✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-১০-২১, | ১৫:১১:৪৯ |আগাম ফুলকপি চাষে লাভের আশায় ব্যস্ত সময় পার করছেন মানিকগঞ্জের কৃষকেরা। অনুকূল আবহাওয়ায় এবার ফলনও ভালো হয়েছে। বিশেষ করে জেলার সাটুরিয়া উপজেলার আইড়মারা এলাকায় ব্যাপকভাবে আবাদ হয়েছে আগাম জাতের ফুলকপি। কয়েক দিনের মধ্যেই এসব ফুলকপি বাজারে উঠতে শুরু করবে। তবে বীজ, সার ও কীটনাশকের বাড়তি দামে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় কাঙ্ক্ষিত লাভ নিয়ে কিছুটা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন চাষিরা।
সবজি উৎপাদনের জন্য পরিচিত মানিকগঞ্জের সিংগাইর, সদর ও সাটুরিয়া উপজেলা। এসব এলাকায় সারা বছরই ফুলকপি, বাঁধাকপি, মূলা, পেঁপে, করলা, লাউ, শিমসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি উৎপাদিত হয়। এখানকার সবজির গুণগত মান ও স্বাদের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চাহিদা রয়েছে। তবে মৌসুমের শুরুতে দাম বেশি পাওয়ায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আগাম সবজি চাষের দিকে ঝুঁকছেন কৃষকেরা।
সম্প্রতি সাটুরিয়ার আইড়মারা এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ জমি ফুলকপির সবুজ পাতায় ছেয়ে গেছে। গাছের পরিচর্যায় ব্যস্ত কৃষকেরা। তাঁদের আশা, কয়েক দিনের মধ্যেই জমিগুলো সাদা ফুলকপিতে ভরে উঠবে।
আইড়মারা এলাকার কৃষক বশির আহমেদ বলেন, ‘আমাদের এলাকা সবজি চাষের জন্য বিখ্যাত। তবে ফুলকপিতে লাভ বেশি। বিশেষ করে আগাম ফুলকপি সাধারণ সময়ের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি দামে বিক্রি হয়। গত বছর ভালো লাভ হওয়ায় এবার কৃষকেরা বেশি জমিতে ফুলকপি আবাদ করেছেন।’
তিনি জানান, ইতিমধ্যে বাজারে লালশাক, মূলাশাক, মূলা, বেগুন ও লাউ উঠতে শুরু করেছে। কয়েক দিনের মধ্যেই ফুলকপিও বাজারে নেওয়া হবে। ভালো দাম পাওয়ার আশা করছেন তিনি।
কৃষক বশির আহমেদ আরও বলেন, ‘আমি তিন মৌসুমে ফুলকপি আবাদ করি। আগাম, মধ্যম ও নাবি জাতের ফুলকপি চাষ করি। এ বছর সাত বিঘা জমিতে আগাম ফুলকপি লাগিয়েছি। প্রতি বিঘায় প্রায় ৫০ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। বাজারদর ভালো থাকলে প্রতি বিঘার ফুলকপি ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকায় বিক্রি করতে পারব।’
তবে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় লাভের পরিমাণ কমছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, বীজের দাম অস্বাভাবিক বেশি। বীজের বাজারে সিন্ডিকেট না থাকলে দাম আরও কম হতো। এ ছাড়া সার ও কীটনাশকসহ কৃষি উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় কৃষকেরা চাপে পড়েছেন।
কৃষি বিভাগের সহায়তা নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করে বশির আহমেদ বলেন, ‘কৃষি অফিসের লোকজন পরামর্শ ছাড়া তেমন কিছুই দেন না। কিন্তু আমাদের কৃষিকাজ করেই জীবিকা নির্বাহ করতে হবে।’
তিনি জানান, তাঁদের উৎপাদিত ফুলকপি ঢাকার কারওয়ান বাজার, বাইপাইল ও যাত্রাবাড়ীর আড়তের ব্যবসায়ীরা সরাসরি এসে কিনে নিয়ে যান। উৎপাদন কম হলে স্থানীয় আড়তে বিক্রি করেন কৃষকেরা।
একই এলাকার কৃষক মজিবর রহমান জানান, বিদেশে গিয়ে প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় দেশে ফিরে কৃষিকাজ শুরু করেন তিনি। বর্তমানে কৃষিকাজ করেই ভালো আছেন। আগাম ফুলকপিতে লাভ বেশি হওয়ায় এলাকার অনেক কৃষক এ চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। পাশাপাশি অন্যান্য সবজিও ব্যাপকভাবে উৎপাদিত হচ্ছে।
মানিকগঞ্জের কাঁচামালের আড়তদার বদরউদ্দিন বলেন, ‘মানিকগঞ্জের ফুলকপির চাহিদা অনেক বেশি। এখানকার সবজি বাজারে থাকলে অন্য জেলার সবজি তুলনামূলক কম বিক্রি হয়। মানিকগঞ্জের সবজির দামও বেশি, চাহিদাও বেশি।’
এদিকে সবজি চাষের মৌসুমে মানিকগঞ্জে কাজ করতে আসেন দেশের বিভিন্ন জেলার কৃষিশ্রমিকেরা। রংপুর থেকে আসা কৃষিশ্রমিক দিদারুল ও মনজু জানান, প্রতিবছর এ সময় তাঁরা মানিকগঞ্জে আসেন। প্রায় ছয় থেকে সাত মাস বিভিন্ন কৃষকের জমিতে কাজ করেন।
তাঁরা বলেন, ‘এখানে মজুরি বেশি। থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাও ভালো। আমাদের এলাকায় মজুরি তুলনামূলক কম। তাই প্রতিবছর কাজের জন্য মানিকগঞ্জে আসি।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে মানিকগঞ্জে মোট ৯ হাজার ৩৮২ হেক্টর জমিতে সবজি আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় তিন হাজার হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে আগাম জাতের সবজি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শাহজাহান সিরাজ বলেন, ‘আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার আগাম ফুলকপির ফলন ভালো হয়েছে। কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী পরিচর্যা করায় পোকামাকড়ের আক্রমণও হয়নি।’
তিনি আরও জানান, আগাম সবজি চাষে তুলনামূলক বেশি লাভ হওয়ায় মানিকগঞ্জে প্রতিবছরই এ ধরনের সবজির আবাদ বাড়ছে।