
যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপ শেষ হচ্ছে শনিবার, ভবিষ্যৎ কী?
গাজায় যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপ শনিবার (১ মার্চ) শেষ হচ্ছে; দু’-তিন দিনের মধ্যে দ্বিতীয় পর্যায় শুরুর কথা। তবে সেই পর্বে প্রবেশে চার শর্ত জুড়ে দিয়েছে ইসরায়েল। যদি এই চার শর্ত পূরণ না হয়, সেক্ষেত্রে চুক্তির প্রস্তাবিত ২য় পর্যায় শুরুর ব্যাপারটি পুরোপুরি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে বলে জানিয়েছেন দেশটির জ্বালানিমন্ত্রী এবং যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এলি কোহেন।
মঙ্গলবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) ইসরায়েলি টিভি চ্যানেল কান-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এলি কোহেন বলেন, যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় পর্যায়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের ৪টি শর্ত রয়েছে— ক) ৭ অক্টোবর এবং তার আগে যেসব ইসরায়েলিকে গাজায় বন্দি করা হয়েছিল— তাদের সবাইকে মুক্তি দিতে হবে, খ) গাজা উপত্যকা নিয়ন্ত্রণকারী গোষ্ঠী হামাসকে গাজা থেকে বিদায় নিতে হবে, গ) গাজা উপত্যকাকে অবশ্যই সম্পূর্ণ অস্ত্রমুক্ত করতে হবে এবং ঘ) পুরো গাজা এলাকায় ইসরায়েলের নিরাপত্তা সংক্রান্ত নিয়ন্ত্রণ থাকবে। খবর আনাদুলু এজেন্সির।
জেরুজালেমে এক সংবাদ সম্মেলনে ইসরায়েলের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী শ্যারেন হাসকেল বলেন, আমরা সতর্কতার সঙ্গে এগোচ্ছি। তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো হবে কি না, জবাবে শ্যারেন হাসকেল বলেন, এ নিয়ে কোনো চুক্তি হয়নি, তবে আমরা যুদ্ধবিরতি চালিয়ে যাওয়ার বিকল্প পুরোপুরি বন্ধ করিনি, আমাদের জিম্মিদের অবশ্যই নিরাপদে ফেরত আসতে হবে।
ইসরায়েলের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী শ্যারেন হাসকেল। ছবি: সংগৃহীত
যদি শুক্রবারের (২৮ ফেব্রুয়ারি) মধ্যে কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো না যায়, তাহলে কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, হয় যুদ্ধ আবার শুরু হতে পারে, অথবা বর্তমান অবস্থা অপরিবর্তিত থাকতে পারে, যেখানে চলতে থাকবে কিন্তু জিম্মিরা মুক্তি পাবে না এবং ইসরায়েল গাজায় মানবিক সহায়তার প্রবেশ বন্ধ করে দিতে পারে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামলা চালিয়ে ইসরায়েলের সীমান্তে প্রবেশ করে ১ হাজার ২০০ জনকে হত্যা করে হামাস ও তার মিত্রগোষ্ঠী প্যালেস্টাইনিয়ান ইসলামিক জিহাদের যোদ্ধারা। সেই সঙ্গে ২৫১ জনকে জিম্মি হিসেবে ধরেও নিয়ে যায় তারা। বস্তুত ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর এর আগে কখনও ইসরায়েলে এত বড় আকারের হামলা ঘটেনি।
অতর্কিত সেই হামলার জবাব দিতে এবং জিম্মিদের উদ্ধার করতে গাজায় অভিযান শুরু করে ইসরায়েল। প্রায় ১৫ মাস ধরে অভিযান চলার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রবল চাপের মুখে গত ১৯ জানুয়ারি গাজায় যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করতে বাধ্য হয় ইসরায়েল।
গাজায় সংঘাত থামাতে ২০২৪ সালের ২৩ জুন একটি তিন স্তরের যুদ্ধবিরতি চুক্তি প্রস্তাব করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। ১৯ জানুয়ারি থেকে মূলত সেই চুক্তিটিরই বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে।
এই চুক্তির প্রথম পর্বের মেয়াদ ছিল ৬ সপ্তাহ। এ পর্বে ৩৩ জন জিম্মিকে মুক্তি দেবে হামাস, যেসব জিম্মিদের মুক্তি দেওয়া হবে এই পর্বে, তাদের মধ্যে বয়স্ক এবং নারীরা প্রাধান্য পাবেন।
এর বিনিময়ে গাজার জনবসতিপূর্ণ সব এলাকা থেকে সেনা প্রত্যাহার করে নেবে ইসরায়েল, বন্দি ফিলিস্তিনিদের মধ্যে শতাধিককে মুক্তি দেবে এবং এ ছয় সপ্তাহের প্রতিদিন গাজায় প্রবেশ করবে ত্রাণ পণ্যবাহী ৬০০টি ট্রাক।
দ্বিতীয় পর্যায়ে স্থায়ীভাবে সংঘাত শেষ হবে গাজায়। চুক্তির শর্ত অনুসারে, এ পর্যায়ে অবশিষ্ট জিম্মিদের মুক্তি দেবে হামাস এবং বিনিময়ে বিভিন্ন কারাগারে বন্দি ফিলিস্তিনিদের মধ্যে ১ হাজার জনকে মুক্তি দেবে ইসরায়েল এবং উপত্যকা থেকে ইসরায়েলি সেনাদের সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে।
আর তৃতীয় পর্যায়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকাকে পুনর্গঠনের কাজ শুরু হবে। তবে চুক্তিতে এ-ও উল্লেখ ছিল যে যতদিন দ্বিতীয় পর্যায় শুরু না হয়, ততদেন প্রথম পর্যায় অব্যাহত থাকবে।
এদিকে, ইসরায়েলি কারাগারে কমপক্ষে ৫৯ ফিলিস্তিনি বন্দি মারা গেছেন। ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর থেকে বিপুল সংখ্যক এই ফিলিস্তিনি ইসরায়েলি কারাগারে প্রাণ হারিয়েছেন। নিহত ফিলিস্তিনিদের বেশিরভাগই অবরুদ্ধা গাজা ভূখণ্ডের বাসিন্দা।
গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি কারাগারে ৫৯ ফিলিস্তিনি বন্দি মারা গেছেন। ছবি: সংগৃহীত
বার্তাসংস্থা আনাদোলু বলছে, ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি কারাগারে কমপক্ষে ৫৯ ফিলিস্তিনি বন্দি মারা গেছেন বলে বন্দিদের অধিকার বিষয়ক একটি গ্রুপ মঙ্গলবার জানিয়েছে।
প্যালেস্টানিয়ান প্রিজন সোসাইটি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে গাজা উপত্যকার ৩৮ জন বন্দি রয়েছেন। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে গাজার বন্দিদের মৃত্যুর তথ্য গোপন করার অভিযোগও করেছে সংস্থাটি।
বন্দি বিষয়ক কমিশন সোমবার জানিয়েছে, গাজার বন্দি মুসাব হানি হানিয়াহ ইসরায়েলি হেফাজতে মারা গেছেন। ৩৫ বছর বয়সী হানিয়াহকে দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর খান ইউনিস থেকে ২০২৪ সালের ৩ মার্চ আটক করেছিল ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। তার পরিবারের মতে, আটক হওয়ার আগে হানিয়াহ সুস্থ ছিলেন।
ফিলিস্তিনি পরিসংখ্যান অনুসারে, ১৯৬৭ সালে পশ্চিম তীর এবং গাজা দখলের পর থেকে ইসরায়েলি কারাগারে কমপক্ষে ২৯৬ ফিলিস্তিনি বন্দি মারা গেছেন। অন্তত ১০ হাজার ফিলিস্তিনি ইসরায়েলের কারাগারে বন্দি রয়েছে। এই পরিসংখ্যানে গাজা উপত্যকা থেকে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি যাদের সংখ্যা আনুমানিক হাজার হাজার।