গাজায় নির্বিচার শিশু হত্যা: সালমাহর ঈদ আসবে না, হুরও আর হাঁটতে শিখবে না
কয়েক দিন পরেই প্রথম জন্মদিন ছিল ফুটফুটে শিশু বানান আল–সালোউতের। আরেক শিশু হুর আল–সালোউতের বয়স এক বছর হয়েছে। কবে সে গুটি গুটি পায়ে হাঁটা শুরু করবে, সে অপেক্ষায় ছিলেন মা-বাবা। আর ঈদ কবে আসবে, কী কেনাকাটা করবে—তা নিয়ে ছোট্ট সালমাহ এসলিয়েহ যেন আরও চঞ্চল হয়ে উঠেছিল।
কিন্তু সালমাহের ঈদ আর আসবে না। হুর আল–সালোউতের প্রথম হাঁটা, আধো আধো বুলিতে কথা শোনার অপেক্ষা শেষ হবে না কোনো দিন। ইসরায়েলের নির্মম হামলা মা-বাবার কোল থেকে কেড়ে নিয়েছে ফিলিস্তিনের গাজার এই শিশুদের। শুধু এই তিনজন নয়, ১৭ মাস ধরে চলা ইসরায়েলের নির্বিচার হামলায় ফিলিস্তিনের উপত্যকাটিতে প্রাণ হারিয়েছে প্রায় ১৮ হাজার শিশু।
শুক্রবার (২১ মার্চ) কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার লাইভে এসব তথ্য জানানো হয়।
গাজায় গত ১৯ জানুয়ারি শুরু হয়েছিল যুদ্ধবিরতি। এরপর সেখানকার শিশুদের দুর্দশা কিছুটা কমেছিল। তবে গত মঙ্গলবার ভোররাতে (সাহ্রির আগে) গাজায় আবার নৃশংস হামলা শুরু করে ইসরায়েল। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, এই হামলায় বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত ৫৯১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে শিশু ২০০। যদিও বার্তা সংস্থা এএফপি প্রথম দুই দিনে ৯৭০ জনের নিহত হওয়ার খবর জানিয়েছিল।
গাজায় ইসরায়েলের নতুন করে এই হামলাকে ‘বর্বর ও বেআইনি’ বলেছে জাতিসংঘের ফিলিস্তিন মিশন।
নতুন করে হামলা শুরু করার পর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মঙ্গলবার বলেছিলেন, গাজায় নৃশংসতা ‘কেবল শুরু’ হয়েছে। বাস্তবেও তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। বিগত তিন দিনে নিহতের পাশাপাশি আহত ফিলিস্তিনিদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪২ জন। সব আহত ব্যক্তিকে সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে গাজায় এখনো টিকে থাকা হাসপাতালগুলো। অনেকেই মারা যাচ্ছেন চিকিৎসার অভাবে।
গাজায় হাসপাতালগুলোর দুর্দশার এমনই এক চিত্র দেখা গেছে উপত্যাকটির উত্তরে ইন্দোনেশিয়ান হাসপাতালে। গতকাল হাসপাতালের পরিচালক মারওয়ান আল-সুলতান আল-জাজিরাকে বলেন, সেখানে ওষুধ, অক্সিজেন, জ্বালানি ও অন্যান্য জরুরি পণ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বুধবার রাতে হাসপাতালটিতে আহত ৮২ জনকে আনা হয়। এ ছাড়া মৃত অবস্থায় আনা হয় ৪৩ জনকে। তবে ভেন্টিলেটরসহ জীবন বাঁচানোর জন্য জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জামের বেশির ভাগই নষ্ট। সেগুলো ব্যবহারের উপায় নেই।
গাজায় ইসরায়েলের নতুন করে এই হামলাকে ‘বর্বর ও বেআইনি’ বলেছে জাতিসংঘের ফিলিস্তিন মিশন। গতকাল এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, নতুন করে ইসরায়েলের এই হামলা বন্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জরুরিভাবে পদক্ষেপ নিতে হবে। ইসরায়েলের যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও জাতিগত নিধনের বিরুদ্ধে ‘পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থতা’ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের গ্রহণযোগ্যতা যেটুকু আছে, তা-ও ক্ষুণ্ন করবে।
কনভারসেশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামলা শুরুর পর থেকে গাজায় আনুমানিক ৮৫ হাজার টন বোমা ফেলা হয়েছে। এতে সরাসরি আঘাত পেয়ে, ভবনের ধ্বংসাবশেষের নিচে চাপা পড়ে, আগুন লেগে এবং বিষাক্ত গ্যাস নিশ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করে ফিলিস্তিনিদের মৃত্যু হয়েছে।
নাসের হাসপাতালের স্বেচ্ছাসেবক চিকিৎসক মরগান ম্যাকমোনাগলের সঙ্গে কথা হয় বিবিসির। মঙ্গলবার হামলার শুরু থেকে পরদিন মধ্যরাত পর্যন্ত টানা কাজ করেছেন তিনি। ম্যাকমোনাগলের হিসাবে, এই সময়টাতে হাসপাতালে যত হতাহত ফিলিস্তিনি এসেছেন, তাদের মধ্যে আনুমানিক ৪০ শতাংশই শিশু।
গাজায় এভাবে শিশু হত্যা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সরব হয়েছেন জাতিসংঘের কর্মকর্তারা। গত জানুয়ারিতে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার এক সপ্তাহ পর জাতিসংঘের মানবাধিকার-প্রধান টম ফ্লেচার নিরাপত্তা পরিষদে বলেছিলেন, গাজায় একটি প্রজন্ম মানসিক আঘাতে জর্জরিত হয়ে পড়েছে। শিশুদের হত্যা করা হয়েছে। তাদের অনেকে অনাহারে কিংবা ঠান্ডায় জমে মারা গেছে। কিছু শিশু প্রথম শ্বাস নেওয়ার আগেই মারা গেছে।
জাতিসংঘের শিশু তহবিল–ইউনিসেফ জানায়, উত্তর গাজার দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের ৩১ শতাংশ তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে। সেখানে অপুষ্টির কারণে শিশুমৃত্যু ব্যাপকভাবে বেড়েছে।
অপুষ্টিতে ভুগছে শিশুরা: গাজায় ইসরায়েলের হামলা শুরু হয় ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস ইসরায়েলের ভূখণ্ডে ঢুকে হামলা চালানোর পর শুরু হয় ইসরায়েলিদের হত্যাযজ্ঞ। সেদিন থেকে উপত্যকাটিতে ইসরায়েলের হামলায় অন্তত ৪৯ হাজার ৬১৭ জন নিহত হয়েছেন। তাঁদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু। অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য কনভারসেশনের তথ্যমতে, শিশুদের বেশির ভাগই নিহত হয়েছে ইসরায়েলের সরাসরি হামলায়।
কনভারসেশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামলা শুরুর পর থেকে গাজায় আনুমানিক ৮৫ হাজার টন বোমা ফেলা হয়েছে। এতে সরাসরি আঘাত পেয়ে, ভবনের ধ্বংসাবশেষের নিচে চাপা পড়ে, আগুন লেগে এবং বিষাক্ত গ্যাস নিশ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করে ফিলিস্তিনিদের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, ড্রোন হামলা ও স্নাইপারের গুলিতে শিশুদের নিহত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
১৯ জানুয়ারি যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর ২ মার্চ থেকে গাজায় ত্রাণ সরবরাহের পথ বন্ধ করে দেয় ইসরায়েল। এরপর ১৫ মার্চ এক প্রতিবেদনে জাতিসংঘের শিশু তহবিল–ইউনিসেফ জানায়, উত্তর গাজার দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের ৩১ শতাংশ তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে। সেখানে অপুষ্টির কারণে শিশুমৃত্যু ব্যাপকভাবে বেড়েছে।

এ ছাড়া ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া গাজায় ব্যাপক হারে সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী ফ্রন্টিয়ার্স-এর গত বছরের এপ্রিলের তথ্য অনুযায়ী, গাজার ৯০ শতাংশের বেশি শিশু সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়েছে। শিশুমৃত্যুর আরেকটি বড় কারণ, শীতের মধ্যে ফিলিস্তিনিদের বারবার বাস্তুচ্যুত হওয়ার ফলে শিশুদের ওপর যে মারাত্মক মানসিক আঘাত নেমে এসেছে।
গাজায় শিশুদের প্রাণহানি নিয়ে জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনডব্লিউআরএর প্রধান ফিলিপ লাজারিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেছিলেন, এই যুদ্ধটা শিশুদের বিরুদ্ধে। এই যুদ্ধটা তাদের শৈশব ও ভবিষ্যতের বিরুদ্ধে।