✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-১০-১৪, | ২৩:২৪:১৩ |চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে শুরু হওয়া আন্দোলন একপর্যায়ে নজিরবিহীন অচলাবস্থায় রূপ নেয়। সাবেক উপাচার্যকে পুনর্বহালের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মবিরতি, প্রশাসনিক ভবনের তালা ভেঙে নবনিযুক্ত উপাচার্যের প্রবেশ, শিক্ষার্থীবাহী বাসে হামলার অভিযোগ এবং উপাচার্য ভবনে প্রায় ৩০ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার ঘটনায় উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পুরো ক্যাম্পাস। কার্যত অচল হয়ে যায় ক্যাম্পাস।
দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় প্রশাসনের হস্তক্ষেপে নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমসহ ১১ জনকে ক্যাম্পাস থেকে উদ্ধার করা হয়। পরে তাদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। বর্তমানে উপাচার্য সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
তবে উপাচার্যকে উদ্ধার করা হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল সংকটের সমাধান হয়নি। সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এবং শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মবিরতি অব্যাহত থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম এখনো অনিশ্চয়তার মুখে।
উপাচার্য পরিবর্তন ঘিরে অচলাবস্থার শুরু
গত ২১ সেপ্টেম্বর চুয়েটের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় অধ্যাপক সায়েমকে অপসারণের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ওই দিন রাত থেকেই আন্দোলন শুরু করেন শিক্ষার্থীরা।
উপাচার্য হিসেবে অধ্যাপক সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে তাঁর কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেন আন্দোলনকারীরা। পরে এ আন্দোলনে যুক্ত হন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও। একপর্যায়ে কর্মবিরতি ও অসহযোগ কর্মসূচির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
আন্দোলনকারীরা নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে ক্যাম্পাসে প্রবেশ না করার হুঁশিয়ারি দেন। এমন পরিস্থিতিতে তাঁর ক্যাম্পাসে প্রবেশকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। গত সোমবার থেকে শুরু হওয়া ঘটনাপ্রবাহ পরবর্তী প্রায় দুই দিন চুয়েটকে গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দেয়।
তালা ভেঙে প্রবেশ, পরে উপাচার্য ভবনে অবরুদ্ধ
সোমবার সকাল ৯টার দিকে যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. আরাফাত রহমান রানা, চুয়েট শাখা ছাত্রদলের সভাপতি ওয়াসিফ রাশেদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান আল সাবিত, সাংগঠনিক সম্পাদক বিপ্লব হাসান তন্ময়সহ ছাত্রদলপন্থী আট থেকে দশজন সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীকে সঙ্গে নিয়ে প্রশাসনিক ভবন-২-এর তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম।
এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। তারা সোমবার দুপুর ১২টার মধ্যে উপাচার্যকে ভবন ছাড়ার সময়সীমা বেঁধে দেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তিনি ভবন ত্যাগ না করায় দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে উপাচার্যসহ ভেতরে অবস্থানরত অন্যদের অবরুদ্ধ করে রাখা হয়।
এ সময় শিক্ষার্থীদের ‘তালা তালা তালা হবে, ভিসি ভবন তালা হবে’ এবং ‘প্রত্যাখ্যান, প্রত্যাখ্যান, অনলাইন ভিসি প্রত্যাখ্যান’সহ বিভিন্ন স্লোগান দিতে দেখা যায়। এভাবেই উপাচার্য ভবনকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ অবরুদ্ধ অবস্থার সূচনা হয়।
শিক্ষার্থীবাহী বাসে হামলার অভিযোগ
উপাচার্য ভবনে অবরুদ্ধ অবস্থার মধ্যেই সোমবার দুপুর থেকে চুয়েটগামী শিক্ষার্থীবাহী বাসে একাধিক হামলার অভিযোগ ওঠে। এতে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
সোমবার দুপুর আড়াইটার দিকে চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার মদুনাঘাট এলাকায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বহনকারী দুটি বাস থামিয়ে হামলা করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। এ সময় চুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের এক শিক্ষার্থীকে মারধর ও হেনস্তা করা হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই শিক্ষার্থী জানান, সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলনে যোগ দিতে তিনি নগরের বহদ্দারহাট থেকে চুয়েটগামী একটি বাসে ওঠেন। পথে মদুনাঘাট এলাকায় বাসটি থামানো হলে কী ঘটেছে, তা দেখতে তিনি নিচে নামেন। পরিস্থিতি সম্পর্কে আগে থেকে তার কোনো ধারণা ছিল না।
ওই শিক্ষার্থী বলেন, ‘কাউকে ফোন করার জন্য মোবাইল বের করতেই একদল লোক আমাকে ঘিরে ধরে। এরপর আমাকে হেনস্তা করা হয় এবং জামাকাপড় ধরে টানাটানি করা হয়। একপর্যায়ে আমার চুল ধরে টানাটানি ও মারধর করা হয়। আমাকে সেখান থেকে নিয়ে যাওয়ারও চেষ্টা করা হয়। এ সময় আমাকে ছাত্রলীগ ও শিবিরের ট্যাগ দিয়ে মারধর করা হয়।’
তিনি আরও জানান, পরিস্থিতি খারাপ হয়ে উঠলে কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তি তাকে সহায়তা করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেন। তাঁদের সহযোগিতায় তিনি বড় ধরনের বিপদ থেকে রক্ষা পান। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, এ হামলায় স্থানীয় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা জড়িত। তবে এ বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে, নগরের কুয়াইশ এলাকায় একটি বালুবাহী ট্রাক দিয়ে শিক্ষার্থীবাহী বাসের গতিরোধ করে হামলা চালানোর অভিযোগ ওঠে। বাসচালক মোহাম্মদ ইব্রাহীম বলেন, ‘শহর থেকে চুয়েটে আসার সময় সন্ত্রাসীরা বালুর ট্রাক দিয়ে পথরোধ করে বাসে হামলা করে। এ সময় আমাকে সহ কয়েকজন ছাত্রকে মারধর করে। তারা মুখে বলতে থাকে, আজকে চুয়েটের গাড়ি চুয়েটে যেতে পারবে না।’
বিকেল সোয়া ৪টার দিকে নগরের বহদ্দারহাট এলাকায় শিক্ষার্থীবাহী আরেকটি বাসে হামলার অভিযোগ ওঠে। এ সময় ‘যমুনা’ নামের বাসটির চালককে মারধর করা হয় এবং বাসের জানালার কাচ ভাঙচুর করা হয়।
বাসে হামলার পেছনে উপাচার্যের হাত রয়েছে বলে অভিযোগ করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। এ ঘটনার প্রতিবাদে উপাচার্য ভবনের সামনে তারা ‘যে ভিসি ছাত্র মারে, সে ভিসি আমার না’ স্লোগান দেন।
প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন, বিচারের দাবি
বাসে হামলার প্রতিবাদে সোমবার চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেন চুয়েটের শিক্ষার্থীরা। এ সময় তাঁরা ‘শরীফুল ভিসি তুই বের হ’ এবং ‘অনলাইন ভিসি মানি না, মানব না’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন।
মানববন্ধনে যন্ত্রকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা আমাদের দাবিতে আন্দোলন করছি। সেই আন্দোলনে যোগ দিতে যাওয়ার পথে শিক্ষার্থীদের বাস আটকে মারধর করা হচ্ছে, বাসচালকের গায়ে হাত তোলা হচ্ছে। এভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে আমাদের আন্দোলন থামানো যাবে না।’
তিনি আরও বলেন, নতুন উপাচার্যকে সরে দাঁড়াতে হবে। শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা বা হল খালি করার উদ্যোগ নেওয়া হলে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
চুয়েটের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের সাবেক শিক্ষার্থী আমিনুল ইসলাম বলেন, ২০২৪ সালে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সময় ১৬ জুলাই চুয়েটের বাসে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছিল। বর্তমান ঘটনার মধ্য দিয়ে তাঁরা আবারও সেই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা করছেন।
তিনি সংকট নিরসনে প্রধানমন্ত্রীর দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
তিন সমিতির কর্মবিরতি ও সর্বাত্মক অসহযোগ
নবনিযুক্ত উপাচার্যের বহিরাগতদের সহায়তায় ক্যাম্পাসে প্রবেশের প্রতিবাদে পূর্ণ কর্মবিরতি ও সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেয় চুয়েটের শিক্ষক সমিতি, কর্মকর্তা সমিতি ও কর্মচারী সমিতি।
সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত তিন সমিতির যৌথ সভায় পূর্বঘোষিত দাবিগুলো পূরণ না হওয়া পর্যন্ত সব ধরনের দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সভা শেষে প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, বহিরাগতদের সহায়তায় নবনিযুক্ত উপাচার্যের ক্যাম্পাসে প্রবেশের ঘটনাকে তিন সমিতি ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে এর সম্পূর্ণ দায়ভার উপাচার্যকে বহন করতে হবে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, পূর্বঘোষিত দাবিগুলো পূরণ না হওয়া পর্যন্ত পূর্ণ কর্মবিরতি ও সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।
এদিকে, শিক্ষার্থীদের বাসে হামলার প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন শেষে বিক্ষোভ মিছিল করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। মিছিলটি কেন্দ্রীয় মিলনায়তনের সামনে থেকে শুরু হয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে সমবেত হয়ে বক্তব্য দেন তিন সমিতির নেতারা।
চুয়েট শিক্ষক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক মো. সামিউন বাসির বলেন, মদুনাঘাটে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় তারা তিন সমিতির পক্ষ থেকে নিন্দা জানাচ্ছেন।
কর্মচারী সমিতির সভাপতি জামাল উদ্দিন বলেন, শিক্ষার্থীদের বাসে হামলার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে।
শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ড. মো. আবুল হাছান বলেন, তাদের আন্দোলন ২১তম দিনে পৌঁছেছে। এত দিন আন্দোলন সুশৃঙ্খলভাবে চললেও শিক্ষার্থীদের বাসে হামলার মাধ্যমে পরিস্থিতি বিশৃঙ্খল করার চেষ্টা করা হয়েছে। তিনি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে হামলার বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান।
শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আহসান উল্লাহ বলেন, ঘটনার বিষয়ে হাটহাজারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ও বিভাগীয় কমিশনারকে অবহিত করা হয়েছে। তারা দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
পদত্যাগের আলটিমেটাম, না হলে অবরুদ্ধ রাখার ঘোষণা
সোমবার রাত ৮টার দিকে প্রশাসনিক ভবন-২-এর সামনে সংবাদ সম্মেলন করে উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে পদত্যাগের আলটিমেটাম দেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহাল না করা পর্যন্ত তাঁকে অবরুদ্ধ রাখার ঘোষণাও দেন তারা।
সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, নিজের পদ ধরে রাখতে উপাচার্য মদুনাঘাট ও বহদ্দারহাট টার্মিনালে শিক্ষার্থীবাহী বাসে হামলা করিয়েছেন। বহিরাগতদের নিয়ে তিনি ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেছেন বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা। এসব ঘটনার পর অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে আর উপাচার্য হিসেবে বিবেচনা করছেন না বলে জানান আন্দোলনকারীরা।
তবে শিক্ষার্থীরা দাবি করেন, তাদের উদ্দেশ্য সংঘাত সৃষ্টি বা মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়। কাউকে ভবনের ভেতরে আটকে রেখে হয়রানি করতেও চান না তারা। এ কারণে গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতিতে উপাচার্যকে নিরাপদে ক্যাম্পাস ত্যাগের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেন।
শিক্ষার্থীদের প্রস্তাব ছিল, অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম নিজ হাতে পদত্যাগপত্র লিখে হস্তান্তর করলে অথবা সাংবাদিকদের সামনে প্রকাশ্যে পদত্যাগের ঘোষণা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে ভবনের তালা খুলে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে তাকে ও তার সহযোগীদের নিরাপদে ক্যাম্পাস ত্যাগের সুযোগ দেওয়া হবে।
অন্যথায় অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে উপাচার্য পদে পুনর্বহাল না করা পর্যন্ত অবরুদ্ধ রাখার সিদ্ধান্তে অটল থাকার কথা জানান তারা।
বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন ভবন, অসুস্থ হয়ে পড়েন দুজন
অবরুদ্ধ উপাচার্য ভবনের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। সোমবার রাত ১০টার দিকে রাউজান উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) অংছিং মারমা শিক্ষার্থীদের বিদ্যুৎ সংযোগ সচল করার অনুরোধ জানান। তবে শিক্ষার্থীরা তার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন।
দীর্ঘ সময় অবরুদ্ধ থাকার মধ্যে মধ্যরাতে অসুস্থ হয়ে পড়েন দুজন সাবেক শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে ইঞ্জিনিয়ার শাহরিয়ারকে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে উন্নত চিকিৎসার জন্য নগরের এভারকেয়ার হাসপাতালে পাঠানো হয়।
মঙ্গলবার রাত ১টার দিকে উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম মুঠোফোনে চিকিৎসককে ভবনে আসার অনুরোধ জানান। পরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনার পর চুয়েট চিকিৎসাকেন্দ্রের চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ ও টেকনোলজিস্ট বাসু দেব উপাচার্য ভবনে প্রবেশ করে অসুস্থ ব্যক্তিদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন। এ সময় কয়েকটি গণমাধ্যমের প্রতিনিধিকেও ভবনের ভেতরে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়।
স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে চিকিৎসক জানান, ইঞ্জিনিয়ার শাহরিয়ারের রক্তচাপ ছিল ১৭০/১০০ মিলিমিটার পারদ। পরে তাঁকে উপাচার্য ভবন থেকে বের করে চুয়েট চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে উন্নত চিকিৎসার জন্য এভারকেয়ার হাসপাতালে পাঠানো হয়।
পরবর্তী সময়ে ইঞ্জিনিয়ার টিটু মো. সোহানের রক্তচাপ পরীক্ষা করে চিকিৎসক জানান, তার রক্তচাপ ছিল ১৪০/৯০ মিলিমিটার পারদ। এ ছাড়া চিকিৎসকের পরামর্শে ভবনে অবস্থানরত অন্যদেরও স্যালাইন দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম বলেন, তাদের দুজন সাবেক শিক্ষার্থী উচ্চ রক্তচাপজনিত জটিলতায় ভুগছেন। এ কারণে তিনি অ্যাম্বুলেন্স ও চিকিৎসক ডেকেছেন। দীর্ঘ সময় অবরুদ্ধ থাকায় ভেতরে অবস্থানরত সবাই অসুস্থতা ও ক্লান্তি অনুভব করছেন বলেও জানান তিনি।
খাবার-পানি সরবরাহ, ঘুমহীন রাত
অবরুদ্ধ ব্যক্তিদের জন্য সোমবার সন্ধ্যায় কলা, পাউরুটি, বিস্কুট ও পানি সরবরাহ করেন শিক্ষার্থীরা। পরে রাতের খাবারও পৌঁছে দেওয়া হয়।
ওই সময় উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম বলেছিলেন, ‘গতকাল রাত ২টার দিকে পুলিশের মাধ্যমে পাঠানো খাবার খেয়েছি। দীর্ঘ সময় এই অবস্থায় থাকার কারণে প্রচণ্ড মাথাব্যথা ও শারীরিক অসুস্থতা অনুভব করছি, রাতেও ঘুমাতে পারিনি। ভেতরে থাকা অন্যদেরও নানা স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিচ্ছে।’
রাতভর অবরুদ্ধ থাকার পর মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে শিক্ষার্থীরা ভবনের ভেতরে অবস্থানরত সবার জন্য নাশতা পৌঁছে দেন।
অসুস্থতার দাবি, দুই দফায় স্বাস্থ্য পরীক্ষা
অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে পাঠানো এক ভিডিওবার্তায় উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম মাথাব্যথা ও বুকে ব্যথার কথা জানান। চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে যাওয়ার বিষয়ে তিনি সবার সহযোগিতাও কামনা করেন।
এর পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে চুয়েট চিকিৎসাকেন্দ্রের চিকিৎসকদের তালাবদ্ধ ভবনে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়। কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মীও ভবনের ভেতরে প্রবেশ করেন।
দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেও উপাচার্যের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে না পেরে প্রথমে কর্তব্যরত চিকিৎসক ফিরে যান। পরে দুপুর দেড়টার দিকে উপাচার্য পুনরায় চিকিৎসা নিতে আগ্রহ প্রকাশ করলে চুয়েট চিকিৎসাকেন্দ্র থেকে চিকিৎসক ডা. মো. সাহাবউদ্দিনকে সেখানে পাঠানো হয়।
চিকিৎসক ডা. মো. সাহাবউদ্দিন বলেন, তিনি উপাচার্যের নাড়ির স্পন্দন ও রক্তচাপ পরীক্ষা করেছেন। তখন তাঁর রক্তচাপ স্বাভাবিক ছিল। চিকিৎসকের ভাষ্য অনুযায়ী, উপাচার্য তার কাছে বুকে ব্যথার কথা জানাননি এবং হাসপাতালে যাওয়ার ইচ্ছাও প্রকাশ করেননি।
পরে দুপুর ২টার দিকে রাউজান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভারপ্রাপ্ত আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. টিবলু কান্তি দে উপাচার্যের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন। এ সময় তিনি উপাচার্যের নাড়ির স্পন্দন ও রক্তচাপ পরিমাপ করেন।
বুকে ব্যথা অনুভব করছেন কি না, জানতে চাইলে উপাচার্য চিকিৎসককে জানান, সকাল ১০টা থেকে তার বুকে ব্যথা ছিল। তবে ধীরে ধীরে তা কমে এসেছে। তিনি নিয়মিত রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের ওষুধ সেবন করেন না বলেও জানান। তবে কোন ওষুধ সেবন করেন, তা জানতে চাইলে নাম স্মরণ করতে পারেননি।
পরীক্ষার সময় চিকিৎসক প্রথমে উপাচার্যের রক্তচাপ ১৪০/১০০ মিলিমিটার পারদচাপ পান বলে জানা যায়। পরে বাইরে এসে তিনি রক্তচাপ ১৫০/১০০ মিলিমিটার পারদচাপ বলে জানান। একই সঙ্গে উপাচার্যের বুকে ব্যথা অনুভবের কথাও উল্লেখ করেন।
সংকট নিরসনে শাহবাগে মানববন্ধন
চুয়েটের চলমান সংকট নিরসনে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ এবং শিক্ষার্থীবাহী বাসে হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে ঢাকার শাহবাগে প্রতিবাদ সমাবেশ ও মানববন্ধন করেন ঢাকায় অবস্থানরত চুয়েটের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরা।
সমাবেশে তারা সংকট সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর হস্তক্ষেপ দাবি করেন। পাশাপাশি উপাচার্যের সঙ্গে অবরুদ্ধ কয়েকজন ছাত্রদল নেতাকর্মী ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলেও অভিযোগ করেন তারা।
৩০ ঘণ্টা পর প্রশাসনের হস্তক্ষেপে উদ্ধার
প্রায় ৩০ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমসহ ১১ জনকে উদ্ধার করে ক্যাম্পাস থেকে নিয়ে যায় প্রশাসন।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা, পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম এবং রাউজান উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) অংছিং মারমাসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার পর উপাচার্যকে মুক্তি দিতে সম্মত হন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। পরে কঠোর পুলিশি পাহারায় তাদের ক্যাম্পাস থেকে বের করে নেওয়া হয়।
উপাচার্যকে আর ক্যাম্পাসে প্রবেশ না করার শর্তে অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে বলে জানান আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। দীর্ঘ সময় অবরুদ্ধ থাকায় উপাচার্যসহ ভেতরে অবস্থানরত কয়েকজন অসুস্থ হয়ে পড়ার খবর সামনে আসার পর অ্যাম্বুলেন্সে করে তাদের ক্যাম্পাস থেকে বের করা হয়।
এর আগে বিকেল সোয়া ৫টার দিকে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার চুয়েট ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন। উপাচার্যকে উদ্ধারের বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ‘একজন সম্মানিত শিক্ষক আমাদের কাছে নিরাপত্তা চেয়েছেন, চিকিৎসার জন্য বলেছেন। তাকে আমরা নিয়ে যেতে এসেছি। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হবে।’
এ সময় শিক্ষার্থীদের পক্ষে বক্তব্য দেন চুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আহনাফ শাহরিয়ার অর্ণব ও আসাদুল্লাহ হিল গালিব। তাঁরা শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং ক্যাম্পাসের চলমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
অর্ণব বলেন, ‘এখানে চট্টগ্রামের সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রশাসনের মানুষজন উপস্থিত আছেন। আমরা জানতে চাই, আপনারা কখন আমাদের নিরাপত্তার জন্য থাকবেন? আপনারা কি শুধু সেই ভিসিকে বের করে নিয়ে যেতে এসেছেন, যিনি বহিষ্কৃত সন্ত্রাসীদের নিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেছেন। আমরা শিক্ষার্থীরা কি আপনাদের সন্তানতুল্য নই?’
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ক্যাম্পাসে যোগ দেওয়ার আগেই উপাচার্য শিক্ষকদের হয়রানি ও হুমকি দিতে শুরু করেছিলেন। পরে প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে শিক্ষকদের পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগও তোলেন তিনি।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনার পর প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপাচার্য ভবনের ভেতরে প্রবেশ করেন। কিছুক্ষণ পর উপাচার্যসহ সেখানে অবস্থানরত ১১ জনকে নিয়ে বেরিয়ে আসেন তারা। এ সময় উপাচার্যের সঙ্গে যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. আরাফাত রহমান রানা, চুয়েট ছাত্রদলের সভাপতি ওয়াসিফ রাশেদ ও সাংগঠনিক সম্পাদক বিপ্লব হাসান তন্ময়সহ অন্যরা ছিলেন। পরে তাদের অ্যাম্বুলেন্সে করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।
উদ্ধার অভিযান শেষে চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, ‘বড় ধরনের কোনো ঝামেলা ছাড়াই আমরা বিষয়টি সমাধান করতে পেরেছি। উপাচার্য একজন সম্মানিত ব্যক্তি। দীর্ঘ সময় অবরুদ্ধ থাকায় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। একজন নাগরিক হিসেবে তার চিকিৎসা নিশ্চিত করতেই আমরা এখানে এসেছি। তার চিকিৎসা শেষে পরবর্তী বিষয়গুলো দেখা হবে।’
তিনি আরও বলেন, সরকার তাকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। শিক্ষার্থীরা তার সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হবেন কি না, সেটি ভিন্ন বিষয়। তবে তার প্রতি সম্মানজনক আচরণ করার জন্য শিক্ষার্থীদের অনুরোধ করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের দাবিগুলোও পরবর্তী সময়ে বিবেচনা করা হবে বলে জানান তিনি।
হাসপাতালে উপাচার্য, ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে
বর্তমানে উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা তাকে ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে রাখার কথা জানিয়েছেন। তার চিকিৎসার জন্য গঠিত মেডিকেল বোর্ড প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে পরদিন শারীরিক অবস্থার বিষয়ে জানাবে।
এদিকে, ‘ক্যাম্পাসে প্রবেশ না করার শর্তে মুক্তি’ দেওয়া হয়েছে—এমন কোনো বক্তব্য তিনি দেননি বলে জানিয়েছেন উপাচার্য। তিনি বলেন, ‘সরকারের সঙ্গে কথা হয়েছে, তাদের পূর্ণ সহযোগিতা রয়েছে। তারা দ্রুত আমার সুস্থতা কামনা করেছেন এবং দ্রুত ক্যাম্পাসে ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।’
উপাচার্য ভবন থেকে অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে প্রায় ৩০ ঘণ্টার অবরুদ্ধ অধ্যায়ের অবসান ঘটলেও চুয়েটের মূল সংকটের সমাধান হয়নি। একদিকে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, অন্যদিকে শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পূর্ণ কর্মবিরতি ও সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচি—সব মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম এখনো অনিশ্চয়তার মুখে। এখন সংকট নিরসনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ ও আলোচনার মাধ্যমে স্থায়ী সমাধানের অপেক্ষায় চুয়েটের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।