কেরু মিলে অটোমোশন চালু হয়নি এক যুগেও, লোকসানের মুখে কৃষক

ভারতীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করায় জটিলতা দীর্ঘ হচ্ছে চুয়াডাঙ্গার দর্শনায় কেরু অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের চিনি কলে। ১০২ কোটি ২১ লাখ টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পটিতে এক যুগেও শেষ হয়নি আখ মাড়াই ও চিনি উৎপাদনে অটোমোশনের কাজ। এতে চিনি উৎপাদন হ্রাস ও কৃষকরা লোকসানের মুখে পড়ছেন।

অনেকেই মুড়ি আখ নষ্ট করে ফেলছেন, আগামী মাড়াই মৌসুমে আখের সংকট দেখা দিতে পারে। তাই কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে মাড়াই কার্যক্রম শেষ করতে ব্রিটিশ আমলের ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ফিরছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারণে বারবার অটোমোশন পদ্ধতিতে চিনি কলটি চালুতে ব্যর্থ হচ্ছে। মিলটি আখ মাড়াই করে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা লোকসানের মুখে পড়ছে।

১৯৩৮ সালে চুয়াডাঙ্গার দর্শনায় কেরু অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড গড়ে ওঠে। রবার্ট কেরু নামের ব্রিটিশ নাগরিকের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করা হয় মিলটি। দেশ স্বাধীনের পর বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন মিলটি পরিচালনা করছে। চিনি উৎপাদনে মিলটি প্রতি অর্থ বছরে কোটি কোটি টাকা লোকসানের মুখে পড়ছে। এ বছর লোকসান আরও বেড়ে যাবে কর্তৃপক্ষের গাফলতির কারণে। নিজেদের ভালো বুঝলেও, কেউই মিলের ভালো বুঝতে নারাজ। ডিস্টিলারির মুনাফা দিয়ে চিনি কলের লোকসান সমন্বয় করা হয়।

লোকসান হ্রাস, চিনির আহরণ ও মোলাসেস বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন দর্শনা কেরু অ্যান্ড কোম্পানি আধুনিকায়নের কাজ শুরু হয় ২০১২ সালে। নির্ধারিত সময়ের আগেই ২০২৪ সালের শেষের দিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ কাজ শেষ করে বুঝিয়ে দেয়ার কথা থাকলেও তা সম্ভব হয়নি। ফলে অটোমোশন পদ্ধতিতে মাড়াই ও চিনি উৎপাদন সম্ভব হয়নি। এক যুগ ধরে যন্ত্রপাতি ও মেশিন খোলা আকাশ, বাক্স বন্দি এবং যত্রতত্র পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে, মরিচা ধরছে। শত কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।

প্রতি বছর ডিসেম্বর মাসের শুরুতেই মিলটি মাড়াই কার্যক্রম চালু হয় আনুষ্ঠানিকভাবে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের পর ২০ দিন পিছিয়ে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে মাড়াই শুরু হয় ২০২৪ সালের ২০ ডিসেম্বর। কারণ অটোমোশন পদ্ধতিতে মিলটি চালুর জন্য উপযুক্ত হয়নি। ২০২৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ম্যানুয়ালে উৎপাদন বন্ধ করে অটোমোশন চালুর সিদ্ধান্ত নেয় মিল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু আবার মুখ থুবড়ে পড়ে অটোমোশন পদ্ধতি। ১৫ দিন বন্ধ থাকার পর ২৫ ফেব্রুয়ারি পুরনো সিস্টেমে ফিরতে হয় মাড়াই মৌসুম শেষ করতে। মাড়াই বন্ধ থাকায় আখ শুকিয়ে লোকসানের মুখে পড়েছে কৃষকরা। চিনি আহরণ হ্রাস পাচ্ছে।

চলতি মৌসুমে (৯ ফেব্রুয়ারি) ৬০ হাজার ৪৩৮ মেট্রিক টন আখ মাড়াই করে চিনি উৎপাদন হয় ৩১২৮ মেট্রিক টন। ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে ৫৬ হাজার ৪১৩ মেট্রিক টন আখ মাড়াই করে ২ হাজার ৬০৮ মেট্রিক টন চিনি উৎপাদন হয়। ১০২ কোটি ২১ লাখ ব্যয়ে কেরু চিনি মিলের অটোমেশন কাজ বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টারি লিমিটেড। এ পদ্ধতিতে দৈনিক ১৫০০ মেট্রিক টন আখ মাড়াই সম্ভব। আর ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ১১৫০ মেট্রিক টন আখ মাড়াই করা সম্ভব হচ্ছে প্রতিদিন।

২০ ডিসেম্বর ২০২৪ সালে কেরু অ্যান্ড কোম্পানির ডিস্টিলারি বিভাগ অটোমোশন পদ্ধতিতে মদ উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করতে পারলেও আখ মাড়াই ও চিনি উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না নানা জটিলতা থাকায়। কক্সবাজার ও কুয়াকাটায় নতুন দুটি মদের বিক্রয় কেন্দ্র অল্প দিনে চালু হয়েছে। দেশে কেরুর ১৩টি ওয়্যারহাউস ও ৩টি বিক্রয় কেন্দ্র রয়েছে।

স্থানীয় আখ চাষিরা জানান, মিল চালু ও বন্ধ নিয়ে কর্তৃপক্ষ শুরু থেকেই লুকোচুরি করছে। যার দায় আমাদের নিতে হচ্ছে। কারণ আখ জমিতে রাখলে শুকিয়ে ওজন কমে যায়। বড় সমস্যা হচ্ছে আখ কাটার পর ওই জমিতে ধান, ভুট্টা, সবজিসহ অন্য ফসল চাষের জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকি। কিন্তু এবার সম্ভব হচ্ছে না। কেরু মিল কর্তৃপক্ষের কারণে লোকসানের মুখে পড়েছি। আখ চাষ করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে আমাদের পক্ষে। এ বছর থেকে আখ চাষ বাদ দিয়ে অন্য ফসল চাষ করবো। যাদের গাফলতি আছে তাদের বিরুদ্ধে সরকার ব্যবস্থা নেবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা। আধুনিকায়ন সম্ভব হলে কৃষক ও মিল বেঁচে থাকবে দীর্ঘ দিন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কেরু মিলে কর্মরত অনেকে অভিযোগ করে জানান, বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিলে যোগদানের পর কেরু জৌলুস হারাতে বসেছে। তিনি অফিসে একবার ঢুকলে আর চেয়ার থেকে ওঠেন না। মিলের ভালো-মন্দ নিয়ে কোনো চিন্তা ভাবনা নেই। এর আগে যেখানেই দায়িত্ব পালন করেছেন সেখানেই নাজুক অবস্থা তৈরি হয়েছে। ডিস্টিলারি বিভাগের উৎপাদনও হ্রাস পাচ্ছে। মিল ক্যাম্পাসে ককটেল উদ্ধার হচ্ছে। সবাই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। প্রশাসনিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। কৃষকরা চরম হতাশ হয়েছে মিল বন্ধ ও মাড়াই দেরিতে শুরু হওয়ায়।

কেরু অ্যান্ড কোম্পানির শ্রমিক ইউনিয়‌নের সভাপতি ফিরোজ আহমেদ সবুজ বলেন, ‘অটোমোশন পদ্ধতিতে মিল চালু করা সম্ভব হলে ভালো হতো। কৃষকরা ক্ষব্ধ। তারা আখ ও মুড়ি আখ ভেঙে ফেলছে। আখ চাষ আবার নতুন করে ফিরিয়ে আনতে হলে ২-৩ বছর সময় লেগে যাবে। হেড অফিসসহ এখানকার ম্যানেজমেন্ট ব্যর্থ। মিল দেরিতে চালু, আবার বন্ধ করে দিয়ে পুনরায় চালুর বিষয়টি কৃষকসহ মিলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা ভালোভাবে নিতে পারছেন না।’

ফিরোজ আহমেদ আরও বলেন, ‘কৃষকদের কাছে সবাই তোপের মুখে পড়ছে। যন্ত্রপাতি দেখে নেয়া উচিত ছিল করপোরেশনের। কিন্তু তারা পারেনি। দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিত। যার কারণে ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে সবাইকে। তা ছাড়া শত কোটি টাকার যন্ত্রপাতি পড়ে থেকে নষ্ট হওয়াটাই তো স্বাভাবিক।’

কেরু অ্যান্ড কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাব্বিক হাসান বলেন, ‘আমার প্রজেক্ট নয়। কাজ শেষ হয়ে যখন দুই বছর চলবে তারপর আমাদের হবে। এই মন্তব্য করে তিনি অফিসের গাড়িতে চড়ে দ্রুত অফিস ত্যাগ করেন।’

প্রতিবেদক বক্তব্য নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করার কথা বললে তিনি জানান, দেরি হবে আজ আর অফিসে ফিরবো না।

You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.