমূর্তিকে সংকটে ফেলেছে, যেখানে তারা নিজেদের অপরাজেয়, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং ইরানের ওপর নিরবচ্ছিন্ন চাপ বজায় রাখার দাবি করে আসছিল।

ইসরায়েলের যত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা
আয়রন ডোম, ডেভিড’স স্লিং এবং অ্যারো—বিশ্বের অন্যতম সেরা হিসেবে পরিচিত হলেও, সাম্প্রতিক সময়ে কিছু সীমাবদ্ধতা ও ব্যর্থতার চিত্র ফুটে উঠেছে। বেইত শেমেশ বা তেল আবিবের মতো শহরগুলোতে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার প্রেক্ষাপটে এই ব্যবস্থার ‘ব্যর্থতা’ নিয়ে তিনটি প্রধান কারণ ও তথ্য নিচে দেওয়া হলো—
১. ‘স্যাচুরেশন অ্যাটাক’ বা একসাথে অনেক হামলা
যেকোনো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি নির্দিষ্ট সীমা থাকে। ইরান যদি একসাথে কয়েকশ ড্রোন এবং ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে, তখন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার রাডার ও ইন্টারসেপ্টরগুলো সবগুলোকে একসাথে ট্র্যাক করতে পারে না। একে সামরিক ভাষায় ‘স্যাচুরেশন অ্যাটাক’ বলা হয়। যখন ধেয়ে আসা মিসাইলের সংখ্যা ইন্টারসেপ্টরের চেয়ে বেশি হয়, তখন কিছু মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যুহ ভেদ করে মূল লক্ষ্যে আঘাত হানে।
২. হাইপারসনিক ও উন্নত প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্র
ইরান দাবি করেছে তারা ‘ফাত্তাহ’ বা এই জাতীয় হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে, যা শব্দের চেয়েও কয়েকগুণ দ্রুত চলে এবং মাঝ আকাশে গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে। ইসরায়েলের বর্তমান ‘অ্যারো-৩’ বা ‘ডেভিড’স স্লিং' ব্যবস্থাগুলো সাধারণ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রুখতে দক্ষ হলেও, এই ধরনের অত্যাধুনিক ও ক্ষিপ্রগতির ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত বা ধ্বংস করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।

৩. প্রযুক্তিগত ত্রুটি বা সাইরেন না বাজা
বেইত শেমেশ শহরের ঘটনা পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার আগে কোনো সাইরেন বাজেনি। এটি সাধারণত দুটি কারণে হয়—
প্রথমত, সেন্সর ফেইলর অর্থাৎ রাডার যদি ভুলবশত মনে করে মিসাইলটি জনশূন্য এলাকায় পড়বে, তখন সাইরেন বাজে না। দ্বিতীয়ত, শনাক্তকরণে বিলম্ব অর্থাৎ কিছু ক্ষেপণাস্ত্র খুব নিচু দিয়ে বা অত্যন্ত দ্রুত আসায় রাডার সেগুলোকে সময়মতো শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়।
৪. অর্থনৈতিক ও লজিস্টিক সীমাবদ্ধতা
একটি ইরানি ড্রোন বা সাধারণ মিসাইল বানাতে যে খরচ হয়, সেটি ধ্বংস করতে ইসরায়েলের ব্যবহৃত একটি ইন্টারসেপ্টর মিসাইলের (যেমন: তামির বা অ্যারো) খরচ তার চেয়ে বহুগুণ বেশি। দীর্ঘমেয়াদের যুদ্ধে ইসরায়েলের কাছে ইন্টারসেপ্টর মিসাইলের মজুত কমে গেলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে।
ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি মূলত একটি ‘মাল্টি-লেয়ারড’ ফিল্টার। এটি ৯০% বা ৯৫% মিসাইল রুখতে পারলেও বাকি ৫% বা ১০% মিসাইল শহরগুলোতে আঘাত হানে, যা বড় ধরনের জানমালের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই এটি মোটেও ‘অভেদ্য’ বা ‘ফুলপ্রুফ’ নয়।
সূত্র : আল-জাজিরা