✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-১০-১৮, | ১৪:২৩:৫৩ |ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীরে একটি গ্রামে জলপাই সংগ্রহকারীদের দেখতে যাওয়া ইউরোপীয় কূটনীতিকদের ওপর হামলা চালিয়েছেন ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা। হামলায় ফ্রান্সের এক মেয়র শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হয়েছেন এবং বেলজিয়ামের একটি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ঘটনায় ইসরায়েলি পুলিশের তদন্ত শুরু হয়েছে।
শনিবার তাইবেহ গ্রামের কাছে এ ঘটনা ঘটে বলে বার্তাসংস্থা আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে জানান হয়। প্রতিনিধি দলটি ফিলিস্তিনি কৃষকদের জলপাই সংগ্রহের কার্যক্রম দেখতে গিয়েছিল। এ সময় বসতি স্থাপনকারীরা তাদের বাধা দেন ও হামলা চালান। প্রতিনিধি দলে বেলজিয়ামের কনসাল জেনারেল, ফ্রান্স ও পোল্যান্ডের কূটনীতিক এবং ক্যাথলিক প্রতিনিধিরা ছিলেন বলে জানিয়েছেন বেলজিয়ামের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ম্যাক্সিম প্রেভো।
তিনি বলেন, হামলায় ফ্রান্সের এক মেয়র লাঞ্ছিত হয়েছেন এবং বেলজিয়ামের একটি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ঘটনাকে ইসরায়েলের ‘অবৈধ বসতি নীতির’ সঙ্গে যুক্ত করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান তিনি।
লাঞ্ছিত ফরাসি মেয়র বার্নার্ড বোদু এএফপিকে বলেন, এ হামলা থেকে বোঝা যায়, বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার প্রতি ইসরায়েলি সরকারের একধরনের প্রশ্রয় রয়েছে।
ঘটনাস্থলে থাকা এক কর্মী আমিত ওরফালির প্রকাশ করা ভিডিওতে বোদুকে ধুলোমাখা মাটিতে বসে একটি গাড়িতে হেলান দিয়ে থাকতে দেখা যায়। অন্য ভিডিওতে মুখোশধারী কয়েকজনকে গাড়ির চালকের পাশের জানালায় বারবার আঘাত করতে এবং পরিচয় জানতে চাইতে দেখা যায়। দূরে লাঠি হাতে আরও কয়েকজনকে এগিয়ে আসতে দেখা যায়। ওরফালি বলেন, মুখোশধারীরা তাদের হত্যার হুমকি দিয়েছিল।
ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-নোয়েল বারো ইসরায়েলকে হামলাকারী ‘চরমপন্থী বসতি স্থাপনকারীদের’ গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করার আহ্বান জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি বলেন, অপরাধমূলক এই সহিংসতা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
আল-জাজিরার রামাল্লা প্রতিনিধি নুর ওদেহ জানান, বসতি স্থাপনকারীরা কূটনীতিকদের গাড়িগুলো ঘিরে পাথর ছোড়েন এবং গাড়ির জানালা ভাঙচুর করেন।
তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দপ্তর হামলার খবর নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এক্সে দেওয়া বিবৃতিতে ঘটনাটিকে ‘অভিযোগ’ হিসেবে উল্লেখ করে প্রমাণের দাবি জানানো হয়েছে। যদিও দপ্তরটি স্বীকার করেছে, ঘটনার ভিডিও প্রকাশিত হয়েছে।
পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি কৃষকদের ওপর ধারাবাহিক হামলা
কূটনীতিকদের ওপর হামলার আগেও শনিবার অধিকৃত পশ্চিম তীরের বিভিন্ন এলাকায় ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা চালান ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা। এ সময় ইসরায়েলি বাহিনী জলপাই সংগ্রহকারী কৃষকদের আটক করে এবং কয়েকটি এলাকায় গুলি চালায়।
ফিলিস্তিন রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, হেবরনের দক্ষিণে মাসাফের ইয়াত্তা এলাকার মাঈন গ্রামে বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় ছয়জন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে চার নারী ও একটি শিশু রয়েছে।
রামাল্লার পশ্চিমে দেইর আম্মার এলাকায় জলপাই সংগ্রহকারী কৃষকদের লক্ষ্য করে গুলি চালায় ইসরায়েলি বাহিনী। ফিলিস্তিনি সংবাদ সংস্থা ওয়াফার বরাতে এ তথ্য জানা গেছে। এতে কৃষকেরা জমি ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন। একই এলাকায় বসতি স্থাপনকারীদের গুলিতে দুই ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন।
বেথলেহেমের দক্ষিণ-পূর্বে তুকু গ্রামে একটি ফিলিস্তিনি বেসামরিক গাড়ি লক্ষ্য করেও গুলি চালায় ইসরায়েলি বাহিনী।
রামাল্লার উত্তর-পূর্বে কাফর মালেক গ্রামে ভোরে একটি খামারে হামলা চালিয়ে প্রায় ২০টি ভেড়া হত্যা করেছেন বসতি স্থাপনকারীরা বলে জানিয়েছেন স্থানীয় মেয়র নাজেহ রুস্তুম।
এ ছাড়া নাবলুসের পূর্বে বেইত ফুরিক এলাকার সমতল ভূমিতে জলপাইগাছ ধ্বংস করা হয়েছে। একই সময়ে ইসরায়েলি বাহিনী জমির মালিক ও জলপাই সংগ্রহকারী শ্রমিকদের আটক করেছে বলে জানিয়েছেন আল-জাজিরার প্রতিনিধি নুর ওদেহ।
রামাল্লার পূর্বে দেইর জারির গ্রামের আল-হারিক এলাকায় সেনাবাহিনীর সুরক্ষায় থাকা বসতি স্থাপনকারীরা কৃষকদের লক্ষ্য করে গুলি চালান। এতে কৃষকেরা জলপাই সংগ্রহ বন্ধ করে জমি ছেড়ে যেতে বাধ্য হন। একই গ্রামে আন্তর্জাতিক কর্মী জোনাথন বুদলাকের গাড়ি ভাঙচুর করা হয় এবং এক কৃষকের গাড়ি লক্ষ্য করে পাথর ছোড়া হয়।
রামাল্লার কাছে বুরকা গ্রামে ইসরায়েলি বাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীরা কৃষকদের জলপাই সংগ্রহে বাধা দেন। সালফিতের দক্ষিণ-পূর্বে ওয়াদি আল-শায়ের এলাকাতেও কৃষকদের ওপর হামলা চালানো হয়।
নুর ওদেহ বলেন, বেইত ফুরিক, কাফর মালেক, দেইর জারিরসহ পশ্চিম তীরের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো একটি ধারাবাহিক অভিযানের অংশ। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বসতি স্থাপনকারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্যে হামলার কর্মসূচি প্রচার করায় ক্রমেই আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছেন।
তিনি জানান, অক্টোবরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ৩০০টি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। এসব হামলায় ফিলিস্তিনি কৃষকদের গুরুত্বপূর্ণ জলপাই সংগ্রহ মৌসুম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। তার অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে ইসরায়েলি সেনারা বসতি স্থাপনকারীদের সুরক্ষা দেন এবং নিজেদের জমি রক্ষায় এগিয়ে আসা ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা করেন।
জলপাই সংগ্রহ নিয়ে ধর্মীয় নির্দেশনার বিতর্ক
ফিলিস্তিনি কৃষকদের ওপর হামলার ঘটনাগুলোর পেছনে ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের দল জিউইশ পাওয়ারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী রাব্বি ডভ লিওরের একটি ধর্মীয় নির্দেশনাও আলোচনায় এসেছে।
ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের সমর্থক হিসেবে পরিচিত লিওর ওই নির্দেশনায় দাবি করেন, ‘পবিত্র ভূমিতে’ জলপাই সংগ্রহ করা ইহুদিদের জন্য অনুমোদিত এবং নিরাপত্তাঝুঁকি থাকলে এর ধর্মীয় গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।
তিনি আরও বলেন, ইসরায়েলি বসতিগুলো থেকে দূরে অবস্থিত এলাকাতেও ইহুদিরা জলপাই সংগ্রহ করতে পারেন, যাতে ভূমির ওপর নিজেদের মালিকানা প্রকাশ করা যায় এবং ঈশ্বরের নির্দেশ পালন করা হয়। তার দাবি, ওই ভূমি ইহুদিদের এবং ফিলিস্তিনিরা তা কেনেননি বা ভাড়া নেননি।
অধিকৃত পশ্চিম তীরে জলপাই সংগ্রহের মৌসুমে এমন হামলা ও বাধার ঘটনায় ফিলিস্তিনি কৃষকদের জীবিকা, জমির নিরাপত্তা এবং বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।