পবিত্র কোরআনের দৃষ্টিতে কৃষিকাজ

  • নিউজ ডেস্ক

    প্রকাশ :- ২০২৬-০৬-২৩, | ১৩:৩২:৩৯ |

কৃষিকাজ অন্যতম শ্রেষ্ঠ পেশা। এটি আল্লাহর অসংখ্য নিদর্শনের একটি এবং মানুষের অন্তরে ঈমান সুদৃঢ় করার একটি মাধ্যম। এটি মহান আল্লাহর একত্ববাদের সুস্পষ্ট প্রমাণ।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা কি ভেবে দেখেছ, তোমরা যে বীজ বপন করো? তোমরাই কি তা উত্পন্ন করো, নাকি আমরাই উত্পন্নকারী?’ (সুরা আল-ওয়াকিয়া, আয়াত : ৬৩-৬৪)

কৃষিজগতের বিভিন্ন বৈচিত্র্য আল্লাহর কুদরতের এক মহান নিদর্শন। কোনোটি শস্য, কোনোটি ফল, কোনোটি ফুল, কোনোটি ঘাস, কোনোটি ফলমূল, কোনোটি শাকসবজি; কোনোটি লতানো, কোনোটি আবার মাচাবিহীন্তসবই আল্লাহর সৃষ্টির বিস্ময়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অতএব মানুষ যেন তার খাদ্যের প্রতি দৃষ্টি দেয়। আমিই প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করেছি, অতঃপর আমি জমিনকে যথাযথভাবে বিদীর্ণ করেছি। তারপর তাতে উত্পন্ন করেছি শস্য, আঙুর, শাক-সবজি, জলপাই, খেজুর, ঘন বৃক্ষরাজির উদ্যান, ফলমূল ও ঘাস—তোমাদের ও তোমাদের পশুদের ভোগের জন্য।’ (সুরা আবাসা, আয়াত : ২৪-৩২)

কৃষকের কাজ আল্লাহর কুদরতের প্রমাণ : কৃষক মাটিতে একটি বীজ বপন করে, আল্লাহর দেওয়া পানি দিয়ে তা সেচ দেয়, আল্লাহর তৈরি জমি প্রস্তুত করে এবং আল্লাহর দেওয়া যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে। এরপর সে অপেক্ষা করে—এই বীজ থেকে কী বের হয়। কিন্তু কে সেই বীজকে বিদীর্ণ করে অঙ্কুর বের করেন? কে মাটিকে ভেদ করে ফসল বের করেন? আল্লাহ ছাড়া আর কে?

ফসল দুনিয়ার ক্ষণস্থায়িত্বের জীবন্ত উদাহরণ : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘পার্থিব জীবনের দৃষ্টান্ত হলো এমন—যেমন আমি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করি, ফলে তার দ্বারা জমিনের উদ্ভিদ মানুষের ও পশুর খাদ্যের সঙ্গে মিশে যায়। অবশেষে যখন জমিন তার সৌন্দর্য ধারণ করে এবং সুশোভিত হয়, আর তার অধিবাসীরা মনে করে যে তারা এর ওপর পূর্ণ ক্ষমতাবান, তখন আমার আদেশ রাত বা দিনে এসে পড়ে। অতঃপর আমি তাকে এমনভাবে কেটে ফেলি যেন গতকাল এখানে কিছুই ছিল না। এভাবেই আমি চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শনগুলো বিস্তারিত বর্ণনা করি।’ (সুরা ইউনুস, আয়াত : ২৪)

এই উদাহরণের মাধ্যমে আল্লাহ মানুষকে বুঝিয়েছেন—মানুষও প্রথমে দুর্বল অবস্থায় জন্মগ্রহণ করে, এরপর যৌবনে শক্তিশালী হয় এবং মনে করে সে দীর্ঘকাল বেঁচে থাকবে ও সবকিছু করতে পারবে। তারপর বার্ধক্য আসে, শক্তি কমে যায়, অবশেষে তার জীবনও সেই ফসলের মতো হয়ে যায় যা প্রথমে সবুজ ছিল, পরে শুকিয়ে কেটে ফেলা হয়।

ফসল, উত্তম কথা ও দান : কথার সঙ্গে ফসলের এবং আল্লাহর পথে ব্যয়ের সঙ্গে ফসলের গভীর মিল রয়েছে।

আল্লাহ তাআলা উত্তম ও মন্দ কথার উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘তুমি কি দেখনি, আল্লাহ কীভাবে দৃষ্টান্ত দিয়েছেন? উত্তম বাক্য হলো উত্তম বৃক্ষের মতো—যার মূল সুদৃঢ় এবং যার শাখা আকাশে। সে তার রবের অনুমতিতে সর্বদা ফল দান করে। আর মন্দ বাক্যের দৃষ্টান্ত হলো মন্দ বৃক্ষের মতো, যা জমিনের ওপর থেকে উপড়ে ফেলা হয়েছে, যার কোনো স্থায়িত্ব নেই।’ (সুরা ইবরাহিম, আয়াত : ২৪-২৬)

অতএব, উত্তম কথা ও সত্কর্মের সঙ্গে ফসলের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

কৃষিকাজ ও আল্লাহর ইবাদতের সম্পর্ক

১. উদ্ভিদ আল্লাহর তাসবিহ পাঠ করে : আল্লাহ বলেন, ‘সাত আসমান, জমিন এবং এতে যা কিছু আছে সবই তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করে। এমন কোনো বস্তু নেই যা তাঁর প্রশংসাসহ তাসবিহ করে না; কিন্তু তোমরা তাদের তাসবিহ বুঝতে পারো না।’ (সুরা আল-ইসরা/বনি ইসরাইল, আয়াত : ৪৪)

২. উদ্ভিদ আল্লাহর সামনে সিজদা করে : আল্লাহ বলেন, ‘আর তৃণলতা ও বৃক্ষ উভয়েই সিজদা করে।’ (সুরা আর-রহমান, আয়াত : ৬)

৩. ফসলের মধ্যে জাকাত আছে : আল্লাহ বলেন, ‘আর ফসল কাটার দিন তার হক (জাকাত) প্রদান করো।’
(সুরা আল-আনআম, আয়াত : ১৪১)

কৃষিকাজ ও হজের সম্পর্ক : হজের সময় মক্কার পবিত্র এলাকার উদ্ভিদ ও গাছপালা নষ্ট করা নিষিদ্ধ।

রাসুুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ মক্কাকে হারাম (পবিত্র) করেছেন। আমার আগে বা আমার পরে কারো জন্য এটি বৈধ নয়। আমার জন্যও দিনের কিছু সময়ের জন্য বৈধ করা হয়েছিল। এর ঘাস কাটা যাবে না, গাছ কাটা যাবে না, শিকার তাড়ানো যাবে না...।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৮৩৩)

কৃষিকাজ একটি নৈতিক শিক্ষালয়। কৃষি মানুষকে বহু উত্তম চরিত্র শিক্ষা দেয়।
১. আমানতদারি : কৃষকের হাতে মানুষের জীবনধারণের একটি বড় আমানত রয়েছে। এই আমানত সঠিকভাবে রক্ষা করা জরুরি। ইউসুফ (আ.) মিসরের রাজার স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছিলেন— ‘তোমরা সাত বছর ধারাবাহিকভাবে চাষ করবে। অতঃপর যা কাটবে তা শীষের মধ্যে রেখে দেবে, সামান্য যা খাবে তা ছাড়া। এরপর আসবে সাতটি কঠিন বছর, যা তোমাদের সঞ্চিত সব খেয়ে ফেলবে...।’ (সুরা ইউসুফ, আয়াত : ৪৭-৪৯)

তাঁদের এই পরামর্শ অনুসরণের কারণে আল্লাহর ইচ্ছায় তারা দুর্ভিক্ষ থেকে রক্ষা পেয়েছিল।

২. বিপদগ্রস্তকে সাহায্য করা : ইউনুস (আ.) মাছের পেট থেকে বের হওয়ার পর আল্লাহ তাঁর জন্য ইয়াকতিন গাছ উত্পন্ন করেছিলেন, যা তাঁর দুর্বলতা দূর করেছিল। আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর আমি তাকে তীরে নিক্ষেপ করলাম, তখন সে ছিল অসুস্থ। আর আমি তার ওপর একটি ইয়াকতিন গাছ উত্পন্ন করলাম।”
(সুরা আস-সাফফাত, আয়াত : ১৪৫-১৪৬)

এভাবেই মরিয়ম (আ.)-এর জন্য খেজুরের ব্যবস্থা করা হয়েছিল—
‘আর তুমি খেজুর গাছের কাণ্ড তোমার দিকে নাড়াও, তা তোমার ওপর পাকা তাজা খেজুর ফেলবে।’ (সুরা মারইয়াম, আয়াত : ২৫)

৩. আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা : কৃষক প্রতিদিন নিজের চোখের সামনে আল্লাহর নিয়ামত দেখতে পায়। তাই তার উচিত আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা। দুই বাগানের মালিকের ঘটনা আমাদের শিক্ষা দেয়—সে আল্লাহর নিয়ামত অস্বীকার করেছিল। তার মুমিন বন্ধু তাকে বলেছিল—‘তুমি যখন তোমার বাগানে প্রবেশ করলে তখন কেন বললে না—মাশাআল্লাহ, আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কোনো শক্তি নেই?’ (সুরা আল-কাহফ, আয়াত : ৩৯)

কিন্তু সে শিক্ষা গ্রহণ করেনি। ফলে তার বাগান ধ্বংস হয়ে যায়।

উপসংহার

কৃষকদের জন্য এর চেয়ে বড় সম্মান আর কী হতে পারে যে মহান আল্লাহ তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি রাসুলুল্লাহ (সা.) এবং তাঁর সাহাবিদের উদাহরণ দিয়েছেন ফসলের মাধ্যমে। আল্লাহ বলেন, ‘মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল এবং তাঁর সঙ্গীরা কাফিরদের প্রতি কঠোর, নিজেদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি দয়ালু। তুমি তাদের দেখবে তারা রুকু ও সিজদায় অবনত, তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনা করে। তাওরাত ও ইনজিলে তাদের দৃষ্টান্ত হলো এমন একটি চারাগাছের মতো, যা প্রথমে কুঁড়ি বের করে, পরে তাকে শক্তিশালী করে, তারপর তা মোটা ও দৃঢ় হয় এবং নিজের কাণ্ডের ওপর দাঁড়িয়ে যায়—যা কৃষকদের আনন্দ দেয়।’ (সুরা আল-ফাতহ, আয়াত : ২৯)

অতএব, কৃষিকাজ শুধু জীবিকার মাধ্যম নয়; বরং এটি আল্লাহর নিদর্শন, ইবাদতের একটি ক্ষেত্র এবং মানবতার সেবার এক মহান পথ।

শেয়ার করুন



এ জাতীয় আরো খবর..