মুমিনের রমজান প্রস্তুতি: করণীয় ও পরিকল্পনা

পবিত্র রমজানের আগমনের অপেক্ষায় এক অনন্য অনুভূতিতে দিন কাটাচ্ছে মুমিনের হৃদয়। ইবাদতের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে, প্রস্তুতির ধ্বনি বেজে উঠছে জীবনের প্রতিটি প্রান্তে। রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের রমজানের প্রস্তুতি নেওয়ার প্রতি গুরুত্ব দিতে বলেছেন এবং নিজেও এই বরকতময় মাসে অধিক ইবাদতের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করেছেন। এক জন মুমিনের রমজান কেমন হওয়া উচিত, তা নিয়ে নিচে আলোচনা করা হলো।

১. পূর্ব প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা

রমজানের আগে থেকেই একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা করা জরুরি। প্রয়োজনীয় কাজগুলো গুছিয়ে ফেলা, কায়িক পরিশ্রমের কাজ শেষ করা, এবং ইবাদতের সময় বের করা উচিত। ইফতার, সাহরি ও আমল পরিকল্পনার পাশাপাশি কোরআন ও ইসলামিক বই সংগ্রহ করা যেতে পারে। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো ভালো কাজের ইচ্ছা করে, অথচ এখনো তা বাস্তবায়ন করেনি, তার জন্যও সওয়াব লেখা হয়। আর যদি তা সম্পন্ন করে, তাহলে তাকে ১০ থেকে ৭০০ গুণ পর্যন্ত সওয়াব দেওয়া হয়। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৩৫)

২. দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ

এই রমজান যেন অতীতের যেকোনো রমজানের চেয়ে বেশি বরকতময় হয়, সে লক্ষ্যে নিজেকে প্রস্তুত করা প্রয়োজন। নামাজ, রোজা, দান-সদকা, ইসতেগফার ও কোরআন তেলাওয়াতের পরিকল্পনা করা উচিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। আর মানুষ তার নিয়ত অনুযায়ী প্রতিফল পাবে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১)

৩. বেশি বেশি দোয়া করা

আল্লাহ তার বান্দার দোয়া শুনেন ও কবুল করেন। রমজানের আগে থেকে আল্লাহর কাছে দোয়া করা উচিত— “হে আল্লাহ, আমাকে সুস্থ রাখুন, আমার জীবন রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দিন, এবং বরকতময় করে দিন।” আল্লাহ বলেন, “আমার বান্দারা যখন আমার ব্যাপারে আপনাকে জিজ্ঞাসা করে, বলুন, আমি কাছেই আছি। আমি দোয়া কবুল করি, যখনই কেউ আমাকে ডাকে।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৬)

৪. রমজানের শিক্ষা ও বিধান জানা

রমজানের ফজিলত সম্পর্কে জানা এবং আমল ও মাসায়েল শেখা গুরুত্বপূর্ণ। কোন কাজ করা উচিত এবং কোনটি বর্জনীয়, সে সম্পর্কে সচেতন হওয়া দরকার। বিশ্বস্ত আলেমদের থেকে মাসায়েল জেনে আমল করা উচিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে, যে কোরআন শেখে এবং অন্যকে শেখায়।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০২৭)

৫. নামাজে মনোযোগী হওয়া

অনেকেই ভাবেন, রমজানে এসে নামাজ শুরু করবেন, যা শয়তানের কুমন্ত্রণা ছাড়া কিছু নয়। এখন থেকেই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতের সঙ্গে পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা দরকার। আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই মুমিনরা সফল হয়েছে, যারা তাদের নামাজে বিনম্রতা অবলম্বন করে এবং অনর্থক বিষয় থেকে দূরে থাকে।” (সুরা মুমিন, আয়াত: ১-৩)

৬. গুনাহ ও খারাপ অভ্যাস পরিত্যাগ

রমজানের বরকত লাভের জন্য এখন থেকেই গুনাহ ও খারাপ অভ্যাস বর্জন করা প্রয়োজন। পাপাচার ও অপবিত্রতা নিয়ে রমজানে প্রবেশ করলে এর পূর্ণ ফজিলত পাওয়া যাবে না। আল্লাহ বলেন, তোমরা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য গুনাহ পরিত্যাগ করো। যারা গুনাহ করে, তারা শিগগিরই তার প্রতিফল পাবে। (সুরা আনআম, আয়াত: ১২০)

৭. কোরআন তেলাওয়াত করা

রমজানের প্রস্তুতি হিসেবে এখন থেকেই কোরআন তেলাওয়াতের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। যারা নিয়মিত পড়েন না, তারা শিখে নেওয়ার চেষ্টা করুন। যারা পড়েন, তারা বেশি বেশি খতম দেওয়ার পরিকল্পনা করুন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি কোরআন পড়ে, তার দৃষ্টান্ত সুগন্ধিযুক্ত লেবুর মতো। আর যে ব্যক্তি পড়ে না, তার দৃষ্টান্ত সুগন্ধহীন খেজুরের মতো। (বুখারি, হাদিস: ৫০২০)

৮. আল্লাহর পথে মানুষকে আহ্বান

রমজান সম্পর্কে পরিবার, বন্ধু-বান্ধব ও প্রতিবেশীদের সচেতন করা উচিত। রমজানের ফজিলত ও করণীয় বিষয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। সম্ভব হলে মসজিদে ইসলামী আলোচনা বা সেমিনারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। আল্লাহ বলেন, তার চেয়ে উত্তম কথা আর কার হতে পারে, যে আল্লাহর পথে আহ্বান জানায় এবং সৎকাজ করে? (সুরা হামিম সাজদা, আয়াত: ৩১)

৯. দান-সদকা করা

রমজানের অন্যতম বিশেষ আমল হলো দান-সদকা। গরিব-দুঃখীদের সহায়তা করা, ইফতার-সাহরির ব্যবস্থা করা এবং অভাবীদের দিকে সহানুভূতির হাত বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ। রসুলুল্লাহ সা. বলেছেন,

আল্লাহ বলেন, হে আদম সন্তান, দান করো, আমিও তোমাদের জন্য ব্যয় করব। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২১৯৮)

রমজানকে স্বাগত জানাতে এই প্রস্তুতিগুলো নেওয়া গেলে, মুমিনের জন্য এটি হবে এক অনন্য, বরকতময় ও আত্মশুদ্ধির মাস। আল্লাহ আমাদের সকলকে রমজানের যথাযথ প্রস্তুতি গ্রহণের তাওফিক দান করুন। আমিন

জুমার দিন সাপ্তাহিক ঈদের দিন। মুসলমানরা এ দিনে একত্র হয় মসজিদে। এ সময় তাদের মাঝে পরস্পর মতবিনিময় হয় এবং তৈরি হয় সেতুবন্ধন । এদিন মুসলামানদের জন্য বিশেষ সুযোগ। এদিন ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য অর্জন করতে পারেন তারা। এ দিনের শ্রেষ্ঠত্ব ও মাহাত্ম মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে অনেক।

কোরআন-হাদিসে শুক্রবার শ্রেষ্ঠত্ব হওয়ার কথা পাওয়া যায়, হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, সূর্য যে সব দিন উদিত হয় অর্থাৎ দিনসমূহের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম দিন হল জুমার দিন। এই দিন আদম আলাইহিসসালামকে সৃষ্টি করা হয়েছে। এই দিন তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে। এ দিনই তাকে জান্নাত থেকে বের করা হয়েছে। কিয়ামতও সংঘটিত হবে এ দিনেই। (সহিহ মুসলিম, হাদিস:৮৫৪-মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ৯৪০৯)

এমনকি জুমার দিনের প্রতি মুহূর্তেরই আলাদা শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে। এদিনের আছরের পর কেউ যদি আল্লাহ তায়ালার কাছে দোয়া করে আল্লাহ তায়ালা তার দোয়া কবুল করে নেন। হাদিসে এসেছে, জুমার দিনে ১২টি সময় রয়েছে, এ সময়ে কেউ আল্লাহ তায়ালার কাছে কোনো কিছু কামনা করলে আল্লাহ তায়ালা তাকে সেটা দান করেন। সুতরাং আছরের পর তোমরা সে সময়টি তালাশ করো। (আবু দাউদ, হাদিস:১০৪৮)

এছাড়া জুমার দিনে আসরের নামাজের পর ৮০ বার নিচের দোয়াটি পড়লে আল্লাহ তায়ালা তার জীবনের ৮০ বছরের গুনাহ মাফ করে দেন।

আরবি উচ্চারণ: اَللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ النَّبِيِّ الْأُمِّيِّ وَعَلَى آلِهِ وَسَلِّم تَسْلِيْمَا বাংলা উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিনিন নাবিয়্যিল উম্মিয়্যি ওয়া আলা আলিহি ওয়াসাল্লিম তাসলিমা।

এখান থেকে অনেকে আপত্তি করে থাকেন যে, ৮০ বছর যাদের হয় নাই তাদের কী হবে,বর্তমানে ৮০ বছরের মানুষ পাওয়া-তো খুবই দুষ্কর ও দুর্লভ?

এ আপত্তির নিরসনে হাদিস বিশারদরা বলেন, ৮০ বছর না পেলেও আল্লাহ তায়ালা তার জীবনের অন্যান্য গুনাহ মাফ করে দেবেন। আর যদি কারও গুনাহ-ই না থাকে তাহলে আল্লাহ তাআলা তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেবেন। তারা এ-ও বলেন যে, এখানে গুনাহ দ্বারা ছগিরা তথা ছোট গুনাহ উদ্দেশ্য।

এক হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জুমার দিন সম্পর্কে আলোচনা করেন এবং বলেন, এ দিনে এমন একটি মুহূর্ত রয়েছে, যে কোনো মুসলিম বান্দা যদি এ সময় নামজে দাঁড়িয়ে আল্লাহর নিকট কিছু প্রার্থনা করে, তবে তিনি তাকে অবশ্যই তা দিয়ে থাকেন এবং তিনি হাত দিয়ে ইঙ্গিত করে বুঝিয়ে দিলেন যে, সে মুহূর্তটি খুবই সংক্ষিপ্ত। (বোখারি শরিফ, হাদিস :৯৩৫)

এ হাদিসে কোন সময় উদ্দেশ্য-এ নিয়ে মুহাদ্দিসরা বিভিন্ন ব্যাখ্যা করে থাকেন। কেউ বলেন, খতিব সাহেব মিম্বরে বসার পর থেকে নামাজ শেষ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত। কেউ বলেন, আসরের পর থেকে মাগরিবের পূর্ব পর্যন্ত। এ মতটিই অধিক সঠিকতার নিকটবর্তী। (ফতহুল বারি খন্ড:২, পৃষ্ঠা :৪৮২-৪৮৩

 

You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.