রেলের উন্নয়নে খরচ দেড় লাখ কোটি, তবু ৭০ শতাংশ ইঞ্জিনই মেয়াদোত্তীর্ণ!
অপ্রয়োজনীয় উন্নয়নে লোকসান বাড়ছে বাংলাদেশ রেলওয়ের। গত পনেরো বছরে রেলের উন্নয়নে খরচ হয়েছে দেড় লাখ কোটি টাকা। অথচ লোকসান গুনতে হয়েছে প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা। তবু ৭০ শতাংশ মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিন, ৬০ শতাংশ ঝুঁকিপূর্ণ কোচ আর ৬৩ শতাংশ ঝুঁকিপূর্ণ লাইন দিয়েই চলছে যাত্রী পরিবহন।
জানা গেছে, স্বাধীনতার সময় রেলবহরে ইঞ্জিন ছিল ৪৮৬টি, যা এখন কমে দাঁড়িয়েছে ২৬৩টিতে। আবার এগুলোর মধ্যে ৭০ শতাংশই মেয়াদোত্তীর্ণ। এমনকি মেরামতের জন্যও এসব লোকমোটিভের যন্ত্রাংশ পাওয়া যায় না। এতে প্রতি বছর বাড়ছে দুর্ঘটনা, কমছে ট্রেনের গতি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই নতুন ইঞ্জিন কেনা না হলে হুমকির মুখে পড়বে রেলব্যবস্থা। এসব স্বীকার করে রেল বলছে, সংকট কাটাতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী নিয়ে ঢাকা-দেওয়ানগঞ্জ চলাচল করে ভাওয়াল এক্সপ্রেস ট্রেন। যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছে দিতে ট্রেনটিতে ব্যবহার করা হয় ২ হাজার ৩০০ সিরিজের ১৪ নম্বর ইঞ্জিন। কানাডা থেকে ১৯৬৮ সালে কেনা হয় ইঞ্জিনটি, যার মেয়াদ পেরিয়ে গেছে ৩০-৩৫ বছর আগেই।
ইঞ্জিনের ভেতরের অবস্থা খুবই করুন। কোনো ইলেকট্রিক ডিভাইসই এখন কাজ করে না। চালকের তিনটি হ্যান্ডব্রেকের দুইটি বিকল। ইঞ্জিনের সেফটি ডিভাইস ডেডম্যান ফুট প্যাডেল দুটি বিকল। দুর্ঘটনার সময় ব্যবহার করা ইমার্জেন্সি ব্রেকই নাই মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিনটিতে।
ভাওয়াল এক্সপ্রেস ট্রেন। ছবি: সংগৃহীত
ইঞ্জিনের রেডিওলোজি সিস্টেমও বিকল হয়ে গেছে বহুদিন আগেই। যাত্রীদের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা চালকরা নিজের নিরাপত্তা নিয়েই শঙ্কিত।
এক চালক বলেন, ‘আমাদের নিজের জীবনেরই নিরাপত্তা নাই। কিন্তু চাকরি বাঁচাতে করতে হচ্ছে।’
কমলাপুরে দেখা যায় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে চলাচলকারী ২ হাজার ৫০০ সিরিজের ইঞ্জিন দিয়ে চলছে শান্টিংয়ের কাজ। এই ইঞ্জিনটির ব্রেক চাকার সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে বেড়া বাঁধার সাধারণ জিআই তার দিয়ে। এর ভেতরের অবস্থা খুবই নাজুক। অকার্যকর সব ইলেকট্রিক ডিভাইস, কাজ করে না ইমার্জেন্সি ব্রেক এমনটি পায়ের সেফটি ভিডাইসও।
কমলাপুর ওয়ার্কশপের কর্মীরা বলছেন, ‘দেশের ৭০ শতাংশ ইঞ্জিনের মেয়াদ পেরিয়ে গেছে বহু আগেই। এমনকি পুরানো ইঞ্জিন মেরামতের যন্ত্রাংশও পাওয়া যায় না এখন।’
ঝুঁকিপূর্ণ ইঞ্জিনের কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে মন্তব্য করে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত সংকট সমাধানের উদ্যোগ না নিলে হুমকির মুখে পড়বে রেল।
রেল বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘আমরা যদি দ্রুত ইঞ্জিনগুলো কেনার ব্যবস্থা না করি তাহলে আমাদের রেলের পুরো ব্যবস্থাপনাই খাঁদের কিনারায় চলে যাবে।’
তবে রেল কর্তৃপক্ষ বলছে, এ ব্যাপারে নেওয়া হয়েছে উদ্যোগ।
বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক সরদার সাহাদাত আলী বলেন, মিটারগেজে ৫০ লোকোমেটিভ আসবে চট্টগ্রামের দোহাজারিতে। ২০৩০ সালের মধ্যে রেলের সব সংকটই কেটে যাবে।
ইঞ্জিন সংকটের কারণে প্রতিনিয়ত শিডিউল বিপর্যয়ে বিপাকে পড়ছেন যাত্রীরা।
সূত্র বলছে, মৃতপ্রায় রেলকে উজ্জীবিত করতে গত দেড় দশকে খরচ করা হয়েছে দেড় লাখ কোটি টাকা। বেড়েছে রেল রুট, হয়েছে অবকাঠামোত মেগা উন্নয়ন। তবে এসবে কোনো প্রভাব পড়েনি যাত্রীসেবায় কিংবা অর্থনৈতিক উন্নয়নে।
এখনও অনলাইন কিংবা অফলাইনে টিকিটের জন্য হাহাকার লেগেই থাকে। প্রতিদিনই শিডিউল বিপর্যয়ে নাকাল যাত্রীরা। বিপুল বিনিয়োগের পরও কোনো কোনো রুটে কমেছে ট্রেনের গতি।
রেলের মেয়াদোত্তীর্ণ একটি ইঞ্জিন। ছবি: সংগৃহীত
চালকরা জানান, বেশির ভাগ ইঞ্জিন মেয়াদোর্ত্তীণ। এসব দিয়েই কাজ চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে। আরেকজন জানান, ময়মনসিংহের বেশ কিছু জায়গায় রেললাইন আছে, যেখানে ২০ থেকে ৫০ কিলোমিটার বেগে ট্রেন চালাতে হয়।
পনেরো বছর আগে রেলের গড় লোকসান ছিল প্রতিবছর হাজার কোটি টাকা, বিনিয়োগ বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়ে লোকসান ঠেকেছে দুই হাজার কোটি টাকায়।
বুয়েটের অধ্যাপক ও রেল বিশেষজ্ঞ ড. হাদিউজ্জামান বলেন, অপ্রয়োজনীয় উন্নয়নে বাড়ছে লোকসান। স্বাধীনতার পরও আমরা দেখেছি বাংলাদেশ রেলে যে নৈতিক শেয়ার যাত্রী এবং পণ্য পরিবহনে প্রায় ৪০ শতাংশ ছিল। সেটা কমতে কমতে ৫ শতাংশে ঠেকেছে। রেলের যদি কিছুটা আয় বাড়াতে হয় প্রথমে তাদের পণ্য পরিবহনে সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এটা ছাড়া কোনো বিকল্প আমি দেখছি না।
রেলওয়ে মহাপরিচালক আফজাল হোসেন জানান, পণ্য পরিবহনে নেওয়া হচ্ছে উদ্যোগ। বলেন, পণ্য পরিবহনে আমরা পিছিয়ে আছি। পণ্য পরিবহনে আমাদের কিছু ইঞ্জিন লাগবে। কিছু ওয়াগনও লাগবে, মূলত ৪ থেকে ৫ বছর সময় লাগবে এ কাজগুলো করতে।